কানাডায় মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কা এখন চর‌মে

143
AdvertisementLeaderboard

মোস্তফা আকন্দ ||

বা‌ড়ির মর্টগে‌জের ওপর তিনমাস আগেও সুদের হার ছিল ২.৫১%। ব‌্যাংক থে‌কে আজ‌কে ই‌মেইল পেলাম। এখন সুদ বা‌ড়ি‌য়ে করা হ‌য়ে‌ছে ৪.৪৮%। আজ থে‌কেই কার্যকর। তাতে প্রতি মা‌সে যে প‌রিমান ডলার মর্টগে‌জের কি‌স্তি ‌হি‌সে‌বে দি‌চ্ছি, তা‌ দি‌য়ে শুধুমাত্র সুদ প‌রি‌শো‌ধেই চ‌লে যা‌বে। মূল লো‌নের প‌রিমান ম‌নে হয়ন‌া একটুও কম‌বে। পু‌রো লোন প‌রি‌শোধ কর‌তে নির্দিষ্ট সম‌য়ের চে‌য়েও আ‌রো ক‌য়েক বছর বেশি লো‌নের ঘা‌নি টান‌তে হ‌বে। মরার আ‌গে বা‌ড়ি পেইড অফ হ‌বে ব‌লে ম‌নে হয়না।

কানাডায় মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কা এখন চর‌মে। যে ডিম কিনতাম প্রতি ডজন আড়াই ডলার ক‌রে (মানে সে‌লে যখন থাকত) সেই একই ডিম এখন কিন‌তে হ‌চ্ছে সে‌লেই সাড়ে চার ডল‌ার ক‌রে। ‌রেগুলার তো ছয় ডলার ও তার ওপ‌রে। একটি ডি‌মে‌র দাম কম প‌ক্ষে ৫০‌ সেন্ট। টাকায় কনভার্ট কর‌লে একট‌া চ‌ল্লিশ টাকার ওপ‌রে।

পাচ ডলা‌রের দুধ এখন সাত ডলার। পে‌ট্রোল প্রতি লিটা‌রে এক ডলার থে‌কে বে‌ড়ে দেড় ডলা‌রের আশপাশে ওঠানামা ক‌র‌ছে। য‌দিও কিছু দিন আ‌গে তা দুই ডলার ছা‌ড়ি‌য়ে গি‌য়েছিল।

এই যখন বাজা‌রের অবস্থা তখন বেতন বা‌ড়ে‌নি এক ডলারও। উপায় কী? উপায় কৃচ্ছতা সাধন। ডিম দুধ খাওয়া ক‌মি‌য়ে দেয়া ছাড়‌া তো উপায় দেখ‌ছিনা।

খব‌রে দেখলাম, গত ক‌য়েক মা‌সে মুদ্রাস্ফী‌তির কার‌ণে ক‌্যানাডায় প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার মা‌নে এক হাজার বিলিয়ন ডল‌ার রিয়া‌ল এ‌স্টেট ও ফাইন‌্যা‌ন্সিয়াল লস হ‌য়ে‌ছে। গত ক‌য়েক বছ‌রে বাড়ি‌র দাম অস্বাভা‌বিক বৃ‌দ্ধির কারণে বাজা‌রে যে বুদবু‌দের সৃ‌ষ্টি হয়ে‌ছিল তা ঠুস ক‌রে ফু‌টে যাচ্ছে। বাড়ির দাম ১০ থে‌কে ১৫% ক‌মে‌ছে তা‌তেই এক‌ ট্রিলিয়ন ডলার হাওয়া হয়ে গে‌ছে। এই হল ক‌্যানাডার অর্থনী‌তি। সব কিছু হাওয়ার ওপর। আর চা‌রি‌দি‌কে শুধু খারাপ খবর। সি‌নে কম‌প্লে‌ক্সে “হাওয়া” ম‌ু‌ভি দে‌খে হয়ত খুব বেশি দিন আর ফুরফুরা থাকা যা‌বেনা।

বাংলা‌দে‌শের অবস্থ‌াও তো ভা‌লো না। খব‌রে দে‌খি সেখা‌নেও ডলা‌রের চরম সংকট। ত‌বে ক‌্যানাডা থে‌কে বাংলা‌দে‌শে টাকা পাঠা‌তে গে‌লে মনটার ম‌ধ্যে একটু ভা‌লো লাগ‌লেও পরক্ষ‌ণেই তা চুপ‌ষে যায়। কারণ দে‌শে আত্নীয় স্বজন আ‌গে এক‌শো ডলার বিপরীতে সাত হাজার টাকা পে‌লেও এখন এক‌শো ডলা‌রের বিপরীতে আট হাজার টাকার উপ‌রে পাচ্ছে। কিন্তু আ‌গে সাত হাজার টাকা দি‌য়ে যা কিন‌তে পারত এখন সা‌ড়ে আট হাজার টাকা দি‌য়েও তা কিনতে পার‌ছে না। কা‌জেই খু‌শি হওয়ার কিছু নেই।

সারা পৃ‌থিবীতে মুদ্রাস্ফী‌তি উর্ধ্বগ‌তির জন‌্য রা‌শিয়া ও ইউ‌ক্রেনের যুদ্ধ‌কে দায়ী করা হ‌লেও আস‌লে তা পু‌রোপু‌রি সত‌্য নয়। আসল কারণ ক‌রোনা।

বি‌ভিন্ন দে‌শের সরকারগু‌লে‌া ক‌রোনার সময় যে প‌রিমান অর্থ ছড়ি‌য়ে‌ছে তার নে‌গে‌টিভ ফলাফল ম‌নে হ‌চ্ছে এখন এই মুদ্রাস্ফী‌তি। তাছাড়া ক‌রোনার কার‌ণে দীর্ঘ সম‌য়ের লক ডাউন সব দে‌শের অর্থনী‌তির দেশজ উৎপাদন মার খে‌য়ে‌ছে। প্রাকৃ‌তিক দু‌র্যোগ, জলবায়ু প‌রিবর্তনের কার‌ণে দে‌শে দে‌শে কৃ‌ষি উৎপাদনও ব‌্যহত হ‌য়ে‌ছে। সব মি‌লি‌য়ে আজ‌কের এই প‌রি‌স্থি‌তি।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নানান কৌশল নেয়া হ‌চ্ছে। কেন্দ্রীয় ব‌্যাং‌কের রেট বা‌ড়ি‌য়ে দি‌য়ে বাজার থে‌কে অর্থ তু‌লে নেয়া হ‌চ্ছে যাতে জি‌নিসপ‌ত্রের দাম ক‌মে। তা‌তেও কোন কাজ হ‌চ্ছে ব‌লে ম‌নে হ‌চ্ছে না। ব‌্যাংক রেট বাড়ার কার‌ণে ব‌্যবসায় বি‌নি‌য়োগ ক‌মে যা‌চ্ছে। ফ‌লে ভীষণ মন্দার আভাস বই‌ছে।

মন্দা শুরু হ‌লে বেকারত্ব বাড়‌বেই। তখন শুরু হ‌বে আসল খেলা। চাকুরি না থাক‌লে বা‌ড়ি‌র লো‌নের কি‌স্তি প‌রি‌শোধ করা নি‌য়ে চ্যালেঞ্জ তৈরী হ‌বে। সেট‌া সামাল দেয়া বড় ক‌ঠিন।

এ অবস্থায় এখনই সাবধান হওয়া দ‌রকার। না হলে আমও যা‌বে ছালাও যা‌বে।

মোস্তফা আকন্দ, Director of Programs & Services at Bengali Information and Employment Services (BIES)

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email