আমার পরানটা বান্ধা আছে নদীর বালুচরে, যমুনার কাশবনে

927
AdvertisementLeaderboard

মুস্তাফা দুলারী

যে বঙ্গ অববাহিকার আপন আঙিনার পবিত্র জমিনে আমার জন্ম, যে অনিন্দিত অপরূপ সুরুপা, সুজলা-সুফলা, শষ্য-শ্যামলা, তল্লাটের সতেজ তরতাজা আলো বাতাসের আদর মাখা পরশে আমার সুঢাম দেহের মাংশপেশী সুগঠিত ও মজবুত হয়েছে, যে বঙ্গ জননীর অতুলনীয় মাতৃস্নেহে নিবির পরিচর্চায় অমিয় পানীয় শিশুজাত সুষম খাদ্য বুকের দুধ পান করে আমি সবল হয়েছি, সেই আকাশ বাতাস, মাটি, মাতৃভূমি ও মা জননীকে ফেলে কানাডা আসার আগে আমার মনোদৈহিক অবস্থা ছিল ভাঙ্গাচোরা দুর্বল মনমরা ও ভীতু তটোস্থ। কানাডায় চলে আসার ব্যাপারে আমি ছিলাম ভীষণ দোদুল্ল্যমান। কিছুতেই মাতৃভুমি ছেড়ে কানাডায় আসতে ইচ্ছা করছিলো না। আবার স্বপ্নের দেশ স্বর্গরাজ্য কানাডাতে আসার লোভ সামলাতেও পারছিলাম না। উভয়সংকটের যাঁতাকলে পরে আমি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম চরমভাবে। মানসিক রোগী সেঁজে আমাকে মনোবিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে বিষন্নতা লাঘবের বটিকা সেবন করতে হয়েছে বেশ কিছু দিন। অবশেষে প্রাণঘাতী সিন্ধান্ত নিলাম, এসপার না ওসপার, বাঁচি মরি কানাডায় মরবো!

কানাডা আসার বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় আমাকে যেতে হয়েছিলো আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে বিদায়, দেখা-সাক্ষাত ও দোয়া-আশির্বাদ নেওয়ার জন্য। এ যেন দেখা-সাক্ষাত নয়, সে যেন চির বিদায় অনুষ্ঠান! শেষ কান্না! শেষ অশ্রুজল!

তো একদিন আমার অসুস্থ এক অতি বৃদ্ধা ফুপুকে দেখতে দিয়েছিলাম প্রমত্তা নদী যমুনার মধ্যাবস্থিত একটি চরে। সিরাজগঞ্জ শহর থেকে নদীপথে প্রায় ঘন্টা তিনেক পথ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ভাগ্নে আর বড় মামাতো ভাইকে সাথে নিয়ে সকাল সকাল রওয়ানা দিলাম ফুপুর বাড়ীর দিকে।

যমুনার ঘাট থেকে যথা সময়ে নৌকা ছাড়লো। জ্বালানি দ্বারা যন্ত্র চালিত দ্রুতযান শ্যালো নৌকা। স্রোতের প্রতিকূলে যমুনা পাড়ি দিচ্ছি। নৌকা চলছে গতিময় নিজস্ব নান্দনিক সর্পিল ছন্দে। যমুনাকে সেই বাল্যকাল থেকে দেখে আসছি, আজকেও দেখছি নতুন করে নতুন রূপে। চারিদিকে তাকাচ্ছি, যতদূর চোখ যায় অসীম দিগন্তের বাইরে। দৃষ্টির দূরবীনের জালে ধরা পড়ছে যমুনার জলস্রোতের কল কল ছলাৎ ছলাৎ কুলুকুলু ধ্বনির উর্মিমালার জল পতনের ছন্দ। আমি বিমোহিত হয়ে উপভোগ করছি যমুনার দুই পাড়ের দৃষ্টিনন্দন অপরূপ নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিমুগ্ধতা।

শরতের মিষ্টি রৌদ্রোস্নাত সুন্দর সকাল। সূর্য মামার কিরণমালায় যেন পুলকের অতিশয় পরশের আমেজ। চমৎকার অনুকূল শান্তময় সুন্দর আবহাওয়া। সূর্য্যের রোদেলা সোনালী আলো যমুনার জলছন্দে পড়ে কী দারুন চিকচিক চক্ চক্ করছে! যমুনার চেহারায় আজ কোন হিংস্রতা নেই, নেই কোন স্রোতের হুংকার গর্জন। যমুনা আজ পুরোপুরি শান্ত ভদ্র লক্ষ্মী মেয়ে। উথাল পাথাল উত্তাল ঢেউ নেই, সরব গর্জনের হুমকি ধামকি নেই। নদীর তীর ভাঙ্গনের আগাম ঘোষণা নেই, প্রমত্তা স্রোতের  তর্জনের হুমকি নেই।

