আল জাজিরা কি সত্যিই বাংলাদেশিদের আহত করেছে?

122
AdvertisementCBN-Leaderate

জাহেদ আরমান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ||

“আল জাজিরা সত্যিই আমাকে আহত করেছে!” এই শিরোনামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন ভোরের কাগজে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। প্রবন্ধটির কন্টেন্ট অ্যানালাইসিস করতে গিয়ে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিচার-বিশ্লেষণ না করে তাঁর রাজনৈতিক মতকেই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন। অথচ, তাঁর মত একজন গুণী প্রফেসরের কাছ থেকে অন্য সবার মতো “আই এম প্রাইম মিনিস্টার’স ম্যান” টাইপের লেখা আশা করিনি।

লেখার শুরুতেই ড. রাহমান দাবি করেছেন, “এ ডকুমেন্টারিটি আগাগোড়াই অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং সুর্নিদিষ্ট এজেন্ডা নির্ভর একটা ‘ফরমায়েশি’ রিপোর্ট বলে আমার মনে হয়েছে।” গণমাধ্যমের কোন তথ্যটা এজেন্ডা নির্ভর না? গণমাধ্যম তাত্ত্বিক মাত্রই জানেন গণমাধ্যমের প্রত্যেকটি সংবাদের একটি সুনিদির্ষ্ট এজেন্ডা থাকে। এজেন্ডা ছাড়া কোনো সংবাদই হয়না। মিডিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বেশি ব্যবহৃত ‘এজেন্ডা সেটিং থিওরি’ সেকথাই বলে। এখন এই ডকুমেন্টারি প্রচারের এজেন্ডা কী সেটা আল জাজিরাই ভালো জানে। তবে বাংলাদেশের যারা ডকুমেন্টারিটি দেখেছে তারা সবাই আল জাজিরার এজেন্ডাটা একইভাবে গ্রহণ করেছে এটা বলার সুযোগ নাই। মানুষের স্বাধীনতা আছে মিডিয়া এজেন্ডা গ্রহণ না করার।

এরপর তিনি বলছেন, “এ ডকুমেন্টারির মূল চরিত্র সামি। কিন্তু সামি কে, তার পরিচয় কী, তার সামাজিক-অর্থনৈতিক-পেশাগত ব্যাকগ্রাউন্ড কী, তার কোনো অথেনটিক হদিস এখানে নেই। কেবল জানানো হলো সামি হাঙ্গেরির একজন ব্যবসায়ী, কিন্তু সামি তো সুইডেনের ব্যবসায়ী বা বেলজিয়ামের ব্যবসায়ী হতে পারে। অচেনা-অজানা-অজ্ঞাত পরিচয় একজনকে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলা হলো, ‘আমার নাম সামি। আমি একজন হাঙ্গেরির ব্যবসায়ী’। এটা আদতে কোনো অথেনটিসিটিই প্রমাণ করে না।” আচ্ছা, হুইশল ব্লোয়ার হওয়ার জন্য কি একজনকে বিখ্যাত লোক হতে হবে? একজনের সামাজিক-অর্থনৈতিক-পেশাগত ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়া সে হুইশল ব্লোয়ার হতে পারবে না? ২০১৯ সালে ট্রাম্প-ইউক্রেন স্ক্যান্ডাল যে ফাঁস করেছিলো মিডিয়া তার কোনো পরিচয়-ই বলেনি। তাই বলে কি তার বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে আমেরিকান কংগ্রেস ট্রাম্পের অভিশংসন করেনি? আর এখানে জেনারেল আজিজের সঙ্গে সামির ছবি, হারিসের সাথে কথোপকথন, ইমেইল এগুলো কি যথেষ্ঠ প্রমাণ নয়?

