‘আমরা রেসপন্ড কম, রিয়েক্ট বেশী করি’

1164
হিমাদ্রী রয় (সঞ্জীব)
AdvertisementLeaderboard

হিমাদ্রী রয় (সঞ্জীব)

।। টরন্টো, কানাডা থেকে ।।

এক নারী রেস্টুরেন্টে খাবার অর্ডার দিয়ে খাবারের অপেক্ষা করছেন। হটাৎ লক্ষ করলেন তার কাঁধের ওপর একটা টিকটিকি নড়াচড়া করছে। দেখা মাত্রই লাফ দিয়ে উঠে শুরু করলেন চিৎকার চেঁচামেচি। তার লাফালাফিতে টিকটিকি গিয়ে পড়ল পাশের টেবিলে বসা আরেক নারীর ওপর। তিনিও রীতিমত নাচানাচি শুরু করলেন। শেষ তক টিকটিকি গিয়ে পড়ল খাবারের ট্রে নিয়ে আসা ওয়েটারের ওপর।

ওয়েটার খাবারের ট্রে পাশের টেবিলে রেখে কোন রকম নাচানাচি না করে, নেপকিন হাতে নিয়ে টিকটিকির লেজ ধরে গার্বেজ করে আসলেন নিরাপদ দূরত্বে। হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে, পুনরায় ট্রে হাতে নিয়ে খাবার পরিবেশন করলেন।

গল্প শেষ করে, ওহাব স্যার প্রশ্ন করলেন ক্লাসকে কি বুঝলে? আমরা সবাই উত্তরটাও স্যারের মুখ থেকে আসুক, এমন ভাব নিয়ে চেয়ে দেখছিলাম স্যারের দিকে। স্যার বুঝালেন, রিয়েক্ট আর রেসপন্ডের পার্থক্য। রেস্টুরেন্টে দুই নারী যেটি করছিলেন তা হলো রিয়েক্ট আর ওয়েটার যা করলেন সেটি হলো রেসপন্ড। দায়িত্বশীলতা।

আজকাল যে কোন ঘটনায় আমরা রেসপন্ড কম রিয়েক্ট বেশী করি। গেল কয়েক সপ্তাহে বনানী ধর্ষণ কাণ্ড নিয়ে লেখালেখিতে আমরা রিয়েক্ট করে যাচ্ছি অনবরত। তার ওপর অমিতজির ‘পিঙ্ক’ ছবি দেখে, নারীর অধিকার নিয়ে আমাদের বক্তব্য হয়ে উঠেছে আরও ক্ষুরধার। ‘নো মিন্স নো’। হোক গার্লফ্রেন্ড, অথবা কোলগার্ল, এমনকি স্ত্রী, কথা শত ভাগ সত্য এবং সহমত। কিন্তু সবই আমাদের রিয়েকশন। এর থেকে উত্তরণের জন্য দায়িত্বশীল হওয়া কি আরও জরুরী নয়? শুধু কি ঘৃণা আর মোমবাতি জ্বালানোর মধ্যে আমাদের দায় শেষ?

নারীর অধিকার নিয়ে সবক দেওয়া যতটা সহজ, আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ততটা সহজ কি?

একুশ শতকের দোরগোড়ায় যেখানে আমাদের নারীরা তথ্যপ্রযুক্তি, এভারেস্ট জয়, অলিম্পিক জয়ে  তাদের প্রতিভা ও সফলতার পা ফেলছে প্রত্যয়ের সাথে, সেখানে আমরা আজও নারীদের অধিকার ও তাদের ইচ্ছাকে বেধে রেখে দিয়েছি। নারীকে এখনও আমরা মানবিকতার চোখে দেখিনা, ইহাই কঠোর বাস্তবতা। আমরা সেই প্রজন্ম, বিশ্ববিদ্যালয় পাশ দিয়ে বিদ্যা বোঝাই হয়েও মস্তিষ্কে রোপিত ধর্মের মন্ত্র দ্বারা, মগজধোলাই হই এবং করি।

