‘কালের যাত্রার ধ্বনি’  

1896
AdvertisementLeaderboard

হাসান গোর্কি

।। রয়্যাল রোডস ইউনিভার্সিটি, ভিক্টোরিয়া, ব্রিটিশ কলম্বিয়া ।। 

এই যে বিপুল বিশাল মহাবিশ্ব-এটা এলো কোথা থেকে? এটা কি সয়ম্ভু? এটা কি কোন দৈবতা?এটা সৃষ্টি হলো কেন? সৃষ্টিটা প্রয়োজন হয়ে উঠেছিল কেন? এরকম একটা মহাবিশ্ব আছে কেন? থাকলেও সেখানে আমরা আছি কেন ? আর একগুচ্ছ বিধিই বা সেখানে বিরাজ করছে কেন? এসব কোন প্রশ্নেরই উত্তর মানুষের জানা নেই। তবে মহাবিশ্ব কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল সে সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা মোটামুটি সাধারন একটা অনুমানে পৌঁছেছেন। ‘বিগ ব্যাং থিওরি’ অনুযায়ী একটা পরমাণুর চেয়েও লক্ষ কোটি গুন ক্ষুদ্রায়তন একটা বিন্দুতে পুঞ্জীভূত অসীম শক্তির বিস্ফোরণে সৃষ্ট বস্তুকণা থেকেই উৎপত্তি হয়েছে মহাবিশ্বের। সে মুহূর্ত  থেকেই এক একটি পদার্থকণা গুচ্ছ (গ্যালাক্সি) বিস্ফোরণ কেন্দ্রের বিপরীত দিকে ছুটে চলেছে। আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ে তার ৪০-৫০ হাজার কোটি সূর্য, কোটি কোটি গ্রহ, উপগ্রহ, গ্রহাণু, ধূমকেতু, উল্কাপিন্ড, গ্যাসের পাঁজা, ধুলিকণা নিয়ে বিপুল গতিতে ছুটে চলেছে কোন এক অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। সে ছুটে চলার গতি সম্পর্কে কারো কোন ধারণা নেই। সেটা হতে পারে সেকেন্ডে হাজার বা লক্ষ কিলোমিটার আবার হতে পারে আলোর গতির কাছাকাছি।

মহাকাশ নিয়ে লেখকের আরও লেখা পড়ুনঃ 
মহাকাশে বুদ্ধিমান প্রাণীর সন্ধানে
 আকাশটা কত বড়

তবে বিজ্ঞানীরা ‘ডপলার সরণ’ পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে হিসেব করে দেখেছেন মহাবিশ্বের প্রায় প্রান্ত সীমায় যে সকল গ্যালাক্সির অবস্থান চিহ্নিত করা গেছে সেগুলো ছুটছে আলোর গতির প্রায় নব্বই শতাংশ গতিতে। কোন বস্তু যদি আমাদের থেকে দূরে সরে যেতে থাকে তাহলে আমরা তার আলোর বর্ণালীরেখার বিচ্যূতি দেখবো লালের দিকে আর কাছে আসতে থাকলে বিচ্যুতি ঘটবে বেগুনির দিকে। বর্ণালীবিক্ষণের মাধ্যমে সরণ মাপার এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘ডপলার সরণ’ পদ্ধতি। এভাবে মহাবিশ্বের আয়তন প্রতি মিনিটে বাড়ছে এক লক্ষ কোটি ঘন আলোক বছর যা আমাদের পুরো গ্যালাক্সির আয়তনের দশগুণ। এ হিসেবে মহাবিশ্বের আয়তন প্রতি সেকেন্ডে যে হারে বাড়ছে তার পরিমাণ দশ লাখ কোটি সৌরজগতের আয়তনের সমান। সম্প্রসারণের এই ভয়াবহ চিত্রটা মাথায় নিতে চেষ্টা করা অর্থহীন। তাই আপাতত এখানেই ক্ষান্ত দেয়া যাক।

রেডিও দূরবিনে তোলা  মানুষের জানা মহাবিশ্বের  প্রান্ত সীমার একাংশের ছবি (গুগল ইমেজ থেকে সংগৃহীত)
রেডিও দূরবিনে তোলা  মানুষের জানা মহাবিশ্বের  প্রান্ত সীমার একাংশের ছবি (গুগল ইমেজ থেকে সংগৃহীত)

