গবেষক অপূর্ব শর্মার গ্রন্থ নিয়ে লন্ডনে আলোচনা সভা

308
AdvertisementCBN-Leaderate

ফারজানা নাজ শম্পা, হ্যালিফ্যাক্স, কানাডা ||

বিশ্বময় নুতন প্রজন্মের বাংলাদেশিদের জন্য আমাদের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিদিত ও প্রান্তিক মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাস তুলে ধরার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করছেন গবেষক ও সাংবাদিক অপূর্ব শর্মা।

দেশাত্ববোধের চেতনার লালিত এই বঙ্কিম ব্যক্তিত্ব অতি সম্প্রতি গত ১৬ নভেম্বরে শনিবার লন্ডনের ‘কবি নজরুল সেন্টারে’ তাঁর রচিত ‘চা বাগানে গণহত্যা ১৯৭১’ থেকে আলোচনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

লন্ডনের জনপ্রিয় আবৃত্তি সংগঠন ‘ছান্দসিক’ এই আয়োজনের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন ছান্দসিকের প্রতিষ্ঠাতা প্রবাসে বাংলার মুখ রূপে সুপরিচিত আত্মপ্রতয়ী ব্যক্তিত্ব বাচিকশিল্পী মুনিরা পারভীনের এবং একই সাথে এই সংগঠনের সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আয়োজনটি সার্বিক সফলতার লাভ করে।

গত ১৬ নভেম্বর পূর্ব লন্ডনের কবি নজরুল সেন্টারে টাওয়ার হ্যামলেটস এর ‘সিজন অব বাংলা ড্রামার ‘আয়োজনে ছান্দসিক ‘জেনোসাইড ইন টি এস্টেট ইন বাংলাদেশ নাইনটিন সেভেন্টিওয়ান’ এই শিরোনামে পরিবেশনা করেছে। উল্লেখ্য যে লন্ডনে গত পহেলা নভেম্বর হতে শুরু হওয়া মাসব্যাপী এই  আয়োজন ও উৎসবটি চলবে আগামী ২৪ শে নভেম্বর পর্যন্ত।

দেশের সীমানা পেরিয়ে সুদূর লন্ডনে দর্শকদের মাঝে নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিক, লেখক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক অপূর্ব শর্মা প্রাণবন্ত ভঙ্গিমায় সাবলীল ঐতিহাসিক উপস্থাপনা একটি বাংলাদেশের ইতিহাসের স্বরূপ ছড়িয়ে দেবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এই প্রসঙ্গে  তিনি  তাঁর রচিত ‘চা বাগানে গণহত্যা ১৯৭১’ গ্রন্থ রচনার প্রেক্ষাপট থেকে  পাঠ ও বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে তুলে ধরেন এক অজানা আখ্যান ।

লন্ডনের জনপ্রিয় আবৃত্তি সংগঠন ‘ছান্দসিক’ এর প্রতিষ্ঠাতা বাচিকশিল্পী মুনিরা পারভীন গবেষক অপূর্ব শর্মার গ্রন্থ হতে অসাধারণ ভাবে পাঠ উপস্থাপনা করেন। যাতে আলোচিত হয় চাবাগানের তৎকালীন ব্যবস্থাপক সিরাজুল অবদালের জীবনের করুন আখ্যান। সিরাজুলের স্ত্রীর সকিনার সুদীর্ঘ অপেক্ষার বিষয়টি, পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক নির্মমতার প্রতিদিন কিভাবে নির্যাতনের নির্মমতার ভয়াবহ প্রকাশ ঘটে সিরাজুলের শরীর থেকে রক্ত নিয়ে পাকিস্তানি আহত সৈনিদের দেয়ার মাধ্যমে ।সেই মর্মান্তিক ঘটনার প্রেক্ষাপট মুনিরার হৃদয়স্পর্শী পাঠ উপস্থিত সকলেই আবেগ তাড়িত করে তুলে।

মুনিরা পারভীন লন্ডনে ছান্দসিকের নিয়মিত বিভিন্ন আয়োজনে অপূর্ব শর্মার বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে পাঠ প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছেন। সেদিনের এই আলোচনায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য ব্যক্তিত্বরা হলেন  মুক্তিযোদ্ধা ইসহাক কাজল এবং মুক্তিযোদ্ধা আবু মুসা হাসান।

