অভিবাসীদের সুখ-দুঃখ এবং মানসিক স্বাস্থ্য (পর্বঃ এগারো)

920
লেখকঃ মো. সাইফুল আলম
AdvertisementLeaderboard

মো. সাইফুল আলম

।। টরন্টো, কানাডা থেকে ।। 

আমরা যারা বাইরে থাকি তাদের একটা চিরাচরিত অভিযোগ শুনতে হয়, তা হল আমরা স্বার্থপর হয়ে যাই যখন দেশের বাইরে আসি। বিশেষ করে আমরা আর দেশের বা বন্ধু বান্ধবদের বা পরিবারের আর কোন খোঁজ খবর রাখিনা। কিন্তু আমার মনে হয়, অনেক ক্ষেত্রে অভিবাসীরা দেশের বা পরিবার ও বন্ধুদের বেশি খবর রাখে, কারণ বাইরে আসলে অভিবাসীরা বুঝতে পারে দেশের বা দেশের মানুষের প্রতি মায়া কত। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে।

কিছুদিন আগে এক সূত্রের মাধ্যমে জানলাম কানাডাতে এখন প্রায় লাখ খানেক বাংলাদেশি থাকে। তারা প্রত্যেকেই একটা ভাল কিছুর আশায় কানাডাতে আসে। মানুষ কেন কানাডাতে আসে, এর কারণ বলতে গেলে অনেক। এর কিছু আমি আমার আগের লেখাগুলোতে উল্লেখ করেছি। একেক ব্যক্তি একেক কারণে কানাডাতে আসে। আমি বাংলাদেশে একটা ইন্টারন্যাশনাল NGO’তে ভালো পদে জব করতাম কিন্তু তারপরও কানাডাতে আসার কারণ ভাল কিছুর প্রতাশা। আমার জানামতে, এখানে অনেকে আছেন যারা বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি, ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে জব করতেন, তারপরও এখানে এসেছেন। কানাডাতে আসার পর বলতে গেলে আমাদের সবাইকে কিছু চ্যালেঞ্জে পরতে হয়, আমি তার মধ্যে ১০টা এখানে আলোচনা করবো আমার অভিজ্ঞতার আলোকে। আপনি যদি google করেন তাহলেও দেখতে পাবেন। তবে আমি বাংলাদেশিদের আলোকে আলোচনা করবো আমার প্রানপ্রিয় বাংলা ভাষায়। আবার অনেক জায়গায় আপনি এ সম্পর্কে তথ্য পাবেন, তবে বেশির ভাগই ইংরেজিতে এবং সেটা আমাদের অনেকেরই হৃদয় ছুঁয়ে যায়না। আবার এর সাথে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করতে পারেন, আবার অনেকেই এই সমস্যাগুলোর সবগুলোয় নাও পরতে পারেন।

গত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুনঃ অভিবাসীদের সুখ-দুঃখ এবং মানসিক স্বাস্থ্য (পর্বঃ দশ)

আমার নিজের কাছেও মনে হচ্ছে, আমি শুধু এখানে কী সমস্যা হয় তা আমার লেখাগুলোতে আলোচনা করছি, কিন্তু এখানে যে অনেক অনেক সুবিধাও আছে তা আমি একেক করে, পরে আলোচনা করবো। সত্যিই এখানে এত ভালো কিছুর সুযোগ আছে তা আপনি আর কোথাও পাবেন না। আমার এই বিষয়গুলো আলোকপাত করার কারণ, নতুন অভিবাসীদের জীবনের যাত্রাটা যদি একটু মসৃণ হয় এই কানাডাতে এসে। আমি খেয়াল করেছি, আমরা বাংলাদেশিরা যেই সময়ে এখানে এসে কোথায় থাকবো, কী করবো, এই নিয়ে চিন্তা করি, ঠিক একই সময়ে ইন্ডিয়ান বা চাইনীজরা কাজে নেমে পরেন। তারা আমাদের তুলনায় অনেক অনেক এগিয়ে সবকিছুতে, তাই এই বিষয়গুলো আলোকপাত করে একটু যদি কারও উপকারে আসে তাহলেই আমার সার্থকতা। আমি জানি, আমাদের সবারই সমস্যার ধরণ আলাদা আলাদা হয়, তাই এগুলো যে সবার ক্ষেত্রে একই হবে তা নয়, এগুলো ব্যক্তি ভেদে আলাদা আলাদা হবে।

