কানাডায় খুনি নূর চৌধুরী, পর্ব-৩

604
AdvertisementCBN-Leaderate

[কবি, সাংবাদিক এবং গবেষক সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে নানামুখী গবেষণা করেছেন। তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন, গল্প লিখেছেন, নাটক লিখেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন, সম্পাদনা করেছেন। রচনা করেছেন ৬/৭টি গ্রন্থ। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য- ‘কানাডার কাশিমপুরে খুনি নূর চৌধুরী’। এই বইটি খুনি নূর চৌধুরী সম্পর্কে তথ্যপ্রমাণসহ এক অজানা দলিল। বইটির তিনটি সংস্করণ বের হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে সেই বইয়ের কিছু নির্বাচিত অংশ CBN24-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হলো।  -সম্পাদক]

পর্ব-১ পড়ুন এই লিঙ্কে: কানাডায় খুনি নূর চৌধুরী, পর্ব-১
পর্ব-২ পড়ুন এই লিঙ্কে: কানাডায় খুনি নূর চৌধুরী, পর্ব-২

বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে নূর-হুদা

‘ক্যাপ্টেন হুদা ও মেজর নূর বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে’ -বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের চার নম্বর সাক্ষী হাবিলদার (অব.) কুদ্দুস সিকদার। উল্লেখ্য, কুদ্দুস সিকদার বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের চার নম্বর সাক্ষী। ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে তাঁর দেওয়া সাক্ষ্য ১৯৯৭ সালের ২৮ জুলাই গৃহীত হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ৩২ নম্বর বাড়িতে কর্তব্যরত ছিলেন।

নূরকে বহিষ্কারের দাবিতে কানাডার প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি

nurrখুনি নূর চৌধুরীকে বহিষ্কারের দাবিতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপারকে পরবর্তীতে জাস্টিন ট্রুডোকে বেশ কয়েক বার চিঠি দিয়েছেন প্রবাসী বাঙালিরা। চিঠিতে তাঁরা জানিয়েছেন, কানাডা পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশ। এ দেশ আত্মস্বীকৃত খুনিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হোক, তা কখনোই কানাডাবাসীদের কাম্য নয়।

চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়, আদালতকৃত সাজাপ্রাপ্ত খুনি, সন্ত্রাসী, অপরাধীকে কানাডায় আশ্রয়-প্রশ্রয় দিলে তা লক্ষাধিক শান্তিপ্রিয় বাঙালি তথা সকল কমিউনিটির মধ্যে দারুণ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এবং প্রভাব বাড়বে। যা দুই দেশের জন্যই মারাত্মক ক্ষতিকর।

হাসিনা টরন্টোতে এলেই নূরের বিষয়টি প্রাধান্য পায়

শেখ হাসিনা টরন্টোতে এলেই খুনি নূর চৌধুরীর বিষয়টি প্রাধান্য পায়। কিন্তু মূলধারার পত্রপত্রিকার সাংবাদিকরা শেখ হাসিনার ইন্টারভিউ নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। তার পরও দৈনিক টরন্টো স্টার গত ২৪ মে ২০১১-তে প্রথম পাতায় শিরোনাম করেছে : ‘Bangladeshi PM visits family in Oshawa, near home of father’s killer’। আর দৈনিক মেট্রো ২৫ মে ২০১১-তে নিউজ করেছে : ‘An enemy down the 401’. দৈনিক টরন্টো স্টার লিখেছে : Hasina was quietly visiting her daughter, son-in-law and grandchildren in Oshawa, near Toronto where Nur Chowdhury also has been staying for six years. Referring to Hasina’s stay at Oshawa the report says, “But a not-so-simple political problem lives just down Highway 401. Nur Chowdhury, the man convicted as assassinating Hasina’s father- Sheikh Mujibur Rahman, Bangladesh’s founding father and first president- has lived in an Etobicoke condo since 2005, after fleeing to Canada nine years earlier.” এ ছাড়াও দৈনিক টরন্টো স্টার সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর চাপ সৃষ্টিতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সম্পাদকীয় পাতায় গত ১৯ ও ২০ মে দুটি বিশদ প্রতিবেদন ছেপেছে। শ্রম ও নারী অধিকার আন্দোলনের প্রবক্তা কেভিন থমাস রচিত প্রথম প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের অধিকারপ্রতিষ্ঠায় বলা হয়েছে- ‘পিএম শুড্ স্পিক আপ ফর বাংলাদেশি ওয়ার্কার্স’।