জনাব ইসহাক কাজল ব্রিটিশ আমলে চা বাগানের শ্রমিকদের  ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের পরম্পরায় আলোচনা করেন। তিনি একই সাথে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ‘সুরমা উপত্যকার চা শ্রমিক আন্দোলন: অতীত ও বর্তমান’ ২০০৬ থেকে আলোচনা করেন। ইসহাক কাজল মহান  স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহনের তাঁর আলোকিত স্মৃতিচারণ করেন। চা শ্রমিক আন্দোলনের সাথে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার  নিরিখে চা শ্রমিকদের বঞ্চনার স্মৃতি তুলে ধরেন ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দিকটা তিনি আলোচনা ধরেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া চা  শ্রমিকরা অনেকেই সঠিক স্বীকৃতি পাননি সেই দিকটি উল্লেখ করে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।

মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক আবু মুসা হাসান তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন ‘অপূর্ব শর্মা ও ছান্দসিকের পরিবেশনায় চা বাগানে গণহত্যা ১৯৭১, সিলেটে চা বাগানের বাসিন্দাদের উপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর নির্যাতনের কাহিনীর এই ধরনের নির্মমতা সারাবাংলা দেশেই ‘বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ঘটেছে।’

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানান, ‘আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম তাদের চাইতেও নির্যাতনের শিকার বেশী হয়েছিল দেশের সাধারণ জনগণ’। তিনি মতামত দেন যে জনগণের সহযোগিতা ছাড়া এই গেরিলা যুদ্ধ সম্ভব নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও সহযোগিতা দেবার কারণে এবং যাদের আত্মীয়স্বজন যুদ্ধে যান সেই পরিবারের উপর নির্যাতন মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি।

বাড়ি-ঘরে আগুন দিয়ে, মা-বোনদের ধর্ষণ করেছে পাকবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদররা। তিনি জানান লন্ডনের এই দূর প্রবাসেও ‘ছান্দসিক’ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই সময়কার নির্যাতন ইতিহাস  বার বার তুলে ধরছে। এই উদ্যোগের প্রতি তিনি বিশেষ আশাবাদ ব্যক্ত করেন ‘ছান্দসিক’ যেন তাঁদের  এই উদ্যোগ চালিয়ে যায়। তিনি প্রবাসের নতুন প্রজন্মের কাছে সহজবোধ্য করার জন্য এই  অবৃত্তির কিছুটা ইংরেজিতে অনুবাদ করার প্রয়োজনীয়তা দিকটা উল্লেখ করেন।

আয়োজনের মুখ্য আলোচক বাংলাদেশের সিলেট জেলার প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা ‘দৈনিক যুগভেরীর’ নির্বাহী সম্পাদক ও গবেষক অপূর্ব শর্মা। অপূর্ব শর্মার ২০০৮ সাল থেকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বিভিন্ন গবেষনাকর্মে সম্পৃক্ত রয়েছেন।

অপূর্ব শর্মার দীর্ঘ সময়ের সরেজমিনে গবেষণার  ফসল হলো ‘চা বাগানে গণহত্যা’ শীর্ষক গ্রন্থটি। গ্রন্থটি রচনার পশ্চাতে দীর্ঘ বাঁধার  পথ পড়ি দিতে হয়েছে কর্মনিষ্ঠ এই একাগ্র মানুষটিকে। নিজের শ্রম ও অর্থ ব্যয় করে তিনি দেশাত্ত্ববোধের মানবিক ও দায়বদ্ধতার দর্শন থেকে ছুটে চলেছেন অবিরত। এই দীর্ঘ পরিক্রমায় কোন মোহ দ্বারা তিনি  তাড়িত হননি। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি শাসক চক্রের  নির্মমতা ও নির্যাতনের অজানা ইতিহাস তুলে ধরবার শুদ্ধ প্রত্যয় নিয়ে তিনি কাজ করেছেন অবিরত।

সবুজ চা বাগানের প্রান্তিক পর্যারের ও লোকচক্ষুর অন্তরালে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের অসামান্য ইতিহাস অবদান, ত্যাগ, প্রাণবির্সজন এবং সংগ্রামের ইতিহাস এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তাঁদের সঠিক স্বীকৃতি ও প্রচারে ক্ষেত্রে অপরাগতা ইত্যাদি বিষয়ে তাঁকে মর্মাহত করতো। গতানুগতিকতাকে পরিহার করে অপূর্ব  তাঁর গবেষণায় প্রয়োগ করেছেন নুতন এক মাত্রা যার অন্তৰ্গত হয়েছে গভীর পর্যবেক্ষণের মনস্তাত্বিক ও মানবিক ভাষা। তিনি দৃঢ় প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন যে তিনি অঙ্গীকার বদ্ধ জীবনের বাকিটা সময় অশ্রুত মুক্তিযোদ্ধাদের ও নির্যাতিতা মা-বোনদের আত্মত্যাগের অশ্রুত ইতিহাস সংরক্ষণের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে যাবেন।