যমুনার টলটলে বালুময় শুভ্র বিশাল জলরাশি, উর্মিমালার কুলুকুলু ধ্বনি, জলতরঙ্গের মায়াবিনী বিমুগ্ধ গুঞ্জন আমার কানে বাজছে সুরের ঝংকার হয়ে। আহা! আমি তন্ময় হয়ে যাচ্ছি জলস্রোতের ছান্দসিক জলকেলির জলখেলার মাধুর্য দেখে। ঐ দূরে চরের মোহনার তীর ঘেঁষে ভেসে বেড়াচ্ছে বাঁলিহাঁসের দল। দেখছি, রুপালী নদীর বাঁকে বাঁকে জেগে উঠেছে নতুন বালুচর, সেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে অগনিত গাংচিল, পানকৌড়ি, মাছরাঙা, বুনোহাঁস, চখা, সারস, বক, চর শালিক, পাতিহাঁস দলবেঁধে কিচির মিচির করছে, ওদের আপন আঙ্গিনায় পরম সুখে। তা দেখে আমার কতই না ভালো লাগছে! আমি শুধু তন্ময় হয়ে যাচ্ছি সেই দৃশ্যাবলী দেখে ।

দুষ্টু পাখীগুলোর কেউ কেউ দলভেঙ্গে দলছুট হয়ে বাঁধনহারা হয়ে মুক্ত বিহঙ্গের মত মেতে উঠেছে দুরন্তপনার জলকেলিতে। চোখা-চোখী আর দুষ্টুমি করছে উষ্ণ শীতল জলে নেমে, পা-ডানা ভিজিয়ে। ওরা ডানা ঝাপটাচ্ছে আর শুভ্র জলের বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। ওদের জলকেলি ও কিচির মিচির কলরবের পুলকিত উদ্বেলিত সানন্দ, উল্লাসের প্লাবন আর স্রোতের ঝংকার ইথারে ভেসে আমার কানে আসছে সুরের মূর্ছনা হয়ে। আহা! সে এক অন্যরকম মনোরম মনোমুগ্ধকর দৃশ্য! অবলোকন করছি, অদূরে এক পটুয়া নৌকার মাঝি ধরছে ভাটিয়ালী গান। আমার কর্ণের কোটরে এসে বাজছে নৌকা মাঝির মন মাতানো কন্ঠের মুগ্ধকর সেই ভাটিয়ালী গান।

ইতিমধ্যে নৌকা পৌঁছে গেলো ফুপুর বাড়ির সংলগ্ন  ঘাটে। কীভাবে যে তিনটা ঘন্টা কেটে গেল যমুনার নদীর মাঝে, টেরও পেলাম না, বুঝতেও পারলাম না এতটুকুও। ফুপু যে চরে থাকেন, তার নাম বালিয়াবান্ধা চর। কত সুন্দর চরের নাম! নৌকা মাঝি বালিয়াবান্ধা চরের নাম চিল্লাইয়া চিল্লাইয়া ঘোষণা করলো। আমরা নৌকা থেকে চরে নামলাম। নেমে রওয়ানা দিলাম ফুপুর বাড়ির দিকে পায়ে হেঁটে। কিছু দূর যেতেই সামনে পড়ল ছোট একটি ডোবা খাল। হাঁটু পানি খালে, একদম স্বচ্ছ পরিমল টলটলে, পানির নীচের জমিনের তলদেশে জন্মানো শ্যাওলা, ঘাস, জীবন্ত শামুক, ঝিনুক, পোনা মাছের ঝাঁক সব দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। হাঁটু ভিজিয়ে পার হতে হলো খালটি। সবাই প্যান্ট লুঙ্গি গুঁজিয়ে গুটিয়ে খাল পার হলো। আমি সেটা না করে, নামলাম খালের জলে পরনের কাপড় চোপড় ভিজিয়ে।

খালে হাঁটু জলে পা ভিজালাম। উষ্ণ শীতল মাদকতায় সিক্ত হলো আমার সমগ্র দেহ। খাল থেকে হাতের তালুতে আঁজলা করে জল এনে ছিটিয়ে দিলাম আমার পুরো মুখ অবয়বে। দারুন উদ্বেলিত নান্দনিক অনুভুতির পরশ নিমিষেই বয়ে গেল আমার মুখমন্ডলে। বহু দিন পর যমুনার উষ্ণতার জল ছোঁয়ার পরশের অনুভবে পুলক উপভোগ করলাম হাঁটু পানিতে নেমে।