মহাকালের গর্ভে মানব সভ্যতার ইতিহাস একটা বিন্দুর মত। কালের বহমানতা যেমন আমাদের বোধের অতীত এর ব্যাপ্তিও তেমনি আমাদের কল্পনা সীমার বহু বাইরে। সময় কি আসলেই বয়ে চলে? নাকি জীব ও জড় পদার্থের দৈব দ্বৈরথ এরকম একটা ধারনার জন্ম দিয়েছে? এরিস্টটল দ্বিতীয় ধারণার পক্ষে মত দিয়েছেন এভাবে, “ভৌত জগতের সকল কিছু প্রবাহমান কিন্তু কাল স্থানিক ও স্থির।” তার এ ধারণা ছিল পরিপূর্ণভাবেই দর্শন তাত্ত্বিক যার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল না। বিশ শতকের গোড়ায় এসে আইনস্টাইন এ কথারই প্রতিধ্বনি করলেন বিজ্ঞানের ভাষায়ঃ “কাল, স্থান নিরপেক্ষ নয়।” দৈর্ঘ, প্রস্থ ও উচ্চতার সাথে তিনি আর একটি ডাইমেনশন যোগ করে দিলেন। সেটা হল সময়। কালের সাথে স্থান কীভাবে সম্পর্কিত সে বিষয়ে একটা প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যেতে পারে মহাজাগতিক সময় থেকে।

তাহলে দেখা যাক আন্তঃনাক্ষত্রিক সময়ের ব্যাপারটি কেমন। আমরা জানি দুটি বস্তুর অবস্থানগত পার্থক্যের কারণে তাদের মধ্যে সময়েরও পার্থক্য সূচিত হয়। ছয় ফুট লম্বা একজন মানুষের মাথা ও পায়ের পাতার বর্তমান সময়ে পার্থক্য হলো এক সেকেন্ডের ষোল কোটি ভাগের এক ভাগ। কিন্তু মানুষটি যদি তিন লাখ কিলোমিটার লম্বা হয় তাহলে তার মাথা ও পায়ের পাতার সময়ের পার্থক্য দাঁড়াবে এক সেকেন্ড। আর এক কোটি আশি লাখ কিলোমিটার লম্বা মানুষের ক্ষেত্রে এ পার্থক্য  হবে পুরো এক মিনিট। এ হিসেবে টরন্টো থেকে মন্ট্রিয়লের সময়ের পার্থক্য এক সেকেন্ডের ৫০০ ভাগের এক ভাগ। ঢাকার সাথে টরন্টোর পার্থক্য এক সেকেন্ডের ২৫ ভাগের এক ভাগ। পৃথিবীর সাথে চাঁদের সময়ের পার্থক্য দেড় সেকেন্ড। রাশিয়া থেকে সম্প্রচারিত বিশ্বকাপের খেলা বৃহস্পতি গ্রহে বসে কেউ যদি সরাসরি টেলিভিশনে দেখতে চেষ্টা করে তাহলে সে তা দেখবে মোটামুটি ৪৫ মিনিট পরে। এক্ষেত্রে প্রথমার্ধের খেলা শেষ হবার পর সে তা শুরু হতে দেখবে। আর নেপচুন থেকে দেখবে চার ঘন্টা পনের মিনিট পর। অর্থাৎ মহাবিশ্বের প্রত্যেকটি বস্তুর বর্তমান সময় তার একান্তই নিজস্ব। ধ্রুব বা সাধারণ বর্তমান বলে কিছু নেই। আমরা যখন রাতের আকাশের দিকে তাকাই তখন আসলে সরাসরি অতীত কালকে দেখি। অতীতের কোন এক সময় আকাশটা এরকম ছিল। নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে সে সময় বিচ্ছুরিত আলো বর্তমানে আমাদের চোখে এসে পড়ছে বলে আমরা তাদের দেখছি। বর্তমান সময়ের আকাশটাকে না দেখেই  আমরা মরে যাবো; দেখবে আজ থেকে হাজার বছর, লক্ষ বছর পরের মানুষ। পৃথিবীর আকাশে দৃশ্যমান সপ্তম উজ্জ্বল নক্ষত্র রিগ্যালকে এখন আমরা যেখানে দেখি ( ঢাকা থেকে শরত হেমন্তের আকাশে কালপুরুষ মন্ডলের কোটিবন্ধের নিচের দিকের শেষ বিন্দুতে) প্রকৃতপক্ষে আজ থেকে আটশ পনেরো বছর আগে সেটি সেখানে ছিল। ঠিক এ মুহূর্তে যদি নক্ষত্রটি নিভে যায় তাহলে আগামী আটশ পনেরো বছর পর্যন্ত সেটি আকাশে দেখা যাবে; নিয়ম মেনে উদিত হবে, অস্ত যাবে, রোমান্টিক মানুষেরা তাকে নিয়ে কবিতা লিখবে। কিন্তু ততদিনে মহাবিশ্বের কোথাও তার কোন অস্তিত্ত্ব নেই। জীবনানন্দ দাশ হয়তো সেকারণেই আকাশকে মৃত বলেছেনঃ

