অভিবাসীদের সুখ-দুঃখ এবং মানসিক স্বাস্থ্য (পর্বঃ পাঁচ)

লেখকঃ মো. সাইফুল আলম
AdvertisementLeaderboard

মো. সাইফুল আলম

।। টরন্টো, কানাডা থেকে ।। 

আমার আগের লেখাতে মানসিক স্বাস্থ্য ও অভিবাসীদের সুখ দুঃখ নিয়ে বলতে গিয়ে Sandwich Generation এর কথা বলেছিলাম। Sandwich Generation বলতে সাধারণত ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সকে বুঝায়। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময় সবার জন্য, এটা আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে অভিবাসীদের ক্ষেত্রে। আমাদের প্রত্যেকের জীবনে এই সময়টা খুবই গুরুত্ব বহন করে। আপনি অনেক struggle করে লেখাপড়া শেষ করে কর্ম জীবনে প্রবেশ করলেন এবং সাথে সাথে পরিবারের দায়িত্ব বেড়ে যায়। মানুষের আশা প্রত্যাশাও অনেক বেড়ে যায়, যেই আপনি একটা মোটামুটি ভাল অবস্থানে আসলেন, আর তখনই আরও ভালো কিছু, ভালো প্রত্যাশা নিয়ে বাইরের দেশে আসলেন। যখন দেখলেন আপনার প্রত্যাশার সাথে বাস্তবতার অনেক অমিল, তখনই আপনাকে বিষণ্ণতা গ্রাস করে নিলো।

Sandwich এর যেমন দুই দিকে bread থাকে আর মাঝখানে থাকে আপনার প্রিয় জিনিসটি (ডিম, চিস বা অন্য কিছু) ঠিক তেমনি আপনিও মাঝের অবস্থানে, যেখানে আপনার খেয়াল রাখতে হয় আপনার পিতামাতার ও পরিবারের সদস্যদের (সেটা বাংলাদেশে কিংবা অন্য কোথাও হোক না কেন), আবার আপনার দায়িত্ব থাকে বাচ্চাদের গড়ে তোলার। মানুষ এই সময়টাতে নিজের প্রতি খেয়াল রাখেন কম, ব্যস্ততার জন্য। তারপর যদি আপনি একটা প্রতিষ্ঠিত career ছেড়ে আবার নতুনভাবে শুরু করতে হয় তাহলে তো আর কথা নাই। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ এই বয়সে সবচেয়ে বেশি চাপে থাকে। আবার এর সাথে শুরু হয় আরেক নতুন চাপ। বাঁচবেন কেমনে, অনেকে এই চাপকে সামলে নিয়ে সফলতা পায়। আর অনেকে আবার ট্র্যাপ এর মধ্যে পরে যায়। তবে প্রতিকূল অবস্থা তৈরির জন্য আপনার সাপোর্ট এবং systematic প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা ভূমিকা রাখে যা আমরা সবাই কমবেশি জানি।

গত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুনঃ অভিবাসীদের সুখ-দুঃখ এবং মানসিক স্বাস্থ্য (পর্বঃ চার)

Identity Crisis ও ভূমিকা পরিবর্তন– কিছুদিন আগে একটা স্ট্যাটাস শেয়ার করেছিলাম, আপনি কে সেটা কিছু শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করতে। খুব বেশি যে রেসপন্স পেয়েছিলাম তা নয়, কারণ এখন সবাই ব্যস্ত আর কমেন্ট করার মত মানুষের ধৈর্য ও সময় নাই। যারা কমেন্ট করেছিল তারা খুব চিন্তাভাবনা করে কমেন্ট করেছিল। আসলে আমার আলোচনার বিষয় সেটা ছিলনা, আমার আলোচনার বিষয় হল identity crisis এবং অভিবাসী। আমি identity crisis জানতে গিয়ে দেখলাম এই বিষয়টা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে পৃথিবীর অনেক দেশে, বিশেষ করে যেসব দেশে অভিবাসী বেশি। প্রতিনিয়ত আমাদের identity change হচ্ছে। আজকে আমি বালক তো কয়েকদিন পর প্রাপ্ত যুবক, আজকে ধনী তো কালকে গরিব, আজকে অবিবাহিত বা স্বাধীন তো কালকে বিবাহিত বা পরাধীন। আজকে বাংলাদেশি তো কালকে Canadian, বাবা মা, চাকুরীজীবী, বেকার, ছাত্র, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বা রাজনীতিক ব্যক্তি।

