আদার যত গুন

1085
AdvertisementLeaderboard

মসলা যখন নিরামক

উপরের নামটি দেখে এর অর্থ স্পষ্ট বোঝা যায় যে এখানে আলোচনার মূল্য বিষয়বস্তু হলো যেসব মসলা এবং রান্নায় ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ যা আমরা নিয়মিত খেয়ে থাকি সেগুলোর বিষয়ে আলোকপাত করা। ওষধি গুনাবলী সম্পন্ন মসলাগুলোর তালিকা তৈরী করা হলে নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় তালিকা হবে। তবে এখানে খুবই প্রচলিত মসলা ‘আদা’ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে যার রয়েছে একাধিক রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা।

আদা (Ginger)

উদ্ভিজ্জ নাম ( Botanical name): Zingiber officinale

পরিবার (Family): Zingiberaceae

এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আদা রান্নার একটি মূল উপকরণ। এটি কুলিনারির মূল উপকরণ হলেও এটির রয়েছে নানাবিধ ব্যবহার। এতে জিনজেরোল নামক শক্তিশালী ওষধি বস্তু রয়েছে যেটি বিভিন্ন রোগের হারবাল নিরামক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

আদার কিছু বিশেষ ওষধি ব্যবহারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ

১.  বমি ভাব এবং মর্নিং সিকনেস দূরকরনে ভূমিকা (Nausia and Morning Sickness)

দেড় থেকে দুই গ্রাম আদার ব্যবহার বমি বমি ভাব এবং মর্নিং সিকনেস দূর করতে খুব প্রচলিত। বিভিন্ন প্রকার বমি ভাব যেমন অপারেশন পরবর্তী মাথা ঘুরানো এবং বমি বমি ভাব, বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের মর্নিং সিকনেস দূর করতে এটি খুব কার্যকর ভূমিকা রাখে। (তবে গর্ভবতী মায়েদের যে কোনো ধরণের ঔষধ সেটা হারবাল হোক অথবা নন হারবাল হোক না কেন তা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া সেবন করা উচিত নয়। কারণ অনেক সময় যে কোনো ঔষধের মাত্রাতিরিক্ত বাবহার শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার উদ্রেক ঘটাতে পারে।)  

ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীরা যারা কেমোথেরাপির মধ্য দিয়ে যান এদের জন্যও এটি কার্যকর বলা হয়।  বলা হয়, এটি কোনো কোনো ক্যান্সার সেলের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে করে

২. পেশীর ব্যথা উপশমে (Muscle Pain)

দুই গ্রাম আদা প্রতিদিন সেবন করলে পেশীর ব্যথা কমতে শুরু করে। যারা শারীরিক ব্যায়াম বিশেষ করে ভার উত্তোলনের জন্য পেশীর ব্যথায় ভোগেন তাদের জন্য এটি কার্যকর। আদা সেবনে তাৎক্ষণিক কোনো ফলাফল পাওয়া যায়না তবে তা নিয়মিত সেবনে উপলদ্ধি করা যায়।  

৩. ওজন বা মেদ কমাতে (Losing Weight):  

এক ইঞ্চি পরিমান আদা দু/তিনটি ত্বক যুক্ত লেবুর সাথে মিশিয়ে (Blend) নিন। তবে মেশানোর আগে খুব ভালো করে উপকরণগুলো ধুয়ে নিতে হবে। প্রতিদিন এটি পান করলে দ্রুত এর ফল উপলদ্ধি করা যায়। তবে তৈলাক্ত ও চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে। যাদের শারীরিক সমস্যা রয়েছে তাদের ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো কিছুই সেবনযোগ্য নয়।  

৪. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে (Control of Diabetes):

এটি প্রায় সবাই জানেন যে, আদার জিনজেরল উপাদান ইনসুলিন উৎপাদনকে সক্রিয় করে এবং এভাবে এটি প্রাকৃতিকভাবে ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে। এটি শুধু ডায়াবেটিস দমন করে না বরং প্রতিরোধ করে, এবং ডায়াবেটিসের কারণে ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তি দেখা দিলে তারও সমাধানে সাহায্য করে।

৫. হৃদরোগ দমনে  (Control of Heart Disease):

নিয়মিত আদা সেবনে হৃদরোগ এবং মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