স্ত্রী’র সাথে জোর করে সহবাস জায়েজ! ধর্মীয় ব্যাখ্যা এমনটাই বলে। সেক্ষেত্রে স্ত্রী কি ধর্ষিতা নয়? নারীর অধিকার কি ক্ষুন্ন হচ্ছে না তাতে? ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলছে, আমরা তখনও বসে- বিবি তালাকের ফতোয়া খুজছি হাদিস কোরান চষে’। কোন অধিকারে পাশা খেলায় স্ত্রী দ্রৌপদীকে পণ রেখেছিলেন রাজা যুধিষ্ঠির? ধর্মের চাপিয়ে দেওয়া বিশ্বাস থেকে আমরা কি বের হয়ে এসেছি আজও?

এক বড় মানুষের বহু কালের আগের কথা, বাঙালির ভালোবাসা জাগে মশারির নিচে। বাইরে নো মিন্স নো, বলার আগে, পরিবর্তন আসতে হবে নিজের এবং পরিবারের ভিতর থেকে। শুধু ধিক্কার নয়, দাঁড়াতে হবে রুখে।

ছোটবেলায় সাদাকালো টিভিতে ফজলে লোহানী দেখাতেন তার ম্যাগাজিন, ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানে এসিড নিক্ষেপকারীদের তান্ডব। এক সময় এর বিরুদ্ধে সামাজিক বিপ্লব আর আইনের কঠোর আবস্থানের কারণে যদি তা নিয়ন্ত্রনে আসতে পারে, ধর্ষণ কাণ্ড বন্ধ হবেনা কেন?

মিডিয়া চড়াও এক বনানী কাণ্ডের পিছনে অথচ সমসাময়িক সময়ে এর চেয়েও নৃশংস ঘটনা ঘটছে, হুজুর কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণ, বালাগঞ্জে সাত মাসের যমজ সন্তানের মা’কে ধর্ষণ, রাজনগরের কলেজ ছাত্রীকে ধর্ষণ, নোওয়াপাড়ায় ধর্ষণ এবং সবাইকে ধর্ষণের পর হত্যা। সর্বশেষ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছয় বছরের শিশুকে ধর্ষণ।

বনানী নিয়ে একই মিডিয়া যতটা সরব, এরই মধ্যে ঘটে যাওয়া এতগুলো ঘটনা নিয়ে তারা ততটাই নিরব? পুলিশ প্রশাসনের এফেসিয়েন্সি চোখে পড়ার মত। সেই কবে কোন শিবির নেতা ফেইসবুকে প্রধানমন্ত্রীকে কটুক্তি করেছিল, সে ধরা পড়েছে সিলেটের বিশ্বনাথ থেকে। শুধু ধর্ষণ কাণ্ডের নাটের গুরুদের ধরার ক্ষেত্রে তাদের চোখে ছানি পড়ে থাকে।  চাপাবাজ মন্ত্রী এক দিনে চার নার্সিংহোমে ভর্তি হওয়া নেতাদের খোঁজ খবর নিতে নিতে ক্লান্ত। আর আতেলরা তাতে, নেতা পারেন বটে বলে বাহবা দিচ্ছে। হায়েনার থাবায় রক্তাক্ত মা বোনদের আর্তচিৎকারে বাতাস ভারি হয়ে উঠলেও কোন দায়িত্বশীল বিবৃতি নেই।

পুরুষের বিকৃত লালসার বলী এতসব লাশের মিছিলে আর কত লাশ যোগ হলে, নারীকে পুরুষের চরণাতলাশ্রয় ছিন্ন করার যুগান্তকারী কোন দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নিবেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী? সময় এসেছে, টিকটিকি নিয়ে নাচানাচি না করে, এর লেজ কেটে ফেলুন।

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email