কয়েকদিন আগে একটা মেসেজ পেলাম আমার ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে। তিনি আমাদের সাউথ এশিয়ান ৩৫ বছরের তরতাজা যুবক দুই বাচ্চার বাবা, হঠাৎ করে রেগুলার চেক আপ করতে গিয়ে জানতে পারে তার হার্টে ৪ টা ব্লক হয়েছে, যেকোনো সময় হার্ট অ্যাটাক হতে পারে, ডাক্তার সঙ্গে সঙ্গে ভর্তি করিয়ে ৪ টা bypass and open heart surgeries করেছে। এখন সে ধীরে ধীরে সুস্ত হচ্ছে, আমাকে জানানোর কারণ, সে আর ভাড়া দিয়ে থাকতে পারবেনা কারণ সে কোন গভর্নমেন্ট বা এমন জব করতনা যেখানে অন্যান্য benefits আছে, সে contract basis কাজ করতো। সে এখন আবার তার বাবা মার সঙ্গে থাকবে যতদিন না সুস্থ হয়। সে জীবনে কোনদিন cigarette বা অন্যান্য নেশা জাতীয় কিছুই গ্রহণ করেনি, সে নিয়মিত ব্যায়ামও করত। তাই ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করেছে কেন তার এই অবস্থা হল। ডাক্তার যেটা বলল সেটা অনেকটা surprising এবং নতুন বলে মনে হয়েছে, ডাক্তার বলেছে আমরা যারা সাউথ এশিয়ান থেকে এসেছি তাদের এই সমস্যাটা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, কারণ আমাদের হার্টে যে শিরাগুলো থাকে সেটা অনেকটা চিকন হয়, আর সেই অনুযায়ী আমাদের খাবার দাবার হয়। কিন্তু যখন আমরা এখানে এসে চিস সহ অন্যান্য চর্বি জাতীয় খাবার খাই সেটা আমাদের শরীরে অ্যাডজাস্ট হয়না, ফলে তার হার্টে ব্লক তৈরি হয়। আমার কাছে বিষয়টা নতুন মনে হয়েছে তবে যারা এটা নিয়ে research করেছে তারাই ভাল বলতে পারবে।

এবার আসি, বিভিন্ন ধরনের identity crisis নিয়ে। নামের কারণে হতে পারে। কয়েকদিন আগে একটা article দেখলাম যেখানে বলা হয়েছে আমাদের এশিয়ানরা তাদের নামের কারণে অনেক জবে প্রাথমিকভাবে বিবেচিত হন না। আমি শুনেছি অনেক employers পোস্টাল কোড চেক করে তাদের employee নিয়োগের ক্ষেত্রে। আবার আমাদের নামের আগে মোহাম্মদ থাকলে যে কি সমস্যা হয় তা আমাদের সকলের কিছু ধারনা আছে। আবার আপনি যদি মোহাম্মদকে সংক্ষেপে MD লেখেন তাহলে কি ধরনের বিড়ম্বনায় পরতে হয় তাও আমরা জানি, বিশেষ করে তথাকথিত উন্নত দেশে (অথবা বাস্তবে উন্নত দেশে)।

খাবারের ক্ষেত্রে তো বললামই, হালাল বা দেশি খাবার না বিদেশি খাবার। সবচেয়ে বড় যেটা সেটা হল আমি কে? কানাডার নাগরিক না বাংলাদেশের বা দ্বৈত। শুধু কি নাগরিক না মনে প্রাণে নাগরিক, কেউ বলে বেশিরভাগই মনে প্রাণে কোন দেশের নাগরিক হতে পারেনা, আমার মনে হয় সেটাই স্বাভাবিক। আপনি একটা যায়গায় অনেকদিন থাকলে তার প্রতি আপনার মায়া হবে, তা তো অস্বীকার করা যায়না। আবার জোর করে আপনি নিজেকে কখনও পরিপূর্ণভাবে কোন দেশের সত্যিকারের নাগরিক হতে পারবেন না। বললাম না আমার কাছে এটাই স্বাভাবিক।

বাচ্চাদের বাংলা শেখা, এটা নিয়ে অনেক পিতামাতা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। অনেকে মনে করে আমার বাচ্চা এখন কানাডিয়ান, বাংলা শিখে কি হবে। এটা আসলে প্রতেকের নিজস্ব সিদ্ধান্ত, তবে যারা তাদের বাচ্চাদের বাংলা শেখান তাদের যুক্তিটা ফেলে দেওয়ার নয়। আবার যারা তাদের বাচ্চাদের শুধু ইংলিশ শেখান তাদেরও নিজস্ব যুক্তি আছে। আমাদের লাইফ কিন্তু যুক্তি ছাড়া চলেনা। আমি এই বিষয়ে আরেকদিন আলোচনা করব কারণ এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও বড় বিষয়। আপনি যেই সিদ্ধান্ত নেন না কেন আপনি যদি জানেন আপনি কেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাহলে আর কোন কথা নেই। কিন্তু আপনি যদি মনে করেন কি জানি সবাইতো তাই বলে, তাহলে আমি বলবো বিষয়টা নিয়ে একটু আরেকটু ভাবার প্রয়োজন আছে। আপনাদেরও মতামত জানতে চাই।

চলবে…………

আগামীকাল পড়ুন- পর্বঃ ছয়
লেখকঃ সমাজকর্মী, কানাডিয়ান মেন্টাল হেলথ অ্যাসোসিয়েশন ডারহাম।
Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email