“যে নক্ষত্রেরা আকাশের বুকে হাজার হাজার বছর আগে মরে গিয়েছে

তারাও কাল জানালার ভিতর দিয়ে অসংখ্য মৃত আকাশ সঙ্গে করে এনেছে…”

(হাওয়ার রাত)

পৃথিবী থেকে ভেগা নক্ষত্রের দূরত্ব ছাব্বিশ আলোকবর্ষ। ধরা যাক টরন্টো শহরের কেউ একজন এ মুহূর্তে কোন এক অলৌকিক যানে চেপে এক সেকেন্ডে ভেগা নক্ষত্রের কোন গ্রহে পৌঁছে গেল। আরো ধরা যাক তার দৃষ্টিশক্তি এত প্রখর যে সে পৃথিবীর সবকিছু খুব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। সে যদি ‘ড্যানফোর্থ এলাকার দিকে তাকায় তাহলে সে তার পরিচিত কাউকে দেখতে পাবে না; দেখবে কিছু অপরিচিত মানুষ সেখানে ঘোরাঘুরি করছে। তার হিসেবে ২০৪৩ সালে সে আমাদের দেখতে শুরু  করবে। যে ঘটনাগুলোতে সে অংশগ্রহণ করে গেছে সবকিছু দেখতে থাকবে ধারাবাহিকভাবে, ঘটনাগুলো ঘটে যাবার ঠিক ছাব্বিশ বছরের ব্যবধানে। আমরা উত্তর আকাশের যে তারাটিকে ধ্রুবতারা বলি, প্রাচীনকালে নাবিকরা যে তারার সাহায্য নিয়ে পথ চলতো সেটিও আসলে ধ্রুব নয়। অকল্পনীয় গতিতে ছুটে চলার পরও বিগত দশ হাজার বছরে, বর্তমান সভ্যতার পুরো বয়স জুড়ে, পৃথিবীর তুলনায় ধ্রুবতারার অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে এক ডিগ্রীর এক হাজার ভাগের চৌদ্দ ভাগ। এ সুক্ষ স্থানচ্যূতি আমাদের চোখে ধরা না পরারই কথা। ধ্রুব তারাকে আমরা এখন আকাশের যে বিন্দুটিতে দেখছি সেটি আসলে সেখানে নেই; আছে সেখান থেকে প্রায় ৩.৪ ডিগ্রী উপরে। এখন থেকে সোয়া ছয় কোটি বছর পর যখন সে বিষুব রেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ গোলার্ধের আকাশে চলে যাবে তখন আমরা তাকে বিষুবরেখার উপর দেখতে শুরু করব। তবে সে পরিবর্তনটা দেখতে হলে ছয় কোটি পঁচিশ লাখ বছর বেঁচে থাকতে হবে।

