কানাডার হ্যালিফ্যাক্সে ‘বাংলাদেশ কানাডা ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটির’ পিকনিক অনুষ্ঠিত

289
AdvertisementLeaderboard

ফারজানা নাজ শম্পা, হ্যালিফ্যাক্স প্রতিনিধি ও উপদেষ্টা CBN24 ||

প্রাণঘাতী কোভিড ১৯ মহামারীতে আমরা হারিয়েছি অনেক প্রিয় মুখ আর সমগ্র বিশ্বের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জনজীবনে নেমে এসেছে অনাকাঙ্ক্ষিত ভয়াল স্থবিরতা।

মহামারীর করাল গ্রাসে আমাদের সুস্থ স্বাভাবিক জীবনচর্চা বিপর্যস্ত হলেও ক্ষেত্র বিশেষে তা আমাদের মানবিক চেতনা বোধ কঠোরভাবে জাগিয়ে তুলেছে।

মহামারীতে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সামগ্রিক বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সমাজ কাঠামো। তবে বিশ্ব ইতিহাসের দিকে চোখ বুলালেই যে দিকটি সহজেই অনুমেয় সর্বত্রই সর্বশক্তিমানের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ বারবার সর্বশক্তিমানের অপার মহিমায় বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও সামাজিক দুর্যোগ নিরাময়ের পথ খুঁজে নিয়েছে।

দুর্দশার আর অনিশ্চয়তার মাঝে অনেক হারিয়েও সমাজবদ্ধ মানুষ সংগ্রাম করে উঠে দাঁড়িয়েছে আর খোঁজে শান্তিময় আশ্রয়স্থল। সেই ধারাবাহিকতায় ধীরে ধীরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গবেষক ও বিজ্ঞানীরা সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমায় ভাইরাসের প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কার করেছে।

কানাডা ইতোমধ্যে বিশ্বের সবচাইতে বেশি কোভিড ১৯ ভাইরাসের প্রতিষেধক টীকা গ্রহণকারী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। আর সর্বশেষ তথ্য অনুসারে কানাডার নোভা স্কোশিয়া ছিল সবচেয়ে টীকা গ্রহণকারী প্রদেশ। কানাডার নোভা স্কশিয়া প্রদেশের রাজধানী হ্যালিফ্যাক্স উৎসব প্রিয় বাঙালিদের জীবনে কানাডার দীর্ঘ গৃহে অন্তরীন লকডাউন পরিস্থিতির পরিবর্তিত শিথিলতার প্রেক্ষাপটে অতি সম্প্রতি এসেছিল এক আনন্দময় উৎসবমুখর স্পন্দন।

কোভিড মহামারীর সকল স্বাস্থ্যবিধি যথাসম্ভব কঠোরভাবে অনুসরণ করে কানাডার হ্যালিফ্যাক্স এ বাংলাদেশিদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ কানাডা ফ্রেন্ডশীপ সোসাইটি’ বা বিএসএফ গত ৭ আগস্ট শনিবার আটলান্টিক সমুদ্রের দক্ষিণ ভাগের তীর ঘেঁষা সবুজ শ্যামল বৈচিত্র্যময় জীব ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ সুবিস্তৃত ঐতিহাসিক পয়েন্ট প্ল্যাসেন্ট পার্কে নয়নাভিরাম সবুজ প্রান্তরে আয়োজন পূর্ব  নির্ধারিত স্থানে অনুষ্ঠিত গ্রীষ্মকালীন পিকনিক।

এই মনোরম অনুষ্ঠান সূচিতে অতিথিদের নূতনদের অভ্যর্থনা, শিশুদের বিশেষ ক্ৰীড়া, হালকা খাবার ও পানীয় পরিবেশনা, বড়দের (নারী পুরুষ এই দুইভাগে বিভক্ত) বালিশ ছোড়া, বেসবল ছোড়া প্রতিযোগিতা, মধ্যাহ্ন ভোজন, মনোজ্ঞ সংগীতসহ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ইত্যাদি বিভিন্ন অংশে বিভক্ত ছিল।

