কানাডায় খুনি নূর চৌধুরী, পর্ব-১

908
AdvertisementCBN-Leaderate

[কবি, সাংবাদিক এবং গবেষক সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে নানামুখী গবেষণা করেছেন। তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন, গল্প লিখেছেন, নাটক লিখেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন, সম্পাদনা করেছেন। রচনা করেছেন ৬/৭টি গ্রন্থ। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য- ‘কানাডার কাশিমপুরে খুনি নূর চৌধুরী’। এই বইটি খুনি নূর চৌধুরী সম্পর্কে তথ্যপ্রমাণসহ এক অজানা দলিল। বইটির তিনটি সংস্করণ বের হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে সেই বইয়ের কিছু নির্বাচিত অংশ CBN24-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হলো।  -সম্পাদক]

বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা ও বাঙালি একই সূত্রে গাঁথা। এই চার গর্বিত ‘ব’ আমার কাছে বিস্ময়কর! বঙ্গবন্ধু যেমন হতভাগা, তেমনি তাঁর বাংলাদেশও। বাংলা ভাষা যেমন দুঃখিনী, তেমনি বাঙালি জাতিও দুর্ভাগা!

nurrতাই মহান মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীরা পরবর্তীকালে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। পরে ৩৪ বছর পর এ হত্যাকাণ্ডের বিচার হলো ১৯ নভেম্বর ২০০৯-এ। খুব ধীরে ধীরে দীর্ঘ বারো বছরে নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে আইনের প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছতার সঙ্গে অতিক্রম করে সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে স্বঘোষিত খুনিদের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। যাতে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়নি। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ আসামির মধ্যে কারাবন্দি পাঁচ আসামিকে গত ২৮ জানুয়ারি ২০১০-এ দিবাগত রাতে ফাঁসি দেওয়া হয়। তারা হলো: সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মুহিউদ্দিন আহমেদ, বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ।

এই বিচারের রায় আংশিক কার্যকরের মাধ্যমে দেশ ও জাতি দায়মুক্ত হলো। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য ছয় আসামি পলাতক। তারা হলো : খন্দকার আবদুর রশিদ, শরীফুল হক ডালিম, এ এম রাশেদ চৌধুরী, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী, আবদুল মাজেদ ও মোসলেম উদ্দিন। এদের মধ্যে লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আব্দুর রশিদ (বরখাস্ত) লিবিয়া ও বেলজিয়ামে অবস্থান করছে। বেশিরভাগ লিবিয়াতে থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। লে. কর্নেল (অব.) শরীফুল হক ডালিম (বরখাস্ত) পাকিস্তানে অবস্থান করছে বলে জানা গেছে। পাকিস্তান থেকে হংকংয়ে তার যাতায়াত রয়েছে বলে একাধিক সূত্রে প্রকাশ। লে. কর্নেল (অব.) এ এম রাশেদ চৌধুরী (বরখাস্ত) যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে, লে. কর্নেল (অব.) এন এইচ এমবি নূর চৌধুরী (বরখাস্ত) কানাডায় রয়েছে। অপর দুজন ভারতে কারাগারে আটক বলে জানা গেছে। এরা হলো ক্যাপ্টেন (অব.) আব্দুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন। *(দ্র. দৈনিক জনকণ্ঠ, ১৭ জানুয়ারি ২০১০, ঢাকা।)

আর এদিকে বিদেশে পালিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং একই সঙ্গে তাদের ভিসা ও পাসপোর্ট না দেওয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সব দেশকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।* (গত ২১ নভেম্বর ২০১২ তে সচিবালয়ে টাস্কফোর্সের সভার শেষে সাংবাদিকদের কাছে দেয়া সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদের তথ্য)।

 স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে এদের খোঁজে ১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল রেড অ্যালার্ট জারি ছাড়াও অপারেশন সার্চলাইট ঘোষণা করেছে। এদের দেশে ফেরত আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ হেডকোয়ার্টারের পৃথক দুটি টিম কাজ শুরু করে এবং ৪৬টি মিশনে অ্যালার্ট দেয়। খালেদা-নিজামী জোট সরকার ক্ষমতায় এসে ইন্টারপোল রেড অ্যালার্টের নোটিশ থেকে তাদের নাম মুছে ফেলে।