খাল পার হয়ে একটু এগিয়ে যেতেই দেখা পেলাম বিশাল কাশবনের খাঁজ। চোখে পড়ছে সারি সারি কাশবন। কাশবনগুলো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে ধবধবে সাদা ফুলগুচ্ছ মাথায় নিয়ে। সূর্য্যের সোনালী রোদ্দুরে আরো চিকচিক করছে শুভ্রময় কাশবনের সাদা ফুলগুলো। ওরা পুবান বাতাসে হেলেদুলে খেলা খেলছে ছন্দের তালে তালে। এই কাশবনের মাঝ বরাবর মেঠো পথ চলে গেছে ফুপু বাড়ির গ্রাম পর্যন্ত। পথের দুই পার্শ্বে কাশবন দিয়ে ঘেরা, গহীণ অরণ্যের মত। খুব চমৎকার লাগছে কাশবনের এই অনবদ্য সাজানো রূপ লাবন্যকে।

কাশবনের প্রতি আমার ভীষণ দুর্বলতা। নদীর তীরের বালুচরের কাশবনে বেড়াতে আমার খুব ভাল লাগে। আগে সুযোগ পেলেই কাশবনের সাথে মিতালী পেতেছি। বেশ মনে আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন, বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসে, বন্ধুর কলেজে পড়ুয়া ছোট বোনের সাথে পর পর দুই দিন শরৎকালের বৈকালিক সন্ধ্যা কাটিয়েছি বালুচরের কাশবনে। তারই ধারাবাহিকতার লেশ ধরে, রোমান্টিক মাদকতায় উজ্জিবীত হয়ে আমি কাশবনের কাছে গেলাম উদ্বেলিত হয়ে, কাশবনের পায়ের পাদদেশ ঘেঁষে একান্ত সান্নিধ্যে দাঁড়ালাম আপন ভঙিমায়। কাশবনের মাথায় সাদা বকের পালকের মত শুভ্র ফুলগুলোর গায়ে আলতো ছোঁয়ায় হাত বুলালাম। হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসার আবেগ অনুভুতির প্রেমার্ঘ রেনুর আভার রং ছিটিয়ে দিলাম কাশবনের মসৃণ গতরে। জীবনে প্রেম নিবেদনের দ্বিতীয় আস্বাদন পেলাম বালুচরের কাশফুলের কাছে। অবিকল যেভাবে একদা আমার প্রেয়সীর কালো দীঘল এলোমেলো চুলগুলোতে আলতো ছোঁয়ায় হাত বুলাতাম মনের হরষে। প্রেয়সীর লম্বা চুলগুলো বাতাসে পত্ পত্ করে উড়তো, আর উপচে পড়তো মৃদু বেদনাবিঁধুর আঘাতে আমার মুখ অবয়বে। বাতাসে ওর চুলগুলো এলোমেলো হতো বার বার। আমি সেগুলো সাজিয়ে দিতাম পরম যতন করে। এভাবে দুষ্টুমি করে আওলা ঝাউলা করে দিতাম আমার প্রেয়সীর বাহারী সাজানো চুলগুলো। ও অভিমান করতো আমার দুরন্তপনা দেখে। আর আমিও ভীষণ মজা পেতাম ওর অভিমানী তিরিক্ষী মেজাজ দেখে!

কাশফুলের অনুরাগের অনুভবে উজ্জিবীত হয়ে আমি কাশবনের পাশে খালের কিনারায় গেলাম। দু’হাতের মুঠোতে এক আঁজলা জল এনে ছিটিয়ে ভিজিয়ে দিলাম কাশবনের সারা দেহে। উষ্ণ জলে কাশবনের ফুলগুলো ভিজে গেল এক পশলা বৃষ্টির মত। জলে ভেজা কাশবনের নগ্ন দেহটা লজ্জাবতী গাছের পাতার মত প্রেমের শিহরণে দোল খেলো আমার হাতের স্পর্শ পেয়ে। কানে কানে লাজুক কাশফুলগুলো আমাকে শুনালো অভিসারের গোপন আলাপন। এরা আমাকে স্মরণ করিয়ে জানিয়ে দিলো সেই কবে শরতের দুইটি রোমান্টিক সন্ধ্যা কাটিয়ে গেছি ওদের পাদদেশে বসে বন্ধুর ছোট বোনের সাথে।