দ্বিতীয় প্রতিবেদনটির রচয়িতা দারিদ্র্য বিমোচনের স্বেচ্ছাসেবী জেনিফার গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অপসারণে উদ্বেগ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘এ চান্স টু স্পিক আপ ফর দ্য পুওর অব বাংলাদেশ’। অন্য একটি দৈনিক ২৫ মে লিখেছে : Canada not to deport Nur Chowdhury. আবার কোনো কোনো কাগজ লিখেছে, খুনির নূর চৌধুরীর Atp # 346, 2 Valhalla inn Road, Etobicoke’র পাশাপাশিই অশোয়ায় ৪০১ হাইওয়ের পাশে কন্যা পুতুলের বাসায় অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা।

আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কানাডায় সফরকালে বলেন যে, বাংলার জনগণের প্রত্যাশায় নূরকে ফেরত দেওয়া হবে। *(দ্র. দৈনিক কালের কণ্ঠ, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১০, ঢাকা।)

টরন্টো স্টারের লিড নিউজ

3বঙ্গবন্ধুর খুনি নূর চৌধুরীকে নিয়ে কানাডার মূলধারার মিডিয়াতে এখন সংবাদের ঝড় বইছে। টরন্টোর জনপ্রিয় দৈনিক টরন্টো স্টারের লিড নিউজ ছিল- দ্য অ্যাসাসিন হু লিভস নেক্সট ডোর। *(দ্র. ডেইলি টরন্টো স্টার, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১১, কানাডা।)

অমি দেমসে রচিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বঙ্গবন্ধুর খুনি নূর চৌধুরী ও তার স্ত্রী রাশিদা খানম গ্রেটার টরন্টোর ইটোবিকে বসবাস করছেন। [Atp# 346, 2 Valhalla inn Road, Etobicoke,Toronto-তে] ১,৮৫,০০০ ডলার দিয়ে একটি অত্যাধুনিক বিলাসবহুল কন্ডোও কিনেছেন তারা। গত মঙ্গলবার সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক ইটোবিকের এই কন্ডোতে গিয়ে নূর চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। কয়েক দফা দরজায় নক করে পরিচয় দেওয়ার পর কেউ দরজা খোলেনি।

এই রিপোর্টটিতে বলা হয়, কেবল মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ার কারণে কানাডা সরকার নূর চৌধুরীকে ডিপোর্ট করতে পারছে না। আর নূর চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে কানাডা সরকারকে অনুরোধ জানাতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপুমণি এখন অটোয়ায় অবস্থান করছেন।

১৯৯৮ সালে বাংলাদেশের আদালত প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান হত্যার দায়ে নূর চৌধুরীসহ ১২ জন বিপথগামী প্রাক্তন সামরিক সদস্যকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেন। রায় অনুযায়ী নূর চৌধুরী বাংলাদেশে ফিরলে তার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সম্প্রতি ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন আসামির আবেদন বাংলাদেশের আদালত খারিজ করে দেওয়ার পর নূর চৌধুরীসহ বিদেশে পালিয়ে থাকা দণ্ডপ্রাপ্তদের ফিরিয়ে দিতে বাংলাদেশ সরকার কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে। এদিকে সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে ২০০১ সালে কানাডার সুপ্রিম কোর্টের এক নির্দেশনার সূত্র ধরে আইনি আশ্রয় নিচ্ছে নূর চৌধুরী। ২০০১ সালের কানাডা সুপ্রিম কোর্টের ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ড বহাল আছে এমন কোনো দেশের কাছে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তিকে হস্তান্তর করা যাবে না। তবে খুনি নূর চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে নিতে মরিয়া বাংলাদেশ সরকার। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার সময় এই নূর চৌধুরীই বঙ্গবন্ধুর বুকে গুলি চালিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই ফেরারি এই খুনিদের ফিরিয়ে নিয়ে রায় কার্যকর করা হলে বাংলাদেশে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে বলে অনেকে মনে করেন। গত ১৯ নভেম্বর বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের ফাঁসির রায় বহাল রাখার পর বাংলাদেশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন নূর চৌধুরীসহ মোট ছয়জন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ফেরারি আসামিকে ফিরিয়ে দিতে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ খুনিদের আশ্রয়দাতা অপর দেশগুলোকে চাপ দেওয়ার অঙ্গীকার করেন।

নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে দিতে বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ গত ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে অটোয়ায় কানাডা সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

নূর চৌধুরীকে কানাডা থেকে বহিষ্কার এবং বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের দাবি কানাডার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপারের জন্য বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করেছে। কানাডায় জন্মগ্রহণকারী খুনি রোনাল্ড স্মিথকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা নিয়ে এ ধরনের একটি মামলায় কানাডা সরকার ২০০৯ সালে পরাজিত হয়েছিল। এ সপ্তাহে সিটিজেনশিপ ও ইমিগ্রেশন বিভাগের একজন মুখপাত্র জানান, ‘ফাঁসির রায় হওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন ব্যক্তিকে হস্তান্তর করার আগে কানাডা সরকার ওই দেশের কাছে নিশ্চয়তা চাইবে যে দোষী সাব্যস্ত হলেও হস্তান্তরিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় দেওয়া হবে না বা কার্যকর করা হবে না।’

নূর চৌধুরী ইতিমধ্যে ফাঁসির রায় পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা সরকার বর্তমানে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন হওয়ায় ওই রায় কার্যকর করা নিয়ে সরকারের আন্তরিকতার অভাব থাকবে না বলে মনে করা হচ্ছে। তা ছাড়া সরকারের প্রভাবশালী কর্মকর্তা এবং মন্ত্রীরাও দ্রুত ওই রায় কার্যকর করার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

4৫৯ বছর বয়সী নূর চৌধুরী ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পেছনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে মামলায় বলা হয়েছে। ওই হত্যাকাণ্ডের সময় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা ইউরোপ সফরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। বেশ কয়েক বছর পর শেখ হাসিনা দেশে ফিরে রাজনীতিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। গত বছর তিনি আবার সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন এবং বঙ্গবন্ধুর দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বর্তমানে ক্ষমতায় রয়েছে।

খুনি নূর চৌধুরীকে প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি তিনটি ফেডারেল বিভাগের এখতিয়ারভুক্ত। এগুলো হলো পররাষ্ট্র, সিটিজেনশিপ ও ইমিগ্রেশন এবং পাবলিক সেফটি বা জননিরাপত্তা। কানাডা থেকে বহিষ্কারের ইস্যুতে গোপনীয়তা বজায় রাখতে বিভাগ তিনটির কর্মকর্তারা তেমন একটা মুখ খুলছেন না। তবে কানাডার ফেডারেল কোর্টে দাখিল করা প্রতিবেদন এবং তথ্য উপাত্ত থেকে বোঝা যাচ্ছে, ওই হত্যাকাণ্ডের পর কানাডিয়ান কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের মধ্যে দশক ধরে আইনি লড়াই চলেছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী পটভূমিতে ১৯৯৬ সালে নূর চৌধুরী কানাডায় আসেন। ১৯৯৬ সালে ৫ জুলাই তিনি ‘ভিজিটর’ স্ট্যাটাস পান। তবে অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি ‘শরণার্থী’ স্ট্যাটাসের জন্য আবেদন করেন। ওই বছরই শেখ হাসিনা বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন এবং খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করেন।

নূর চৌধুরীর ‘শরণার্থী’ স্ট্যাটাসের জন্য আবেদনের প্রথম শুনানি হয় ১৯৯৯ সালে। ২০০২ সালের প্রথম দিকে তার আবেদন নাকচ হয়। এরপর ২০০৪, ২০০৫ এবং ২০০৬ সালেও তার আবেদন নাকচ হয়। টরন্টোতে কানাডা বর্ডার সার্ভিস এজেন্সি ওয়ার ক্রাইমস অ্যান্ড পাবলিক সিকিউরিটি ডিভিশনের কাছে ইন্টারপোল কানাডার পাঠানো ফ্যাক্স বার্তার সূত্র ধরে জানা যায়, বাংলাদেশে নূর চৌধুরীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ায় কানাডা তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়নি। বাংলাদেশের সরকার বলছে, নূর চৌধুরী দেশে ফিরে আদালতে আপিল করতে পারবে।

কানাডায় খুনি নূর চৌধুরী, পর্ব-৪

https://www.facebook.com/cbn24.ca/
Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
CBN-Leaderate