আমেরিকানদের কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য

1327
AdvertisementLeaderboard

জাহেদ আরমান

কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। স্ট্যাটাসটি ছিলো এরকম: “কথা হচ্ছিল আমেরিকার ভাল-মন্দ নিয়ে। মাঝখানে এক বন্ধু বলে উঠলো, “পররাষ্ট্রনীতি আর নারীদের পোষাক – এ দুইটা বাদ দিলে ইসলাম যে সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলে তার প্রায় পুরোটাই আমেরিকাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।” কাকতালীয়ভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও সমতা আর ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলে। গত দেড় বছরের প্রবাস জীবনে আমেরিকার সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রা খুব কাছ থেকে দেখার সুযােগ হয়েছে। তাতে মনে হয়েছে বন্ধুর উপরের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করাটা অযথার্থ হবে। যদিও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আমেরিকার ধ্বংস কামনায় প্রতিদিন মিছিল-মিটিং-আলোচনা হয়। তাতে অনেকাংশেই আমেরিকার বিদেশনীতির সমালোচনা করা হয়। তবে আমি সেদিকে যাব না। এই নিবন্ধে আমেরিকার সাধারণ জনগণের কিছু চারিত্রিক আচরণ কিংবা মান তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

সাধারণত আমেরিকার জনগণ আইনের প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল। একটা উদাহরণ দিই: আমি ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস অ্যাফিলিয়েশন-এর প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ক্লাবের সদস্যদের জন্য টিশার্ট কেনার সিদ্ধান্ত নিই এবং তাতে মাল্টিকালচার থিমের একটা ছবি প্রিন্ট করার সিদ্ধান্ত নিই। গুগল সার্চ করে কিছু ছবিও ঠিক করি টিশার্টে প্রিন্ট করার জন্য। তাতে বাধ সাঁধলেন আমার ভাইস-প্রেসিডেন্ট (আমেরিকান)। তিনি জানালেন, অনলাইন থেকে ছবি সংগ্রহ করে তা টিশার্টে ব্যবহার করলে কপি রাইট আইন ভঙ্গ হবে আর তাতে জরিমানা গুনার সম্ভাবনা প্রবল। পরে সিদ্ধান্ত হলো আমরাই ছবি একেঁ তা টিশার্টে প্রিন্ট করবো। আমার নিজেরই অবাক লাগলো যে সামান্য টিশার্টে ছবি প্রিন্ট করার জন্যও এরা নিজের আইনের প্রতি কতোটা শ্রদ্ধাশীল থাকে। আমেরিকান শিক্ষার্থীরা স্কুলের অ্যাসাইনমেন্টে প্লেজারিজমের ধারে কাছেও যায় না। কারণ তারা জানে এটা করলে সংশ্লিষ্ট স্কুলের পলিসি ভঙ্গ করা হবে। এইরকম আরো অনেক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশে সাধারণত অপরিচিত কারো সঙ্গে রাস্তায় দেখা হলে কথা বলে না কেউ। কিন্তু আমেরিকায় ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ধরুন, আপনি হেঁটে কোথাও যাচ্ছেন। পথে দেখা হলো আপনার বয়সী একজন ছেলে কিংবা মেয়ের সাথে। সেই আপনাকে প্রথম অভিবাধন জানাবে এবং খুব সুন্দর করে হাসবে। আপনার মন খারাপ থাকলেও এই হাসি আপনার মন ভাল করে দিবে। আপনি রাস্তা পার হতে চাচ্ছেন? আপনাকে দেখে গাড়ি থামিয়ে হাত দিয়ে ইশারা করবে আগে রাস্তা পার হওয়ার জন্য। আমার অনেকবার এই অভিজ্ঞতা হয়েছে।