আলো খুব ধীরে চললে দৈনন্দিন জীবনেও আমরা এরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতাম। আলোর গতি মিনিটে এক মিটার হলে ঢাকা স্টেডিয়ামে দর্শকরা ঢুকতো খেলা শুরুর একশ মিনিট পর; খেলাটি ফুটবল হলে সেটি শেষ হবার পর। কারণ সেক্ষেত্রে ১০০ মিটার দূরে গ্যালারিতে খেলার দৃশ্য পৌঁছুতে ১০০ মিনিট সময় লাগতো। আরো দেরিতে প্রবেশ করা দর্শকরা গ্যালারির পেছনের দিকে গিয়ে বসতো; ততক্ষণে সামনের সারির দর্শকেরা খেলা দেখে বেরিয়ে গেছে। ভেবে দেখুন গ্যালারিতে বসে দর্শকরা যখন গোলপোস্টের সামনে কোন খেলোয়াড়ের ড্রিবলিং দেখে উল্লাস করছে তখন সে আসলে সেখানে  নেই। বাসায় গিয়ে কফি খাচ্ছে।

মহাকাশ পাঠে কোয়াসারকে বাদ দিলে অন্যায় হবে। প্রথম কারণ মহাজাগতিক বস্তু হিসেবে এর বৈশিষ্ট্যগত গুরুত্ব। আর দ্বিতীয়  কারণ হলো ব্যাখ্যার ধরণে ভিন্নতার কারণে এ নিয়ে জোতির্বিদ্যার পাঠক মহলে এক ধরণের  অস্পষ্টতাও আছে। প্রকৃতপক্ষে কোয়াসার হলো অতি বিক্ষুদ্ধ তরুণ গ্যালাক্সি। অন্য কথায় একটা গ্যালাক্সি সৃষ্টির প্রাথমিক অবস্থাঃ গ্যাসীয় পদার্থের ঝঞ্ঝা, প্রবল ঘূর্ণিপাক, অগ্নিঝড়, ধুলিকণা আর প্রস্তর খন্ডের প্রলয়োল্লাসে উত্তাল হয়ে ওঠা মহাকাশের বিশাল অঞ্চল। মহাকাশে এরকম হাজার দশেক কোয়াসারের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিদরা। এদের বেশির ভাগের অবস্থান মহাবিশ্বের প্রান্তসীমায় অর্থাৎ পৃথিবী থেকে মোটামুটি তেরো-চৌদ্দশ কোটি আলোকবর্ষ দূরে। অতি শক্তিশালী রেডিও দূরবিনে তোলা কোয়াসারের কিছু স্পষ্ট ছবি সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের হাতে এসেছে। সেই ছবিগুলো নিয়ে বিজ্ঞানীদের আনন্দের সীমা পরিসীমা নাই। এক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের অবস্থা ঢাকা স্টেডিয়ামের সেই কাল্পনিক দর্শকদের মত যারা শূন্য মাঠের দিকে তাকিয়ে খেলা দেখে উল্লাসে ফেটে পড়ে। কোয়াসার বলতে সেখানে আর কিছু এতদিনে থাকার কথা নয়, বারোশ কোটি বছর আগে ছিল। এখন হয়তো সেখানে গ্রহ, উপগ্রহ আর নক্ষত্রের সুবিশাল মেলা বসেছে ; সৃষ্টি হয়েছে সুবিন্যস্ত-সুশৃঙ্খল হাজার হাজার গ্যালাক্সির। সেখানেকার লোকজন (যদি থেকে থাকে) মিল্কিওয়ের দিকে তাকিয়ে এর বারোশ কোটি বছর আগের অবস্থা অর্থাৎ একটা কোয়াসারকে দেখছে।

বিজ্ঞানীদের কাছে মহাজাগতিক বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে দুর্বোধ্য হলো ব্লাকহোল।  সহজ কথায় ব্লাকহোল হলো পদার্থের অকল্পনীয় রকম ঘনীভূত অবস্থা। আমাদের পৃথিবীটাকে যদি কোনরকমে চেপেচুপে একটা ফুটবলের আকৃতি দান করা যায় তাহলে সেটি কৃষ্ণবিবরে পরিণত হবে। তখনও তার ভর ও মাধ্যাকর্ষণ থাকবে পৃথিবীর সমান। অর্থাৎ ঐ ফুটবল থেকে মশুর দানার সমান পদার্থ কেটে নিলে তার ভর হবে মোটামুটি ছয় কোটি কোটি টন। পৃথিবীর সবগুলো পাহাড়ের সন্মিলিত ভর ঐ মশুর দানার চেয়ে কম হতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন যখন কোন দানব আকৃতির নক্ষত্রের ভর এত বেশি হয় যে তার ভেতরের দিকের পদার্থকণা বাইরের চাপ সহ্য করতে পারে না  তখন শুরু হয় এক প্রবল ধ্বস। এতে সব পরমাণুর ইলেকট্রন প্রোটন মিলেমিশে অতি ঘন নিউট্টনে পরিণত হবার ফলে কৃষ্ণবিবরের উৎপত্তি ঘটে। মহাকাশে কৃষ্ণবিবরের অবস্থান খুঁজে বের করা বেশ শক্ত। কারণ প্রবল মাধ্যাকর্ষণের কারণে এর গা থেকে কোন কিছু, এমন কি আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না। তবে পরোক্ষ কিছু বিষয় থেকে কদাচিৎ এর অবস্থান জানা যায়।