ফুপুকে দেখতে এসেছি অনেক বছর পরে একদিনের সময় হাতে নিয়ে। যে ফুপু আমাকে ভীষণ আদর করতো, ভালোবাসতো। যে ফুপু আমার জন্য খাঁচা বেঁধে কাপড় দিয়ে ঢেকে গাছের পাকা পেঁপে, পেয়ারা, ডালিম, আতাফল ও বেল যতন করে রেখে দিত দিনের পর দিন। আর অষ্ট প্রহর গুনতে আমি কবে যাব তার বাড়িতে। আমি না গেলে পাকা ফলগুলো গাছেই পেঁকে পেঁকে পচতো। ওগুলো পাখীরা খেত। ফুপু নিজেও খেত না, কাউকে খেতেও দিতো না। ফুপুর বাড়িতে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে গেল। অসুস্থ ফুপু আমাদের দেখে খুশীতে আটখানা। আমাদেরকে কোথায় বসতে দিবে, কী খাওয়াবে এই নিয়ে ফুপু ব্যতি-ব্যস্ত। নানান ধাঁচের পিঠা-পুলি, নদীর জীবন্ত তরতাজা মাছ, বাগানের টাটকা সবজি, ভিন্নী ধানের খই, ভর্তা, গাছের পাকা পেঁপে আরো কত সুস্বাদু খাদ্য! আনন্দ ঘন পরিবেশে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো ফুপুর বাড়িতেই।

আজকেই আমাদের ফিরতে হবে সিরাজগঞ্জ শহরে। আগামীকাল ঢাকার বাস ধরতে হবে। থাকার জো নেই। শহরে যে আমাদের ফিরতেই হবে আজ। শহরে ফিরে আসার নৌকা চলাচল তখন বন্ধ। এক আত্মীয়ের অক্লান্ত চেষ্টার বদলে অগত্যা চড়া মাশুলে একটা নৌকার বন্দোবস্ত হলো। বিশাল যাত্রীবাহী শ্যালো নৌকা। যাত্রী আমরা মাত্র তিন জন, আমি ভাগ্নে আর মামাতো ভাই। অসুস্থ ফুপুকে নিভৃত চরে ফেলে আমরা রওয়ানা দিলাম শহরের দিকে। তখন রাত দশটা বাজে।

আমাদেরকে নিয়ে স্রোতের অনুকুলে চলছে যন্ত্রচালিত শ্যালো নৌকা দ্বিগুণ গতিতে। আমি বসলাম নৌকার ছইয়ের উপর আরাম করে নগ্ন গায়ে। প্রচন্ড জোরে হিম শীতল ঠান্ডা বাতাস বইছে। নগ্ন গায়ে লাগছে সতেজ  জওয়ানী পুবালী হাওয়া। মাথার উপরে উন্মুক্ত খোলা বিশাল অসীম আকাশ। আকাশের জমিনে হাজারো তারকারাজি মিট মিট করে জ্বল জ্বল করছে। আসমানে চাঁদ মামার মিষ্টি হাসির স্নিগ্ধ আলোয় চারিদিকে জলকনার রুপালী ঝিলিকের ঝিলমিল স্নিগ্ধতা। মায়া আর মমতা মিশানো যমুনার সেই নৈসর্গিক স্বর্গীয় রাতের ছবি! কতই না সেরা! কতই না নজরকাড়া!

সারাটা নদী পথ আমি একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম  নিত্তান্তই  আমার আপন জগতে। আচানক একটা ধাক্কা খেলাম। সম্বিৎ ফিরে দেখি নৌকা সিরাজগঞ্জের ঘাটে পৌঁছে গেছে। ভাগ্নে ও মামাতো ভাই দ্রুত নৌকা থেকে এক লাফে নেমে শহর রক্ষা বাঁধের উপর গিয়ে দাঁড়ালো। আমি ততক্ষনে নৌকার ছইয়ের উপরেই পড়ে আছি নিথর নগ্ন দেহে। কিছুক্ষন অপেক্ষা করে আমার মতিগতি পর্যবেক্ষন করে নৌকার মাঝি নিজেই আমার গা ধাক্কা দিয়ে সজাগ করলো আমাকে।

মাঝি বললো, ভাই গো! উঠেন, আমরা ঘাটে আইসা গেছি। নাইমা পড়েন তাড়াতাড়ি নৌকা থেকে। এহন আমরা আর দেরি করতে পারুম না। কাল সকালে আবার খেপ মারান লাগবো। আমাগো দেরি হইয়া গ্যাছে গা। জলদি নামেন! ফিরা যাইতে আমাগো ভোর হইয়া যাইবো গা।