পুনরায় তাদের নামে আন্তর্জাতিক রেড অ্যালার্ট দেওয়া হয়। রেড নোটিশের নম্বর হলো : এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী রেড নোটিশ কন্ট্রোল নম্বর এ-১৮৩৬/১-২০০৬, এম রাশেদ চৌধুরী রেড নোটিশ নম্বর এ-২৬১৯/৮-২০০৯, খান মোসলেহউদ্দিন রেড নোটিশ কন্ট্রোল নম্বর এ-২৬২০/৮-২০০৯, আব্দুর রশিদ খন্দকার রেড নোটিশ কন্ট্রোল নম্বর এ-১১৮১/৬-২০০৯, শরীফুল হক ডালিম রেড নোটিশ কন্ট্রোল নম্বর এ-২৬১৯/৮-২০০৯, আব্দুল মাজেদ রেড নোটিশ কন্ট্রোল নম্বর এ-১৮৩৭/৬-২০০৯।* (দ্র. জাতীয় দৈনিক, ২১/১২ ডিসেম্বর ২০১১, ঢাকা।)

পাঁচ খুনির ফাঁসি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পলাতক খুনিরা এখন উদ্‌গ্রীব ও অস্থির। দ্রুত পাল্টাচ্ছে তাদের অবস্থান। উল্লেখ্য, বাকি একজন আজিজ পাশা মারা গেছেন জিম্বাবুয়ে। আবার কেউ কেউ বলছেন, খুনের হাত থেকে বাঁচার জন্য এই প্রচার করা হচ্ছে।

হত্যাকারী সবাই প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তা। ১৯৭৬ সালের ৮ জুনে প্রকাশিত এক সরকারি গেজেটের পরিপ্রেক্ষিতে তারা ১২ জন বিভিন্ন দূতাবাসে নিয়োগ পেয়েছিল।

১। লে. কর্নেল শরীফুল হক ডালিম/ প্রথম সচিব / চীন

২। লে. কর্নেল আজিজ পাশা/ প্রথম সচিব / আর্জেন্টিনা

৩। মেজর মহিউদ্দিন/ দ্বিতীয় সচিব/ আলজেরিয়া

৪। মেজর শাহরিয়ার রশিদ/ দ্বিতীয় সচিব/ ইন্দোনেশিয়া

৫। মেজর বজলুল হুদা/ দ্বিতীয় সচিব/ পাকিস্তান

৬। মেজর রশিদ চৌধুরী/ দ্বিতীয় সচিব/ সৌদি আরব

৭। মেজর নূর চৌধুরী/ দ্বিতীয় সচিব/ ইরান

৮। মেজর শরিফুল হোসেন/ দ্বিতীয় সচিব/ কুয়েত

৯। ক্যাপ্টেন কিসমত হাশেম/ দ্বিতীয় সচিব/ আবু্ধাবি

১০। লে. খায়রুজ্জামান/ তৃতীয় সচিব/ মিশর

১১। লে. আব্দুল মাজেদ/ তৃতীয় সচিব/ সেনেগাল

১২। লে. নাজমুল হোসেন/ তৃতীয় সচিব/ কানাডা। *

(দ্র. বাংলাদেশ গেজেট, ৮ জুন ১৯৭৬)

‘অনেক দেশ তাদের নিয়োগ মেনে নিলেও ভিয়েতনাম, পোল্যান্ড কোনো খুনিকে গ্রহণ করেনি। এমনকি পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানও একজনকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়’। *(দ্র. দৈনিক ইত্তেফাক, ২৮ জানুয়ারি ২০১০, ঢাকা।)

কানাডায় খুনি নূর চৌধুরী, পর্ব-২

https://www.facebook.com/cbn24.ca/

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
CBN-Leaderate