এবার ড. রাহমান মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কীভাবে মিথ্যার পক্ষে সম্মতি আদায় করছেন তার প্রমাণ দেখুন। তিনি তাঁর প্রবন্ধের এক জায়গায় লিখেছেন, “সবচেয়ে অবাক বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, বাংলাদেশ নাকি ইসরাইল থেকে সেনাবাহিনীর জন্য স্পাইওয়ার কিনেছে। এবং সেটা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে ব্যবহৃত হয়েছে।” অথচ আল জাজিরার ডকুমেন্টারির কোথাও কিন্তু বলেনি স্পাইওয়ার জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে ব্যবহৃত হয়েছে। এই বক্তব্যটি প্রথম আইএসপিআরই সামনে নিয়ে এসেছে। আর আইএসপিআর আল জাজিরার বক্তব্যকে ডিফেন্ড করতে গিয়ে বলেছে, এই স্পাইওয়ার তারা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে ব্যবহার করে।

স্পাইওয়ার ব্যবহার নিয়ে ড. রাহমান আরেক জায়গায় লিখেছেন, “একটা দেশের সেনাবাহিনী বলছে এবং খোদ জাতিসংঘ সাক্ষ্য দিচ্ছে তার কোনো মূল্য নেই, …।” এই বক্তব্যটি দেখে মনে হচ্ছে ড. রাহমান বাংলাদেশের সময় টিভি ও একাত্তর টিভিতে জাতিসংঘের বক্তব্য নিয়ে যে ভুয়া সংবাদ প্রচার করেছিলো তার খপ্পরে পড়েছেন। জাতিসংঘ আইএসপিআর-এর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলেছে, শান্তিরক্ষীবাহিনীতে এই স্পাইওয়্যার ব্যবহার হয় বলে তাদের জানা নেই। এখানে জাতিসংঘ কোনো কিছু সাক্ষ্য দেয়নি। বরং আইএসপিআর-এর বক্তব্যের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

ড. রাহমান হারিসের বক্তব্যকে বলছেন “গাল-মারা” বক্তব্য। হারিসের মতো একজন ইন্টারপোলের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী, যে কিনা ভাইয়ের প্রভাবে জাল পাসপোর্ট, জাল জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছে, তার বক্তব্যকে ‘গাল-মারা’ উল্লেখ করা কতটা যৌক্তিক? ড. রাহমানের কাছে প্রশ্ন: আপনি যখন কোনো বিষয়ের উপর ফোকাস গ্রুপ করেন কিংবা কারও ইন্টারভিউ নেন এবং তার উপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্তে আসেন তাও কি ‘গাল-মারা’ গল্প? রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্য প্রচলিত গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা কতটা যুক্তিযুক্ত?

ড. রাহমান প্রশ্ন তুলেছেন, “হারিসের দাবি, ‘প্রধানমন্ত্রী তাকে যা ইচ্ছা, তা করার লাইসেন্স দিয়েছেন’ এ কথার স্বপক্ষে রিপোর্টে কোনো তথ্যপ্রমাণ বা সাক্ষ্য কি উপস্থাপন করা হয়েছে?” প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হারিসের ছবি, জাল পাসপোর্ট, জাল জাতীয় পরিচয়পত্র, আবার এগুলোর সত্যায়নে সেনাবাহিনীর অফিসারদের বাধ্য করা, ইন্টারপোলের তালিকাভুক্ত আসামী হয়ে রাষ্ট্রপতির সাথে একই প্রোগ্রামে থাকা এতগুলো অন্যায় কি রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তির অমতে হয়েছে বলে আপনি মনে করেন? আরেক জায়গায় ড. রাহমান বলছেন, “… ‘তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যাইনি’ বলে শেষান্তে একটা বাক্য দিয়ে কাম সেরে ফেলা হয়েছে ।“ সাংবাদিকতায় অভিযুক্তের বক্তব্য নিতে হয় এটা সত্যি। আল জাজিরা অভিযুক্তের বক্তব্যের জন্য তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এখন যারা অভিযুক্ত তারা ইমেইল পেয়ে যদি চুপ করে থাকে সেক্ষেত্রে আল জাজিরার কী করার আছে একটু বলবেন কি? যদি তারা যোগাযোগ না করতো সেটা ভিন্ন বিষয় ছিলো; সাংবাদিকতার পরিপন্থি ছিলো। যেহেতু তারা যোগাযোগ করেছে তাই বলা যায় আল জাজিরা তার পেশাদারিত্ব বজায় রেখেছে।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, বিডি ফ্যাক্টচেক

https://www.facebook.com/cbn24.ca
Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
CBN-Leaderate