কানাডায় খুনি নূর চৌধুরী, পর্ব-২

878
AdvertisementCBN-Leaderate

[কবি, সাংবাদিক এবং গবেষক সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে নানামুখী গবেষণা করেছেন। তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন, গল্প লিখেছেন, নাটক লিখেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন, সম্পাদনা করেছেন। রচনা করেছেন ৬/৭টি গ্রন্থ। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য- ‘কানাডার কাশিমপুরে খুনি নূর চৌধুরী’। এই বইটি খুনি নূর চৌধুরী সম্পর্কে তথ্যপ্রমাণসহ এক অজানা দলিল। বইটির তিনটি সংস্করণ বের হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে সেই বইয়ের কিছু নির্বাচিত অংশ CBN24-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হলো।  -সম্পাদক]

পর্ব-১ পড়ুন এই লিঙ্কে: কানাডায় খুনি নূর চৌধুরী, পর্ব-১

কানাডায় খুনিদের কথা

ওপরের উল্লেখিত ১২ জনের মধ্য পাঁচজনই কানাডায় অবস্থান করছে। নূর ছাড়াও রয়েছে নাজমুল, শরাফুল, কিসমত ও খায়রুজ্জামান। লে. নাজমুল হোসেন আনসার ১৯৭৫ সালে কানাডায় তৃতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ পায়। পরে কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব লাভ করে। তবে সে ঢাকার নিম্ন আদালত থেকে খালাস পায়। কিন্তু তার নামে জেল হত্যা মামলা আছে। বর্তমানে নাজমুল অটোয়ায় বসবাস করছে। কানাডায় নাগরিকত্ব পাওয়ার পর কানাডা পোস্টে চাকরি করে অবসর নিয়েছে।

নাজমুল ছাড়াও হাইকোর্ট থেকে খুনের অভিযোগে অব্যাহতিপ্রাপ্ত অপর দুই সামরিক কর্মকর্তা যথাক্রমে মেজর (অব.) আহমেদ শরাফুল হোসেন এবং ক্যাপ্টেন (অব.) কিসমত হাশেম রাজনৈতিক আশ্রয়ের মাধ্যমে কানাডায় নাগরিকত্ব পেয়েছে। শেষোক্ত দুজন মন্ট্রিয়ল ও অটোয়ায় বসবাস করছে। শরাফুল নামধাম পরিবর্তন করে অন্য প্রদেশে লোকচক্ষুর আড়ালে বসবাস করছে। অবশ্য কিসমত হাশেমও জনসমক্ষে আসে না। (দ্র. ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ : মুজিব হত্যা মামলা, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, শিখা প্রকাশনী, বইমেলা ২০০০, ঢাকা।)। হাইকোর্টে তারা অব্যাহতি পেলেও ইন্টারপোলে তাদের নামে রেড অ্যালার্ট জ্বলছে, বহাল রয়েছে পরোয়ানা।

এদিকে, মাঝেমধ্যে নূর চৌধুরীকে টরন্টোতে বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দেখা যেত। তবে বেশ কিছুদিন আগে একটি অনুষ্ঠানে এক ব্যক্তি নূর চৌধুরীকে থাপ্পড় মারেন। এর পর থেকে সেও লোকচক্ষুর আড়ালে একেবারেই নিভৃতে সময় কাটাচ্ছে। (দ্র. দৈনিক জনকণ্ঠ, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১১)

নূরকে নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক ধূম্রজাল

১৯৯৬ সালের ৫ জুলাই অদ্যাবধি দীর্ঘ আঠারো বছর ধরে লে. কর্নেল নূর চৌধুরী কানাডা বাস করছে। এই গ্রন্থকার এবং সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম মিন্টু নানাভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে তাকে খুঁজে বের করে ঢাকার গণমাধ্যমে একের পর এক নিউজ প্রকাশ করি। যার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের টনক নড়ে এবং প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী কানাডায় আসেন।

তার পরও নূরকে নিয়ে নানা ধরনের বিতর্কিত বক্তব্য, ভিন্নমত, ধূম্রজাল, গুজব তৈরি হয়। (দ্র. দৈনিক আমাদের সময়, ৮ ডিসেম্বর ২০০৯, ঢাকা।) নূর চৌধুরীকে যেন কানাডা থেকে ডিপোর্ট করা না হয়, সেজন্য একটি মহল বিভিন্ন রকমের অপচেষ্টায় তৎপর। তারা বিভ্রান্তিমূলক খবর ছড়িয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি করছে, যেন নূর চৌধুরী নতুন কৌশল অবলম্বন করতে পারে। তার একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। এই গ্রন্থকার এবং সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম মিন্টুকে টরন্টোর অতি পরিচিত মুখ তার বাসায় নিয়ে বলেন, ‘আমার কাছে নূরের গুরুত্বপূর্ণ নিউজ আছে। আপনারা তা আমার নাম উল্লেখ করে করতে পারেন। নূর চৌধুরীর ছেলে ভয়ে স্কুলে যেতে পারছে না। এবং…’