এক. থাকার জায়গাঃ

কানাডা তে আসার পর বা আসার আগে সবারই প্রথমে একটা থাকার জায়গা খুঁজে বের করতে হয়। আমার জানামতে অনেকে আছেন, যারা বাংলাদেশ থেকে এখানে তাদের পরিচিত কাউকে দিয়ে তাদের জন্য স্থায়ী বা অস্থায়ী ভিত্তিতে বাসা বাড়ি ঠিক করে থাকেন। আপনার নিকটাত্মীয় থাকলে তো আর সমস্যা নাই। এখানে অনেকে বা অনেক জায়গায় কিছু দিনের জন্য আপনি সহজে থাকার জায়গা বের করতে পারেন। এখানে বিভিন্ন ধরণের rest house/guest house আছে যেখানে আপনি কিছুদিন অনায়াসে থাকতে পারেন। (আপনি গুগল করে সার্চ করতে পারেন, আপনি কোথায় থাকবেন, কত টাকা লাগবে, আবার এখানে বিভিন্ন দোকানে বিজ্ঞাপন দেখা যায় অস্থায়ী ভিত্তিতে ভাড়া দেওয়ার জন্য)। অনেকে আবার ব্যক্তিগতভাবে তাদের বাসাবাড়ি ভাড়া দিয়ে থাকেন কিছু দিনের জন্য। আবার অনেকে বিভিন্ন গ্রুপ এর সাথে যুক্ত থেকে সেখানে সাহায্য কামনা করেন (যেমন BCCB, SILL)।

আপনি যদি স্থায়ী বাসা খোঁজেন প্রথম থেকে, তাহলে আপনাকে আপনার পরিচিত জনের মাধ্যমে বাসা ঠিক করতে হবে। বিষয়টি সহজ হয়, যদি আপনি জানেন আপনি কোথায় থাকবেন এবং আপনার পরিচিতজনের আন্তরিকতা। বাসা ভাড়ার ক্ষেত্রে দুই মাসের (প্রথম এবং শেষ মাসের) ভাড়া জমা দেয়া লাগে। সঙ্গে তারা আপনার PR card কপি, আপনার পাসপোর্ট এর কপি এবং প্রুফ অফ ব্যাংক বালেন্স দেখতে চান। এটা আপনার পরিচিত জনকে সামাল দিতে হয়, অবশ্যই আপনার সাথে যোগাযোগ করে। তবে অনেকেই বড় সমস্যায় পরেন, কোথায় থাকবেন, যেমন কেউ বাংলাদেশি এলাকায় থাকতে চান, আবার অনেকে বাঙালি থেকে দূরে থাকতে চান। কেউ চান তিনি যেখানে থাকবেন সেখানে যেন নামাজ কালাম পরার মত মসজিদ থাকে, বাঙালি দোকান থাকে সহ আরও অনেক কিছু। একেক জনের একেক ধরণের চাহিদা। এটা আপনি যদি আগে থেকে ভেবে নিলে এখানে এসে আর সমস্যায় পরতে হয় না। আবার অনেকে বলেন, না তারা নিজের আত্মীয়ের বাসায় উঠবেন না, তারা বলে নিজের আত্মীয়ের সাথে থাকার অনেক সুবিধা ও অসুবিধাও আছে যা আমরা সবাই জানি

এখানে এসে আপনি যেখানেই থাকেন না কেন, অনেক কিছু আপনার চোখে পড়বে। চোখে পড়বে এখানকার সব বাড়িই কাঠের দ্বারা তৈরি, অনেক বাড়ি দেখে মনে হবে ইটের তৈরি, আসলে সেটাও এক ধরনের আবরণ। তবে কিছুদিনের মধ্যে জেনে যাবেন কেন এখানকার বাড়িঘর কাঠ দিয়ে তৈরি। আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করবেন, সময়ের ব্যবধান প্রায় ১১ থেকে ১২ ঘণ্টা, বাংলাদেশে দিন তো এখানে রাত, এখানে দিন তো বাংলাদেশে রাত। আপনার প্রায় সপ্তাহ খানেক লাগবে এখানকার সময়ের সাথে অ্যাডজাস্ট হতে (jet lag দূর হতে)। আবার হয়তো আপনি এখানকার সবকিছু দেখে এত চমৎকৃত হবেন যে, এ বিষয়টা তেমন কিছু মনে হবে না (Honeymoon Phase)। আবহাওয়া আরেকটা বড় বিষয়, যেটা আমি পরে আলোচনা করবো। আপনি যদি কোন বাঙালি বা মুসলিম কোন বাড়িতে থাকেন, তাহলে হয়তো আপনি প্রথমে বুঝতে পারবেন না, কিন্তু যখনই আপনি অন্য কোথাও (guest house, government office, community place) এ যাবেন, তখন দেখবেন আপনার বাথরুম এর কাজ সারতে হচ্ছে টিস্যু দিয়ে। আমার মতে বাংলাদেশিদের এতে বড় একটা চ্যালেঞ্জে পরতে হয় এখানে এসে, অনেকে বোতলে করে পানি রাখে যদি কখনও দরকার হয় তাহলে ব্যবহার করে। আবার এখানকার অনেক বাথরুম পানি ব্যবহার উপযোগী করে তৈরি না (অনেক বাথরুম কাঠের দ্বারা তৈরি থাকে)। এটা আবার কালচার এর মধ্যেও পরে, কারণ এখানকার লোকজন এই সমস্ত কাজ সমাপ্ত করার পর পানি ব্যবহার করে না। কেন করেনা সেটারও অনেক অনেক কারণ আছে, গুগল করলে বিস্তারিত জানা যাবে।