অপূর্ব শর্মা তাঁর আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার কর্তৃক মা বোনদের উপর অকথ্য নির্যাতনের বিষয়টি তুলে ধরেন আর সেই প্রসঙ্গে তাঁর অপর গ্রন্থ ‘বীরাঙ্গনা কথা’ থেকে আলোচনা করেন। প্রসঙ্গে অনন্য এক  নারী ব্যক্তিত্ব প্রভা রানী যিনি নির্মমতার শিকার তাঁকে নিয়ে আলোচনা করেন। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে  মহিয়সীর মা বোনেরা ও তার সন্তানেরা অনেক সময় লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। তাঁদের অমর্যাদার করুণ বাস্তবতায় চিত্র অপূর্বকে বিশেষ ভাবে আলোড়িত করে। বাংলাদেশ সরকার বীরাঙ্গনা নারীদের স্বীকৃতি দিয়েছেন আর প্রভা রানী বর্তমানে সরকারি ভাতা পাচ্ছেন যা তার জীবনধারণে জন্য সহায়ক হয়েছে। আর অনেক দুঃখের মধ্যে চা বাগানের শ্রমিকদের সন্তানের কেউ কেউ উচ্চশিক্ষা পাচ্ছেন অপূর্ব শর্মা সেদিকটাকে একটি আশাব্যঞ্জক একটি দিক রূপে বিবেচনা করেন। অপূর্ব বলেন মুক্তিযুদ্ধের পরবতী প্রজন্ম রূপে তিনি শুধুমাত্র কলম দিয়ে হলেও যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সংকল্পবদ্ধ।

অপূর্ব শর্মা তাঁর বক্তব্যের এক পর্যায়ে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্ম রূপে আমাদের দায়িত্ব অনেক। মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে আমাদের এক স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছে। আর এই যুদ্ধে নারীদের অবদান ও আত্মত্যাগ অনেক বেশি। তারা রণাঙ্গনে যেমন অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, গেরিলা হিসেবে কাজ করেছেন, তেমনি স্বামী-সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়ে নারীরা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের, ধর্ষণের নির্মমতার শিকার হয়েছেন।

অপূর্ব শর্মা বলেন, ‘অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার তাঁর সুযোগ হয়নি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করছি, কাজ করছি। আর সেদিকটিই তিনি পরম প্রাপ্তি রূপে বিবেচনা করেন। ছাইচাপা পড়ে থাকা প্রান্তিক মুক্তিযোদ্ধা এবং মহিয়সী প্রান্তিক বীরাঙ্গনা মা বোনেদের অনন্য আত্মত্যাগের অজানা উজ্জ্বল অধ্যায় তিনি একের পর এক আবিস্কার করে চলছেন আগামী প্রজন্মের জন্য। ছুটে চলেছেন এক নির্ভীক সেনা রূপে দেশপ্রেমের আলোক উদ্ভাসিত এক যাত্রাপথে। দেশে ও প্রবাসের মাটিতেমুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইতিহাসকে সমুন্নত করতে। অপূর্ব শর্মার সাবলীল ভাষ্য- ‘সমৃদ্ধ দেশ গড়তে হলে প্রবাসের তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মকে দেশ প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে অবগত করা হবে’।

ছন্দসিকের অপর এক বক্তা জনাব আমিন অপূর্ব শর্মার গ্রন্থ বিভিন্ন অংশ থেকে পাঠ করে উপস্থাপনা করেন চা বাগানের যুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি বর্বরতার ভয়াবহ এক আখ্যান। আলোচিত হয় নির্মমতার অশ্রুত একটি প্রেক্ষাপট। সিলেটের খেজুরীছড়া চা বাগানের ফ্যাক্টরীর পাহারাদার ভগি সিং ভূমিজ ছোট্ট দুই মেয়ে গংঙ্গা ও যমুনাকে নিয়ে ফ্যাক্টরির বাইরে অবস্থায় পাকিস্তানি হানাদার বর্বরতা শিকার হয় ফ্যাক্টরির চাবির দিতে অস্বীকৃতি জানালে হানাদারেরা এই দুই মেয়েকে ধরে নিয়ে জিপে উঠিয়ে নিয়ে তাঁদের উপরের নির্মম বর্বরতা চালায় কিছুদের তাঁদেরকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এরপর ভূমিজকে হত্যা করা হয়। সেই আলোকে উঠে আসে আরো অনেক নাম। জানা যায় মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করার অপরাধে চা বাগানের গিরিন্দ বুনাজী, মনিলাল ঘোষ, হরমুজ তাঁতী, রথি প্রধানসহ আরো অনেককে ধরে নিয়ে একইভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। চা বাগানের বাগানের গোপাল সবরের মেয়ে লক্ষ্মী সবরকেও ধরে নিয়ে পাক বাহিনী তার আর  নির্যাতন ও বর্বরতা চালায়। অসহনীয় এই নির্যাতনে লক্ষ্মীর রক্তক্ষরণ শুরু হলে বিবস্ত্র লক্ষ্মীকে হানাদার ক্যাম্পের বাইরে ফেলে রাখা হয়। এই অকথ্য নির্যাতনের ফলে সকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে লক্ষ্মী। বাগানের বাসিন্দা রাজাকার গফুর মিয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়নি মুরতীয়া কৈরী, তাকে নিয়ে যায় ক্যাম্পে, লক্ষ্মীর জীবনের  মতই করুন পরিণতি হয় মুরতীয়া কৈরীর।মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ‘দেওয়া ছড়া’ চা বাগানের কাজকর্ম বন্ধ করে দেয়া হয়। অর্থাভাবে জীবনে নেমে আসে অনাহার কষাঘাত।