কোভিড মহামারীর সুরক্ষার জন্য স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে অনুষ্ঠানের প্রারম্ভেই হলুদ সবুজ লাল নীল রঙ অনুসারে সুনির্দিষ্ট বিভিন্ন কয়েকটি গ্রূপে ভাগ করে নিমন্ত্রিত অতিথিদের বিভিন্ন বর্ণের ব্যাজ করতে হয়। অনুষ্ঠানের আয়োজকদের পক্ষ হতে নিমন্ত্রিত অতিথিদের পূর্বশর্ত দেয়া হয় নির্দিষ্ট গ্রুপের বাইরেআমন্ত্রিত অতিথিরা যেতে আগ্রহী হলে মাস্ক পরিহিত অবস্থায় যেতে হবে। সেই অনুসারে মূল অনুষ্ঠানে যোগদানের পূর্বেই দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবকদের বা ভলেন্টিয়ার উদোক্তার কাছ হতে অতিথিদের প্রত্যেকেই নির্দিষ্ট রঙের ব্যাজসংগ্রহ ও পরিধান করতে হয়। এই বনভোজনের জন্য নির্দিষ্ট স্থানটিতে প্রত্যেককেই একটি দূরত্ব রেখে নির্ধারিত বর্ণের বেলুন ব্যানারে সজ্জিত গ্রুপে অবস্থান করেন।

মহামারীর দীর্ঘসময় স্বাস্থ্য সুরক্ষার অদেখার ফলে প্রায় দুইশোর বেশি নিমন্ত্রিত অথিতিদের এই দূরত্বের মাঝে ছিল প্রাণের ছোঁয়া। দীর্ঘস্থায়ী শীতে প্রধান দেশ কানাডায় জুলাই আর আগস্ট মাসে স্বল্পস্থায়ী গ্রীষ্মের এই দিনের অনুষ্ঠানের এই দিনটি ছিল অপেক্ষাকৃত রৌদ্রোজ্জ্বল। গ্রীষ্মের আগমনের সমগ্র প্রকৃতি পাখির কুজন আর ফুলে ফলে বিকশিত হয়ে সাজে নুতন সাজে আলোকিত রূপে। প্রকৃতির এই বিকশিত রূপান্তর সেদিনের এই অনুষ্ঠানেও অবধারিতভাবে এনে দিয়েছিল এক অনন্য আবহ।

সকাল এগারোটা থেকে প্রাথমিক অভ্যর্থনা বক্তব্যের পর পিকনিকের মূল আয়োজন শুরু হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবকরা নির্দিষ্ট স্থান অনুসারে হালকা খাবার পানীয় পরিবেশন করেন।

এরপর শিশুদের জন্য বিশেষ কয়েকটি ক্রীড়া গ্লাসে যেমন বল ছোড়া ও বেলুন ফোটানোর জন্য আহবান জানানো হয়, নির্দিষ্টদূরত্ব রেখে আমন্ত্রিত অতিথিদের শিশুদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো এবংআনন্দময় কোলাহল সকলকেই মুগ্ধ করেছিল। মহামারীর দীর্য সময়ে স্বাস্থ্যবিধি অনুসারে প্রায় গৃহবন্দী শৃঙ্খলিত পরিবেশ হতে অনেকটা মুক্তির আনন্দের রেশ নিয়ে আয়োজনে সবাই কম বেশি ছিল প্রাণচাঞ্চল্যে মুখরিত।

শিশুদের বিভিন্ন খেলার সুচারু ও প্রাণবন্তভাবে আয়োজনের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন মনো বিশেষজ্ঞ ডঃ দিলরুবা রহমান সুরভী। বড়দের অংশে মেয়েদের সংগীতের তালে তালে বালিশ ছোড়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এক্ষেত্রেও স্বাস্থ্যবিধি দূরত্বের রীতি অনুসরণ করে সব সম্পন্ন হয়েছিল।

দুপুরে মধ্যাহ্ন ভোজনের আয়োজনে মেনুতে ছিল পোলাও ও চিকেন তন্দুরি, ডিম ভুনা সালাদ। আমন্ত্রিত অতিথিরা তাঁদের নির্ধারিত গ্রুপে সামাজিক দূরত্বে খাদ্য সংগ্রহ করেন। মধ্যহ্নভোজ শেষে মিষ্টিপ্রিয় বাঙালির মেনুতে মিষ্টান্নর মধ্যে ছিল দেশীয় স্বাদের রসগোল্লা, তরমুজ ও চা পরিবেশন হয়।