আবার আপনি এখানে এসে গভর্নমেন্ট বাড়ির জন্য আবেদন করতে পারেন। যত তাড়াতাড়ি পারা যায় আবেদন করা ভালো গভর্নমেন্ট বাড়ির জন্য। গভর্নমেন্ট বাড়ির সুবিধা হল আপনাকে বাসা ভাড়া কম দিতে হয়। টরেন্টোতে বাসা ভাড়া নিতে গেলে যেখানে আপনাকে ৮০০ থেকে ১২০০ ডলার লাগে লাগে এক রুম বাসা নিতে, সেখানে গভর্নমেন্ট বাড়িতে আপনি ১০০ থেকে ৩০০ ডলারই থাকতে পারেন। তবে বাস্তবতা হল আপনাকে গভর্নমেন্ট বাড়ি পেতে গেলে অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে, বিশেষ করে টরেন্টো বা তার আশেপাশের এলাকায়। তবে আমি শুনেছি টরেন্টো এর বাইরে অন্যান্য প্রদেশে সহজে গভর্নমেন্ট বাড়ি পাওয়া যায়। আপনি যদি গভর্নমেন্ট বাড়ির চিন্তা করেন তাহলে আগে থেকে ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেবেন। টরেন্টোতে গভর্নমেন্ট বাড়ি পেতে মিনিমাম ৬-৭ বছর লাগে। তবে সেক্ষেত্রে আপনি কোথায় থাকবেন তাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আপনি যদি আপনার পছন্দ টরেন্ট এর একটু বাইরে দেন, তাহলে যত তাড়াতাড়ি পাবেন, আবার যদি আপনি টরন্টো মূল শহরে  পছন্দ করেন তাহলে আরও দেরি হবে। আমার জানামতে অনেকে গভর্নমেন্ট বাড়ি পাওয়ার পরও সেখানে যায়নি, কারণ অন্যান্য অসুবিধার জন্য (বাচ্চার লেখাপড়া, বাঙালি খাবার-দাবার বা লোকজন নাই বা কম)। আবার গভর্নমেন্ট বাড়িতে থাকার একটা অপকারিতা আছে তা আমি অভিবাসীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও ট্র্যাপ এই বিষয়ে আগে আলোচনা করেছি।

এখানে এসে আপনার আয়ের/টাকার সিংহ ভাগই যায় বাসা ভাড়াতে। আপনি এখানে এসে প্রথমে আপনার টাকাকে ডলারে কনভার্ট করবেন আবার ডলারকে টাকাতে কনভার্ট করবেন, আর ভাববেন, এত টাকা বাসা ভাড়া যায় বাংলাদেশি টাকায়। আপনি কোন কিছু কিনতে গেলে ভাববেন এত টাকা, একটা সামান্য কফি কিনতে আপনার লাগবে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১০০০ টাকা, তবে আমি এও শুনেছি বাংলাদেশে এখন অনেক জায়গায় কফি খেতে একই পরিমান টাকা লাগে। বাসা ভাড়া প্রায় বলতে গেলে একই রকম।