মাঝি ভাইয়ের তাগাদায় আমি নড়ে চড়ে উঠলাম। কিছুতেই নৌকা থেকে নামতে মন চাইছিলো না আমার। আমি আরো একটু দেরি করলাম নামতে নৌকা থেকে। মাঝির দ্বিতীয় তাগাদায় শার্টটা গায়ে দিয়ে নেমে গেলাম নৌকা থেকে দ্রুত গতিতে।

দক্ষ মাঝি শ্যালো নৌকার জেনারেটর চালু করে প্রচন্ড জোরে শব্দ করে মুহুর্তেই নিরুদ্দেশ হয়ে গেল আমার দৃষ্টি সীমানার বাইরে। একবার মনে হলো মাঝিকে ডাক দিয়ে ফিরাই। নৌকায় চড়ে বসি ছইয়ের ওপর  আবার। ফিরে যাই ফুপু বাড়িতে আমার আপন কাশবনে, বালুচরে। নদীর দিকে তাকিয়ে খুঁজি নৌকা। ততক্ষনে নৌকা চলে গেছে দূরে বহু দূরে। ভাগ্নের ডাকে আমি হাঁটা দিলাম বাড়ির দিকে মামাতো ভাইয়ের আগে আগে। আর পিছনে পড়ে রইলো শুধু আমার অসুস্থ ফুপু, যমুনার ছলাৎ ছলাৎ কুলুকুলু ধ্বনি, যমুনার  বালুচর, যমুনার কাশবন!

আমি এখন স্বপ্নের দেশ, স্বর্গ রাজ্যের অববাহিকা উত্তর আমেরিকার ধনী দেশ কানাডায় বসবাস করছি। জীবনের ঘানি টানছি কুলুর বলদের মত প্রতিদিন, প্রতিমুহুর্ত। উন্নত দেশের নাগরিক হওয়ার স্বপ্নে আমি বিভোর। কানাডার পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য আমি মরিয়া হয়ে উঠেছি। এই দামী ওজনে ভারী ফিকে লাল রংয়ের পাসপোর্ট আমার চাই চাই। আমার রাজ্যের সমস্ত সুখ যেন কানাডীয় পাসপোর্টের পাতায় পাতায় প্রোথিত গ্রথিত আছে। আমি সেই পাসপোর্টের পিছনে ছুটছি উদভ্রান্তের মত উম্মাদের মত! ওটা যে আমাকে পেতেই হবে রে। এটা পেলেই কেল্লা ফতে! বাজিমাত!

কানাডা আসার পর কেটে গেছে বেশ কিছু কাল। আমি আছি আমার মত। ইতিমধ্যে আমার অসুস্থ ফুপুও চলে গেছেন না ফেরার দেশে। গত বছর আমার বৃদ্ধা মা জননীও পাড়ি জমিয়েছেন অচেনা অজানা রাজ্যের অচিনপুরের মেহমান হয়ে পৃথিবীর নিষ্ঠুর নিয়তির নিয়ম মেনে।  আমার জীবনের চাকাও থেমে নেই। সুখের অন্বেষণে আমি ব্যস্ত থাকি দিনের অনেকক্ষন ব্যাপিয়া। কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমার মন খুঁজে ফেরে আমার অসুস্থ ফুপুকে। অবচেতন মনে আমি সারাক্ষন তালাশ করে ঘুরে বেড়াই অচেনা রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া আমার গর্ভধারিণী মা’কে। সুযোগ পেলেই নাসারন্ধ্র দিয়ে ঘ্রাণ খুঁজি বহুদূরের বঙ্গদেশের সোঁদা মাটির গন্ধকেও, অনুভূতির অনুভবে খুঁজি বাংলার অসীম নীল আকাশের তারকারাজী, পেতে চাই বাংলার পুবান বাতাসের পরশকেও।

স্বর্গের রাজ্য স্বপ্নের দেশ কানাডায় থেকেও আমি সুখী হতে পারছি না। কষ্টের বিষের অনলে জ্বলছি অহরহ। মাঝে মধ্যেই মনটা আমার কেমন অশান্ত হয়ে ওঠে। নিজেকে প্রবোধ দিতে পারি না। তখন আমার পরাণটা খুঁজে ফেরে যমুনার বালুচরের কাশবনের কাশফুলকে, যমুনার উর্মিমালাকে, বালুচরের বাঁধনহারা গাংচিলকে, সাথে বন্ধুর ছোট বোনকেও। কারনটা এই যে, আমার পরানটা সোনার শিঁকল দিয়ে বান্ধা আছে, যমুনার তীরে বালুচরে, যমুনার কাশবনে ।

মুস্তাফা দুলারী
মিসিসাগা, টরেন্টো থেকে ।
জানুয়ারী ০৬, ২০১৭
ইমেইল: mustafadulari@gmail.com

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email