অনুষ্ঠানের শেষাংশে সুলোলিত কণ্ঠে কয়েকটি আধুনিক বাংলা গান পরিবেশন করেন আবিদ হাসান রানা, রিনাত আক্তার, ডঃ দিলরুবা রহমান সুরভী ও একজন নবাগত শিল্পী রেজা হাসান, শামীমা সুলতানা, শাহজালাল টিপু

এক পর্যায়ে ছোটদের ও বড়দের প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন সোসাইটির প্রেসিডেন্ট জেবুন চৌধুরী জুয়েল।

অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাব, খাদ্য সরবরাহ, আয়োজনের সুনির্দিষ্ট স্থান বা স্পট নির্ধারণ, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, অতিথিদের নাম নিবন্ধকরণ, স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশনা ইত্যাদি আনুসাঙ্গিক বিবিধ দিক সফলভাবে সমন্বয় ও সম্পন্ন করার জন্য একদল নিবেদিত প্রাণ সেচ্ছাসেবক দীর্ঘসময় নিরলসভাবে কাজ করেছেন।

হ্যালিফ্যাক্সের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও সরকারী বেসরকারী পর্যায়ের কর্মরত বিভিন্ন সংগঠনে কর্মরত অনেকেই, নবাগত ছাত্র গবেষক সহ বেশ কয়েকজন বাঙালি এই সফল আয়োজনেটির উদ্যোক্তা ছিলেন। এইবারের এই পিকনিকের উদ্যোক্তাদের ব্যক্তিবর্গের কয়েকজন হলেন অধ্যাপক ফজলে সিদ্দিক, অধ্যাপক শামসুদ্দোহা চৌধুরী, অধ্যাপক আশরাফ আল জামান, অধ্যাপক মোহাম্মদ মুজাহিদ রহমান, লিলি সিদ্দিক, জেবুন চৌধুরী জুয়েল, তাহমিনা আক্তার ডালিয়া, ডঃ দিলরূবা রহমান সুরভী, আহসান রিজভী চৌধুরী, সাইয়েদা লায়লা নার্গিস কেয়া, আহসানুল কবির, শরিফুল ইসলাম রাসেল, প্রজ্জল কুমার তালুকদার, সীমাত, শারমিন সুলতানাসহ আরো অনেকেই।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে আশির দশক থেকে বাংলাদেশিদের বিভিন্ন উৎসব ও আয়োজনে স্বল্প ও বৃহৎ পরিসরে হ্যালিফ্যাক্সের বাংলাদেশিদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যগত দিবস, উৎসব উদযাপনের মাধ্যমে তাঁদের ঐতিহ্যের ধারা অক্ষুন্ন রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছেন। কোন জাতি যদি নিজের ভাষা, সঠিক ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সর্বপোরি কৃষ্টির স্বরূপ সম্পর্কে উদাসীন হয় সেই জাতির স্বাতন্ত্রময় বিকাশের, আত্মপরিচয়ের দিকটি অসম্পূর্ণ ও প্রায় অবহেলিত থেকে যায়।

বিসিএসএফের এই বিশেষ অয়োজন দ্বারা তাঁরা প্রবাসের মাটিতে বাংলাদেশিদের ঐতিহ্যের ধারাকে রক্ষা করার গতিশীল ভূমিকা রেখেছেন। পিকনিক আয়োজন ও অনুষ্ঠান বিষয়ক এই বিশেষ ফিচার লেখাটির জন্য কয়েকটি প্রয়োজনীয় এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য দিয়ে আমাকে নিয়মিত ভাবে সাহায্য করেছেন প্রজ্জ্বল কুমার তালুকদার ও সমীরণ পাল, ডঃ দিলরুবা রহমান সুরভী। তাঁদের সবার প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

কানাডার হ্যালিফ্যাক্সে বাংলাদেশের দেশজ ঐতিহ্য ও ইতিহাসে সহ বাংলাদেশিদের দেশাত্মবোধের শেকড়ের সঠিক আবহ প্রবাসের মাটিতে নিয়মিত ভাবে কানাডার মূলধারায় ও আমাদের নুতন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার কম বেশি দায়িত্ব বর্তায় প্রবাসে বসবাসরত সবার উপরে। সেই নিরিখে কোভিড মহামারীর এই দুর্যোগময় সময়ে সুরক্ষা নীতি যথাসম্ভব অনুসরণ করে ‘কানাডা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটির’ বা বিসিএফএসের এই উদ্যোগটি সত্যি প্রশংসার দাবিদার।

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email