কবিতার নির্ভেজাল অর্থ

1235
AdvertisementLeaderboard

কবিতার নির্ভেজাল অর্থ

-ফারজানা নাজ শম্পা

কবিতা কি?
সেদিন হঠাৎ স্বরবে গর্জালেন
আমার এক ভগ্নী সুহৃদ
হাতে তাঁর কারুকার্যময় গ্লাস উপচে পড়া
সমর্পণের তরল,
অন্য হাতটি বেশ আয়েশী ভঙ্গিতে কোলের উপর ছড়িয়ে বললেন
ওহে নতুন কবি, বলো কবিতার অর্থ কী?
প্রতাপশালী বন্ধুটির
তাচ্ছিল্যময় ক্রূর, স্থূল অভিব্যক্তির
প্রতি দৃষ্টিপাত করলাম,
গোপন হাসি হেসে নিরবে জানালাম,
বন্ধু, কবিতা মানে একটি ফুল ফোঁটার আনন্দ, বেদনার সুরভিত ভাষা
আবার অন্য ক্ষেত্রে, চলমান বিশ্বের নগ্ন নির্লজ্জ রাজনীতির অসম্পূর্ণতার  সাগরে
নিষ্পাপ শিশুর ভাসমান লাশ,
কবিতা আমাদের শেখায় ধর্মীয় প্রার্থনালয়ে
নির্বিচারে গুলিবর্ষণে নিরীহ কিছু মানুষের অকাল মৃত্যুর
প্রতিবাদে মানবতার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হবার শিক্ষা,
কবিতা জাগরিত ছিল এবং থাকবে আমাদের  মায়ের ভাষা ‘বাংলার’ জন্য একদল
মুক্তিকামী মানুষের নিঃস্বার্থ রক্তাত্ব জীবন বিসর্জনের সত্য কিংবদন্তী হয়ে,
বন্ধুটি একটু বাঁকা হাসি হাসলেন,
কবিতা মানে সাদা কাশবনের মুক্ত হাওয়ায় আনমনে হারিয়ে যাওয়া
প্রেমিক যুগলের অনাগত ভবিষ্যতের অব্যক্ত সংলাপ
বন্ধুটি বললেন, তারপর,
কবিতার অর্থ সকল বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ,
ক্লান্ত পথহারা প্রিয় মেধাবী মানুষটির হাতে
একটি উষ্ণ স্পর্শ দিয়ে বলা ‘আমি আছি’
কবিতা মানে ভালোলাগা, বাঁধহীন ভালোবাসা
মাঝে মধ্যে কবিতার ভাষা  মিলেমিশে একাকার হয় ওই নীল গগনে।
তখন কবিতা নব রূপে পথ হারায়
শঙ্খচিলের ডানায় ভর করে রূপালী মেঘের দেশে পথ হারানোর অন্য সুর
যার গন্তব্য প্রতিধ্বনিত হয় মহাকালের সীমানায়,
কখনো কবিতা প্রেমিকের প্রতিজ্ঞা, প্রেয়সীর মেঘকালো চুলের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া
অন্যক্ষেত্রে, ধর্ষিত সোহাগী-তনুদের রক্তের মাঝে
নিরাপদ পরিবেশের প্রয়াসে কিছু মানুষের আমৃত্যু সংগ্রামের প্রতিজ্ঞা,
ক্ষেত্র বিশেষে কবিতার ভাষা লজ্জিত হয়, যখন ঘুমন্ত প্রিয়াকে পাশে রেখে
প্রিয়তম অতি আধুনিক বন্ধুর টেলিফোনে
অপর কোনো বিকল্প মিথ্যার/প্রহসনের কাছে আশ্বাস বা প্রতারণার ভাষার সৃষ্টি হয়,
কবিতা মানে আর্তনাদ আর কারখানার ছাপোষা শ্রমিক ফজল আলীর সামান্য মজুরির জন্য রক্তাত্ব সংগ্রাম, অতঃপর মৃত্যু
আমাদের তথাকথিত সভ্য বা আধুনিক রাষ্ট্রের পথে প্রান্তে
এক টুকরো রুটির বা একমুঠো অন্নের জন্য
গৃহহীন মানুষের  স্বকরুণ আর্তি,
কবিতা আলোকিত হয় সর্ব শক্তিমান সৃষ্টিকর্তার কাছে বার বার মুক্তির জন্য করজোড়ে প্রার্থনায়,
কোনো সময়ে  কবিতা হয়ে ওঠে একজন দীপ্তিময় বন্ধুর কাছে অনন্ত আশ্রয়ের কামনা,
চেতনাশূন্য আবদ্ধ বন্ধুটি
এবার একটু নড়েচড়ে বসলেন, বললেন অনেক বলেছো,
বলে চললাম, কবিতা হলো জীবনের স্বয়ংস্বপূর্ণ কিন্তু কিছুটা সংক্ষিপ্ত রূপ
তিনি প্রশ্ন করলেন, কবিতা লিখে তোমার অর্জন কি?
জানালাম, বন্ধু প্রতি মুহূর্তে জীবন বোধের চর্চা আর
মননের  বিকাশ
জানালাম, হে বন্ধু কবিতার শক্তি
আমাকে আটপৌরে কিন্তু অতি স্বাভাবিক নৈতিক মানুষ রূপে উঠে দাঁড়াতে
নিঃশেষিত হয়েও বেঁচে থাকতে শেখায়
অকস্মাৎ বন্ধুর বড় দীর্ঘশ্বাস,
তিনি যেন কিছুটা নিস্তেজ হলেন,
তারপর ধীরলয়ে প্রস্থান করলেন,
রইলাম আমি আর সদাজাগ্রত
কবিতার ঐশ্বর্য।

ফারজানা নাজ শম্পা 
ফ্রিল্যান্স লেখক ও গবেষক 
হ্যালিফ্যাক্স, কানাডা
Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email