৬. হজমজনিত সমস্যার সমাধান (Indigestion) :

প্রাচীন কাল থেকেই পেটে ব্যথা, বদ হজমের জন্য আদার রসের প্রচলন রয়েছে। নানা প্রকার হজমজনিত সমস্যায় এটি প্রাকৃতিকভাবে উপসর্গ নিরাময় করে। এটি নিজেই ঝাঁজযুক্ত কিন্তু এটি প্রদাহ দূর করে।

৭. আলসার এবং গলা বুকজ্বালা  নিয়ন্ত্রণ (Ulcers and GERD)

বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছে যে আদার রস পাকস্থলীর আলসার এবং গ্যাস্ট্রিকজনিত গলা ও বুক জ্বালা (GERD)  নিয়ন্ত্রণ করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে একটি জার্নালে (মলিকুলার নিউট্রিশন এন্ড ফুড রিসার্চ) এ প্রকাশিত হয়েছে যে, আদার রস গ্যাস্ট্রিকজনিত গলা ও বুক জ্বালা (GERD) নিয়ন্ত্রণে সাধারণভাবে ব্যবহৃত ওষুধের তুলনায় ছয় থেকে আটগুণ বেশি কার্যকর।

৮. ছত্রাক নিয়ন্ত্রণে (Control of Fungal Infection):

ছত্রাকজনিত সংক্রমণে আদার ব্যবহার প্রচলিত। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, আদার এসেন্সিয়াল তেলের সাথে টি ট্রি তেল এবং নারকেল তেলের মিশ্রণ ছত্রাকজনিত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করে।  

৯. ব্যাকটেরিয়া নিয়ন্ত্রণে (Control of Bacteria):

ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ নিয়ন্ত্রণে ঔষধ সেবনের সাথে আদার সেবন বেশি কার্যকর এবং আদার রস রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে বলা হয়।  

১০. ঠান্ডা, সর্দি কাশি ও গলা ব্যথা (Cold and SoreThroat):

আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত ঠান্ডা অথবা জ্বর হলে অথবা খুশখুশে গলা ব্যথা হলে গরম পানিতে আদার রস, মধু, লেবু ও গোলমরিচের গুঁড়ার সাথে মিলিয়ে খেলে দ্রুত উপশম হয়।   

আদা ব্যবহারের পদ্ধতি (Using Process of Ginger):

অনেকভাবেই আদার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সাধারণভাবে ব্যবহারের পদ্ধতিগুলি নিম্নরূপ:

১.  আদার গুঁড়া অথবা আদার পেস্ট অথবা আদা কুচি (Zinger Powder or Paste):

প্রতিদিনের রান্নার সাথে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।

২.  কাঁচা আদার জুস (Raw Ginger Juice):

এক ইঞ্চি পরিমান আদার টুকরা যে কোনো ফল অথবা লেবু, ভেজিটেবল বা শাকসবজির (যেমনঃ পালং শাক) সাথে মিশ্রণ তৈরী করে প্রতিদিন সকালে সেবন করা যায়।

৩. আদা চা (Zinger Tea):

এক ইঞ্চি পরিমান আদার টুকরা গরম পানিতে ফুটিয়ে সে পানিতে চা  তৈরী করা যায়। এতে চায়ের সাথে একটু মধু ও লেবু দেওয়া হলে সেটি আরো উপাদেয় পানীয়তে পরিণত হয়।   

৪. আদার এসেন্সিয়াল তেল (Zinger Essencial Oil):  

মেডিসিন হিসেবে ব্যবহারের জন্য আদার এসেন্সিয়াল তেল সবচেয়ে বেশি কার্যকর কারণ এটিতে জিনজেরল উপাদানটি সর্বাধিক পরিমানে থাকে। দুই থেকে তিন ফোটা তেল সরাসরি খাওয়া অথবা অন্য তেলের সাথে মিশিয়ে বাহ্যিকভাবে আক্রান্ত স্থানে ব্যবহার করা যেতে পারে।  

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ এই লেখার উদ্দেশ্য শিক্ষামূলক। যে কোনো কিছু সেবনের পূর্বে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

[cbn24 এর জন্য এটি লিখেছেন শামিম আরা বেগম]

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email