পৃথিবী থেকে এগারো হাজার আলোকবর্ষ দূরে হংসমন্ডলে এরকম একটা কৃষ্ণবিবরের খোঁজ পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা তার নাম দিয়েছেন সিগনাস এক। তারা উহুরু নামের এক কৃত্রিম  উপগ্রহের মাধ্যমে অনুসন্ধান করে দেখেছেন কৃষ্ণবিবরটি পার্শ্ববর্তী এক নীল দানব তারার গা থেকে প্রতিদিন দশ হাজার কোটি টন গ্যাস শুষে নিচ্ছে। কৃষ্ণবিবরে  ঢোকার মুহূর্তে ঐ গ্যাসপুঞ্জের গতিবেগ আলোর গতির প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে যায় আর তাপমাত্রা পৌঁছে পঞ্চাশ কোটি ডিগ্রী সেলসিয়াসে। ফলে গ্যাসপুঞ্জের গতিপথটি অস্বাভাবিক উজ্জলতা ছড়ায়; আর তা থেকে কৃষ্ণবিবরের অবস্থান জানা যায়। কৃষ্ণবিবরের মধ্যে কি ঘটে তা জানার এমনকি নিদেনপক্ষে অনুমান করারও কোন উপায় নেই। বিজ্ঞানীদের ধারণা এর মধ্যে যা একবার ঢোকে তা চিরদিনের জন্যে মহাবিশ্বের বাইরে চলে যায় অথবা চলে যায় সমান্তরাল মহাবিশ্বে; টিকে থাকে প্রতি-পদার্থের আকারে। অনেক বিজ্ঞানীর ধারণা কৃষ্ণবিবর যেহেতু আলো সহ সবকিছু গিলে খায় তাই এর ভেতরটা অসম্ভব উজ্জ্বল-আলোকময়। যেটাকে আমরা কৃষ্ণবিবরের ঘটনা দিগন্ত বলে জানি সেটা আসলে প্রতি ঘটনার শুরুর সীমান্ত।

কৃষ্ণ বিবরের কাছাকাছি গেলে তাকে কেমন দেখা যাবে তার একটা কল্পিত চিত্র (নাসার ওয়েব সাইট থেকে সংগৃহীত)
কৃষ্ণ বিবরের কাছাকাছি গেলে তাকে কেমন দেখা যাবে তার একটা কল্পিত চিত্র (নাসার ওয়েব সাইট থেকে সংগৃহীত)

মহাজাগতিক সময়ের মত বিধির বিষয়টিও একই রকম গোলমেলে। চিরন্তন  সত্যের উদাহরণ দিতে গেলে আমরা বলি ‘‘পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে।” বিষয়টি সত্য তবে চিরন্তন সত্য নয়, আংশিক বা খন্ডকালীন সত্য। আজ থেকে সাড়ে পাঁচশ কোটি বছর আগে সূর্য ছিলনা, পৃথিবী ছিলনা। অতএব “পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে” কথাটিও সত্য ছিলনা। আজ থেকে সাড়ে পাঁচশ কোটি বছর পর বলতে হবে ‘‘এক সময় পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতো এবং মানুষ মরণশীল ছিল’’। আমরা দেখি সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, শীত-গ্রীস্ম-বর্ষার আগমন সবকিছুই স্মরণাতীত কাল থেকে ঘটছে অমোঘ পৌনঃপুনিকতায়, অণুপুঙ্খ নিয়ম মেনে। কিন্তু আমাদের কাছে যা ‘স্মরণাতীত কাল’ আসলে তা এতই ক্ষুদ্র সময় যে তাকে একটা মুহূর্তের ভগ্নাংশ বললেও বেশি বলা হবে। মহাকালের তুলনায় আমরা বেঁচে থাকি খুব কম সময়। এর বিশাল ব্যাপ্তিতে ঘটে যাওয়া অসংখ্য ঘটনার এক অতি ক্ষুদ্র অংশ আমরা দেখি। আর সবকিছু নিয়ম মাফিক ঘটতে দেখি অন্য যে  কারণে সেটি হলো ক্ষণস্থায়ী যে বিধান আমাদের তৈরি করে সেটি ভেঙে যাবার পর আমরা থাকিনা। যে অনিয়ম আমাদের অস্তিত্বকে অসম্ভব করে তোলে তা দেখা আমাদের পক্ষে সম্ভব হলেও পরবর্তীতে পৃথিবীতে আসা কোন মানব গোষ্ঠীর পক্ষে সেটা জানা সম্ভব নয়।