আমেরিকানরা খুবই সময় সচেতন। যে কোনো অনুষ্ঠান নির্ধারিত সময়েই শুরু হয়। এমনকি এক মিনিটও এদিক ওদিক হয় না। কোনো পার্টিতে যোগদান করতে হলে সাধারণত নির্ধারিত সময়ের কয়েক মিনিট আগেই তারা হাজির হয়। আবার নির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠান শেষ করে। আমার স্কুলে পৌছার পরদিন সকাল ১০টায় স্কুল থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বরণ করে নেয়ার কথা ছিলো। আমি ভাবলাম একটু পরেই যাই। ঠিক সাড়ে দশটায় যখন অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে পৌছালাম তখন অনুষ্ঠান শেষ।

আমেরিকার সাধারণ লোকজন আশেপাশে কে কী করছে তা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না। সবসময় নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে। তারা এটাকে যার যার ব্যক্তি-স্বাধীনতা বলেই মনে করে। পাবলিক প্লেসগুলোতেও কোনো কারণ ছাড়া কেউ অন‌্যের দিকে খুব একটা তাকায় না। প্রত্যেকেই নিজ নিজ ব্যক্তিগত পরিসর রক্ষা করে চলে। কেউ বিপদে পড়ে সাহায্য না চাওয়া পর্যন্ত তারা খুব কমই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। আবার সাহায্য চাইলে তারা যে কোনো উপায়ে সাহায্য করতে তৎপর থাকে।

আমেরিকায় অফিসিয়াল যোগাযোগে ইমেইলই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এমনকি প্রফেসরদের সাথে শিক্ষার্থীদের যোগােযোগের প্রধান মাধ্যমও ইমেইল। প্রতিদিন প্রায় ১৫-২০ টির মতো ইমেইল আসে স্কুলের বিভিন্ন ক্লাব ও প্রফেসরদের কাছ থেকে। কোনো প্রফেসরকে ইমেইল করলে দুই এক ঘন্টার মধ্যেই উত্তর পাওয়া যায়। আমেরিকানরা দিনে বেশ কয়েকবার ইমেইল চেক করে। বাংলাদেশের মতো একটা ইমেইল করে সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয় না।

আমেরিকানরা ব্যবহারে খুবই আন্তরিক আর মানবিক গুণসম্পন্ন। আরেকটি অভিজ্ঞতা দিয়ে এই লেখার ইতি টানছি। ২০১৬ তে একটি পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে সামার জব করতাম। প্রতিষ্ঠানের মালিক ভদ্রমহিলা খুবই ভালবাসতেন আমাকে। বলতেন, “এখানে তো তোমার মা নেই। ভেবে নাও আমিই তোমার মা।।” রমযানের সময় একদিন আমার চেহারা দেখে ওনার মনে হয়েছে আমি খুবই ক্ষুধার্ত। তিনি চকোলেট কেক আর আইসক্রিম নিয়ে আসলেন আর বললেন, “এগুলো খাও, ভাল লাগবে।” আমি খাবারটা নিয়ে রেখে দিলাম। সে একটু পর চেক করলো আমি খেয়েছি কিনা! তারপর কয়েকবার জোরাজুরি করার পর তাকে সত্যিটা বলতে বাধ্য হলাম যে আমি রোযা রেখেছি এবং সূর্যাস্তের আগে খেতে পারবো না। তিনি খুবই অবাক হলেন যে আমার মতো একজন টগবগে যুবক ধর্মীয় অনুশাসন মেনে সারাদিন না খেয়ে আছি। খুবই অ্যাপ্রিশিয়েট করলেন। তারপর তিনি আরও খাবারের অর্ডার করলেন আমার জন্য আর বারবার বাইরে গিয়ে উঁকি দিচ্ছিলেন সূর্য ডুবছে কিনা তা দেখার জন্য। এরই মধ্যে ওই পরিবারের সবাই জেনে গেলো আমি রোযা রেখেছি। ভদ্রমহিলার স্বামী, ছেলে-মেয়ে এসেও খুবই অ্যাপ্রিশিয়েট করলেন। সব কাজ ফেলে আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। পরে মহিলা গুগল সার্চ করে দেখালেন সূর্য অস্তমিত হয়েছে আমি যেন খেয়ে নিই। খাবারের আয়োজনটা না-ই বলি এখানে! ##

লেখকঃ
জাহেদ আরমান

Graduate Assistant at Edinboro University of Pennsylvania

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email