আপনার পেশা বা ইচ্ছা অনেক ভূমিকা রাখে কোথায় থাকবেন সেই সিদ্ধান্ত নিতে। আপনার পরিচিত একজন টরন্টো থাকে, তাই আপনিও চাইবেন টরন্টো থাকতে। ইঞ্জিনিয়ারদের অনেকে যেমন এক সময় Alberta যেত, এখন অনেক কমে গেছে। আবার আপনি যদি ফ্রেঞ্চে বেশি আগ্রহী হন, বা লেখাপড়া বা ডে কেয়ার সুবিধা নিতে চান তাহলে, কুইবেক সিটি বা মন্ট্রিয়ল ভাল। আবার অনেকে সহজে জব এবং গভর্নমেন্ট বাড়ি পাওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রদেশে যায়। আমার মতে টরন্টো হচ্ছে বাংলাদেশে ঢাকা শহরের মত। এখানে কাজের সুযোগ বেশি, আবার সমস্যাও বেশি, বিশেষ করে আপনি যদি মানুষ নিয়ে কাজ করতে চান। আমার জানামতে অনেকে কিছুদিন থাকার পরে আবার অন্যান্য প্রদেশে থেকে টরন্টোতে চলে আসে ভাল কাজের আশায়। আমি মনে করি, শুধুমাত্র গভর্নমেন্ট বাড়ির আশায় কোন বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক না। আবার এখানে অনেকে সেই মন্ট্রিয়লকে একই পর্যায়ে ভাবে, যেটা আরেক কাহিনী (গুগল করলে পাবেন)।

এখানে আসার পর আপনি বিভিন্ন ধরনের কমিউনিটি এজেন্সির সাহায্য নিতে পারেন। গভর্নমেন্ট এই সমস্ত কমিউনিটি এজেন্সিকে ফান্ড প্রদান করে থাকে নতুন অভিবাসীদের সাহায্য করার জন্য। অনেক সময় আপনি এয়ারপোর্টে এই ধরনের একটা কমিউনিটি সার্ভিসগুলোর লিস্ট এবং কোথায় কী ধরণের সুবিধা পাবেন তা উল্লেখ থাকে। আমার জানামতে অনেকে এই ধরণের কমিউনিটি সার্ভিসগুলোর প্রতি নেগেটিভ ধারনা পোষণ করে থাকে। এটা সত্য যে তারা আপনার তথ্য (যেমন PR card) চাইবে যখন আপনি তাদের কাছে সাহায্যর জন্য যাবেন, কারণ তাদের এটা রিপোর্ট করতে হয় বলে। কিন্তু তাই বলে তারা যে আন্তরিক না তা নয়। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যারা এই সমস্ত কাজগুলি তারা করে, যাদের মানুষকে সাহায্য করার মন মানসিকতা আছে। আবার অনেক কমিউনিটি এজেন্সি বিনা বেতনে তাদের কমিউনিটিকে সাহায্য করার জন্য নিবেদিত থাকে। এখানে এসে মনে হতে পারে, সবাই খুব ভাল লোক। কথাটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সত্য, তবে এখানেও আপনার কিছু বাজে অবস্থায় পরতে হতে পারে।

আরেকটা বিষয় আপনি খেয়াল করবেন, বাড়ি কেনাকাটার হিড়িক, আজকে এখানে বাড়ি কিনেছে তার দাম ওত, কালকে আরেকজন, আপনার মনেও একটা ইচ্ছা থাকবে, কবে আপনার নিজের বাড়ি কিনতে পারবেন। অনেক সময় অবচেতন মনে একটা বাসনা তৈরি হবে। এই বাসনা যে খারাপ তা না। এর সাথে আপনি প্রথমে অনেক অনেক দাওয়াত পাবেন বিভিন্ন বাড়িতে, একেক জায়গায় যাবেন, তারা তাদের মত করে কেন তারা এই জায়গায় আছে তা ব্যাখ্যা করবে। আমি নিজে দেখেছি, যে যেই জায়গায় থাকে বা বাড়ি কিনে, তার সেই এলাকা সম্পর্কে অনেক ভাল ভাল সুবিধার কথা বলবে। এটা এমন যে, যারা সিগারেট খায় তাদের যদি আপনি জিজ্ঞাসা করেন, আপনি কেন সিগারেট খান? তারা দেখবেন হাজার হাজার কারণ ব্যাখ্যা করবে। বিষয়টি আমাদের চেতন বা অবচেতন মনের কারসাজি, যা আমাদের সবারই বেঁচে থাকার জন্য খুব জরুরি। আরেকটা বিষয় আপনাকে খুবই মনে রাখতে হবে, সেটা হল আপনি কোথায় থাকবেন, কোথায় যাবেন তার ইন্টারসেকশন। এখানে সবাই জানতে চাইবে, আপনি কোন কাছের ইন্টারসেকশনে থাকেন।

চলবে…………

আগামীকাল পড়ুন- পর্বঃ বারো
লেখকঃ সমাজকর্মী, কানাডিয়ান মেন্টাল হেলথ অ্যাসোসিয়েশন ডারহাম।
Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email