হয়তো আজ থেকে একশ কোটি বছর আগে সৌরজগতে গ্রহের সংখ্যা ছিল পঞ্চাশটি। কালক্রমে তার ৪২টি কক্ষচ্যূত হয়ে সূর্যের লেলিহান অগ্নিগাঙে ডুবে গিয়ে নিঃচিহ্ন হয়ে গেছে। সেগুলোর কোন কোনটি হয়তো মানুষের মত বুদ্ধিমান প্রাণীসহ ঝাঁপ দিয়েছে সূর্যের বুকে। পৃথিবীর মানুষকে এ খবরটি তারা জানিয়ে যেতে পারেনি। মঙ্গল গ্রহের মানুষরা যদি ১০০ কোটি বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে সেটা আমাদের জানার কথা নয়। কারন সেক্ষেত্রে ঘটনাটা ঘটেছে আমাদের পৃথিবীতে আগমনের ৯৯ কোটি ৭০ লক্ষ বছর আগে। কোন মানুষের বয়স যদি পনেরোশ কোটি বছর হতো তাহলে সে পুরো ঘটনাটা বলতে পারতো। তার কাছে মহাজগৎ কে এক চরম অরাজকতাপূর্ণ ও বিশৃঙ্খল ঘটনাবলীর সমাহার ছাড়া কিছুই মনে হতো না। সে দেখতো, একটা বিন্দুতে অকল্পনীয় বৃহৎ একটা বিস্ফোরণের পর গ্যাসের পাঁজা, ধুলিকণা, প্রস্তরখন্ড, অগ্নিগোলক – সবকিছু প্রায় আলোর গতিতে দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করেছে। ছুটন্ত অবস্থায়-ই এদের মধ্যে জোট (গ্যালাক্সি) তৈরি হচ্ছে। বিস্ফোরণকালীন শক্তি ধারণ করে জোটগুলো নিজ অক্ষে আবর্তিত হতে শুরু করেছে। সেগুলো পরস্পরের মধ্যে ঢুকে পড়ে প্রবল সংঘর্ষে ছত্রখান হয়ে যাচ্ছে। মহাকাশে ছড়িয়ে দিচ্ছে কোটি কোটি মাইল  দীর্ঘ আগুনের শিখা। কোথাও পুঞ্জীভূত গ্যাসীয় মেঘমালা থেকে তৈরি হচ্ছে নক্ষত্র; উপজাত হিসেবে গহ, উপগ্রহ, গ্রহাণু। কোন কোন গ্রহে প্রাণের উম্মেষ ঘটছে এবং মুহূর্তে তা বিলুপ্ত হচ্ছে। মুহূর্তে বলা হচ্ছে এ কারণে যে সেই কল্পিত ব্যক্তির বয়স যদি আমরা পঁচাত্তর  বছরে  সঙ্কুচিত করে হিসেব করি তাহলে সে আফ্রিকার গুহাবাসী মানুষের পূর্ব প্রজাতির আবির্ভাব (মোটামুটি ত্রিশ লাখ বছর আগে ঘটেছে বলে ধরা হয়) থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের বিবর্তনকে দেখবে পনেরো দিনে; ক্রোমেনিয়ন মানব থেকে বর্তমান মানবে বিবর্তন দেখবে এক ঘন্টায়; ইউরোপের শিল্প বিপ্লব থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীকে দেখবে মাত্র এক সেকেন্ডে।