সঙ্গে সঙ্গে আমরা হিসাব করলাম, ষাটোর্ধ্ব নূরের ছেলে তো স্কুলে পড়ার কথা নয়। তার মানে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলোর বিশ্বস্ততার প্রশ্নে বিতর্ক তোলাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।

এদিকে লন্ডনস্থ একটি সংবাদ সংস্থা দাবি করছে, সে (নূর চোধুরী) ‘এখলাসুর রহমান’ নাম ধারণ করে ২৬-২৭ বছর ধরে পূর্ব লন্ডনের ডকল্যান্ডের ওয়েস্টফেরিতে ভাতিজির সঙ্গে বসবাস করছে, ব্রিকলেনে ‘হাজি’ হিসেবে জুমার নামাজ পড়েছে, স্থানীয় মাঠে সামরিক কায়দায় ব্যায়াম করেছে, কাপড়ের দোকানে কর্মরত ছিল ইত্যাদি। তাতে মনে হয়, নূর চৌধুরী যুক্তরাজ্যে। (দ্র. ১৬ আগস্ট ২০১০, ইউকেবিডি নিউজ, লন্ডন)

তবে লন্ডনস্থ ইউকেবিডিডটকম নামের এই অনলাইন পত্রিকা নানা অপচেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। তার সঙ্গে তাল দিয়ে সেই ভুয়া খবরগুলো ঢাকার কোনো কোনো দৈনিক এবং টরন্টোর কয়েকটি স্থানীয় বাংলা মিডিয়াও অপপ্রচার শুরু করে। আগেই উল্লেখ করেছি, এ ব্যাপারে গ্রন্থলেখক দৈনিক আমাদের সময় এবং সাপ্তাহিক বেঙ্গলি টাইমসের সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মিন্টু দৈনিক সমকালের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করে যে, লন্ডনে নয়, নূর টরন্টোতেই আছে। এ ছাড়াও কানাডাস্থ গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সংস্থা নূরের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে। *(দ্র. দ্য ভ্যাঙ্কুভার সান, ৪ ডিসেম্বর ২০০৯, ডেইলি অটোয়া সিটিজেন ও কানাডা ডট কম ৩ ডিসেম্বর ২০০৯, ইত্যাদি পত্রিকাসহ ক্যানওয়েস্ট, দৈনিক অটোয়া মেট্রোও।)

অবশেষে বাধ্য হয়ে এ ব্যাপারে অটোয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসে পক্ষ থেকে একটা বিজ্ঞপ্তি দেয়, নভেম্বর ১০, ২০০৯-এ। কাউন্সিলর নওরীন আহসান স্বাক্ষরিত এই বিবৃতিতে বলা হয়, কিছুসংখ্যক স্থানীয় বাংলা পত্রিকা এবং কোনো কোনো বাংলাদেশি সাংবাদিক…নানান বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এ সমস্ত মনগড়া। উদ্দেশ্যমূলক ও বাস্তবতাবিবর্জিত সংবাদসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তারা হয়তো বাংলাদেশের এ জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়টি থেকে সর্বসাধারণের দৃষ্টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার প্রয়াস পাচ্ছে। (দ্র. দৈনিক আমাদের সময়, ১৭ ডিসেম্বর ২০০৯, ঢাকা।)

আবার যুক্তরাষ্ট্রেও নূর চৌধুরী থাকতে পারে বলে ঢাকার দৈনিক প্রথম আলোতে ছাপা হয়। ইন্টারপোলের ওয়াশিংটন শাখা নূর চৌধুরীর অনুসন্ধানে ঢাকায় তথ্য চেয়েছে। তাতে নাকি ‘ঢাকার কর্মকর্তা’ মনে করছেন, নূর চৌধুরী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এ ছাড়াও নূর লিবিয়াতেও থাকতে পারে বলে উক্ত সংবাদ সংস্থার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। ঢাকার আরেকটি দৈনিক লিখেছে যে, নূর ইউএসএ, রাশেদ দক্ষিণ আফ্রিকায় আর নাজমুল লিবিয়ায় !*(দ্র. দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১০ জানুয়ারি ২০১০, ঢাকা।)

ইতিহাসের কলঙ্কিত এ হত্যাকাণ্ডের পলাতক বাকি খুনিরা কে কোথায় তার সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা যায়নি। সরকার এবং বিভিন্ন গণমাধ্যম বিভিন্ন দেশের কথা উল্লেখ করেছে এবং খুনিরা খুব সতর্কতার সঙ্গে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আর সেই আলোচিত দেশগুলো হচ্ছে- পাকিস্তান, ভারত, লিবিয়া, থাইল্যান্ড, হংকং, কেনিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা।

কানাডায় খুনি নূর চৌধুরী, পর্ব-৩

https://www.facebook.com/cbn24.ca/
Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
CBN-Leaderate