‘মহাবিশ্বটা সৃষ্টি হলো কেন’ কখনও না কখনও এ প্রশ্নটা মাথায় ঘুরপাক খায়নি এমন মানুষের সংখ্যাও খুব কম। যে সকল অনুসঙ্গ একত্রিত হলে এরকম একটা ঘটনা ঘটে থাকতে পারে তা প্রায় সংখ্যাতীত। ‘এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’ বইয়ে স্টিফেন হকিং এ প্রসঙ্গে একটা কৌতুকপ্রদ উদাহরণ দিয়েছেন। উদাহরণটি হলো, নিরক্ষর বাঁদরের একটা বিরাট দল লম্বা সারিতে বসে কম্পিউটারের কী বোর্ডে আঙুল ঠুকে চলেছে; এবং তাদের ইচ্ছেমত কিছুক্ষণ পর পর কৃতকর্মের একটা করে প্রিন্ট নিচ্ছে। উৎপাদন যা হচ্ছে তার প্রায় পুরোটাই অর্থহীন শব্দ সম্ভার। কিন্তু তাদের কেউ একজন দৈবাৎ শেক্সপিয়রের একটা সনেটও টাইপ করে ফেলতে পারে। বিজ্ঞানের ছাত্র মাত্রই জানেন পারমুটেশন কম্বিনেশনের বিধিতে সম্ভাবনাটি শূন্য নয়। সে অর্থে মহাবিশ্বের সৃষ্টি একটা দৈব ঘটনা হবার সম্ভাবনাও শূন্য নয়; কিন্তু শূন্যের কাছাকাছি কোন একটা সংখ্যা তো বটেই।

মহাবিশ্ব সৃষ্টি না হলে কি হতে পারত? এর সহজ জবাব হলো যা যা ঘটতে পারত তার সবগুলোই ঘটে গেছে। সে সব নিয়ে আমরা প্রশ্ন করছি না কারণ ঐ ঘটনাবলীতে আমাদের থাকার সুযোগ ছিলনা। বিগ ব্যাং- এর আগে আমরা কি এই ভেবে উদগ্রীব ছিলাম যে মহাবিশ্ব কেন সৃষ্টি হচ্ছে না? উদগ্রীব ছিলাম না। কারণ তখন আমরাই ছিলাম না। আলো, অন্ধকার, সময়, শূন্যতা, বোধ, চেতনা কিছুই ছিলনা। এই অনস্তিত্ত্বকে বাস্তব বলে মেনে নিতে আমরা বাধ্য যদি অপরাপর অস্তিত্ত্বকে আমরা বাস্তব বলি।

আরেকটা পুরনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা এখনও গলদঘর্ম হচ্ছেন। মহাবিশ্ব অসীম না সসীম? একদল বিজ্ঞানীর মতে স্থান ও কাল অগ্রপশ্চাৎহীন; এর কোন শুরু বা শেষ নেই। শুধুই অবহমান অসীম একটা ব্যাপ্তি আছে। অন্যরা (এ দলে হকিং, আইনস্টাইন, এডিংটন, সুব্রামনিইয়াম চন্দ্রশেখর ও ফ্রিডম্যানের মত বড় বিজ্ঞানীরাও রয়েছেন) বলছেন মহাশূন্য স্থানে অসীম; সময় ও স্থানের তল বক্র বা জিওডেসিক। কোন বক্রতলের যেমন কোন শুরুর বিন্দু নেই, সময় ও স্থান সসীম হলেও বক্র বলে তাদের কোন শুরু বা শেষ বিন্দু নেই। সে অর্থে তারা অসীমও। এ দাবীর ব্যাখ্যা হলো, কেউ যদি কোন সরলরেখা বরাবর অসীম দূরত্ব অতিক্রম করে তার শেষ মাথায় পৌঁছুতে পারে তাহলে দেখবে, সে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক সেই বিন্দুটিতে যেখান থেকে সে যাত্রা শুরু করেছিল। তাহলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি বুঝে শুনেই বলেছিলেন ‘‘সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর ?”

মহাবিশ্বের পরিনতি বিষয়ে বিজ্ঞানীরা তিনটি মতবাদে বিভক্তঃ উন্মুক্ত, স্থির, আবদ্ধ। (ছবিঃ গুগল ইমেজ)
মহাবিশ্বের পরিনতি বিষয়ে বিজ্ঞানীরা তিনটি মতবাদে বিভক্তঃ উন্মুক্ত, স্থির, আবদ্ধ। (ছবিঃ গুগল ইমেজ)

এসবের শেষ কোথায়? বিজ্ঞানীদের মধ্যে একটা বড় অংশের মত হলো, অসীম শক্তির বিস্ফোরণে যেহেতু মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে তাই অসীম সময় পর্যন্ত নতুন নতুন পদার্থকণা তৈরি হতে থাকবে  এবং মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ চলবে অনন্তকাল। মহাবিশ্বে মোট পদার্থের পরিমান যদি এরকম হয় যে এদের মহাকর্ষীয় বল ঐ সম্প্রসারনের গতিকে শ্লথ করে দিতে না পারে তাহলে প্রসারন চলতে থাকবে। এই বলকে তারা বলছেন সংকট সীমা। বিজ্ঞনীরা হিসেব করে দেখেছেন মহাবিশ্বের মোট পদার্থের পরিমান সংকট সীমার শতকরা মাত্র ১০ ভাগ। দ্বিতীয় পক্ষের মত হলো, মহাবিশ্বে দৃশ্যমান পদার্থের পরিমান শতকরা দশ ভাগ হলেও অদৃশ্য পদার্থের (বিশেষত ডার্ক মেটার ও এন্টি মেটার) পরিমান সংকট সীমার সমান। তাই তারা মনে করছেন সম্প্রসারণ এক সময় থেমে যাবে এবং মহাবিশ্ব একটা স্থিতাবস্থায় পৌঁছুবে। আব্দুল্লাহ আল মুতি সরফুদ্দিন তার লেখা জীবনের শেষ বইয়ের (মহাকাশে কী ঘটছে) শেষ অধ্যায়ে এই তত্ত্বের সমর্থনে একটা চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। মহাবিশ্বের সবগুলো নক্ষত্র মরে যাবে, তারা ঠাণ্ডা হয়ে হীরকখণ্ডে পরিনত হবে, গভীর অন্ধকারে প্রানহীন, মৃত গ্রহগুলো ভেসে থাকবে। তার বর্ণনার ধরন এত প্রানবন্ত যে তা পড়লে বিরান সেই মহাজগতের নিঃসঙ্গতার কথা ভেবে যে কারো মন বিষাদে ছেয়ে যাবে। শেষোক্তরা বলছেন, অদৃশ্য পদার্থের পরিমান বর্তমান ধারণার তুলনায় কয়েক গুন বেশী এবং তা সংকট সীমারও প্রায় দ্বিগুণ। তাই সম্প্রসারণ থেমে  যাবার পর গ্যালাক্সিগুলো আবার বিষ্ফোরণ কেন্দ্র অভিমুখে সংকুচিত হতে শুরু করবে। সেই মহাসংকোচনটা  যদি এখনই শুরু হয় তাহলে আজ থেকে পনেরো মহাপদ্মকাল (পনেরশ কোটি বছর) পর মহাবিশ্বের অনুমিত ৪০ থেকে ৫০ হাজার  কোটি গ্যালাক্সি একটা পরমাণু কেন্দ্রকের লক্ষ ভাগের একভাগ জায়গায় গিয়ে আবদ্ধ হবে। তাতে আরেকটা মহাবিস্ফোরণের সকল শর্তই পূরণ হবে। আরেকটা বিগ ব্যাং থেকে শুরু হবে নতুন মহাবিশ্বের যাত্রা। এ বিষয়ে বেশি আগ্রহী পাঠকরা প্রফেসর মিজান রহমান ও অভিজিৎ রায়ের লেখা শূন্য থেকে মহাবিশ্ব বইয়ের ‘’মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি’’ অংশটুকু এই লিংক (https://blog.mukto-mona.com/2013/10/07/37652/ ) থেকে পড়তে পারেন।

লেখকের ইমেইলঃ hassangorkii@yahoo.com
Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email