আর শ্রমিকেরা অনেকটা বাধ্য হয় বেছে নেন মানবেতর জীবনযাপনে। একাত্তরের তেশরা মে মৌলভী বাজারে রেশন দেওয়া হবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে বস্তিতে ঢুকে সব যুবকদের আর্মীর গাড়িতে উঠানো হয়। কিছুদূর নিয়েই বাগানের ছোট বাংলোর সামনে সকলকে নামানো হয়। এই যুবকদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে গুলিতে ঝাঁঝড়া করে দেওয়া হয শরীর। ফিনকি দিয়ে বের হতে থাকে রক্ত আর পরিশেষে  ছটফট করতে করতে নিথর হয়ে যায় তাদের শরীর।

লন্ডনের এই আয়োজনে অপূর্ব শর্মা সহ সকলের বক্তব্য পাঠ ও আবৃত্তি ও অন্যান্য পরিবেশনা সমৃদ্ধ হৃদয়গ্রাহীআয়োজনের ফলস্বরূপ কবি নজরুল সেন্টারে সৃষ্টি হয়েছিল একাত্তরের বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। সকলের মাঝে বিরাজ করছিল এক শোকবিহ্বল স্তব্ধতা। মুক্তিযুদ্ধের চা বাগানে পাকিস্তানিদের হানাদার বাহিনীর জঘন্যতম বর্বরতার কথা, প্রান্তিক পর্যায়ের অশ্রুত মুক্তিযোদ্ধা ও মহিয়সী বীরাঙ্গনা নারীদের আত্মত্যাগের করুণ ইতিহাস নিয়ে তাঁদের এই আয়োজন প্রবাসে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক পুনর্জাগরণে এক নব অধ্যায়ের সূচনা করলো।

মুনীরা পারভীনসহ এই অনুষ্ঠানে ছান্দসিকের সম্মানিত সদস্যরা যারা আবৃত্তি করেছেন তারা হলেন শতরূপা চৌধুরী, রাজ দাস, সমভা বিশ্বাস, সাবরিনা এনি, তানভীর আহমেদ এবং আমিন খান। ছান্দসিক এর সংশ্লিষ্ট  সকলের ও মুনিরা পারভীন এবারের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁরা এক সত্য প্রমাণ করেছেন শুধুমাত্র অদম্য ইচ্ছে আর একাগ্রতায় পড়ি দেওয়া যায় সকল প্রতিবন্ধকতার বন্ধুর পথ।  এইভাবে প্রবাসেও বাংলাদেশর মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কে সমুন্নত রেখে নিয়মিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মুনিরা এবং ছান্দসিক – এমনটাই ছিল সকলের প্রত্যাশা। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে মুনিরা পারভীন লন্ডনের এই অনুষ্ঠানের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস কর্তৃপক্ষ।

প্রবাসের মাটিতে ও দেশাত্মবোধে ঋদ্ধ উপস্থিত সকলের প্রতি  আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। অপূর্ব শর্মা নিজেও এক পর্যায়ে  জানান আলোচনার মুক্তিযুদ্ধ আমাদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ এক অর্জন। মুক্তিযুদ্ধের  অসামান্য ইতিহাস সমুন্নত রাখার জন্য বিলেতে এমন একটি আয়োজনে অংশ নিতে পেরে ‘সত্যিই তিনি আবেগে আপ্লুত আমি।’

অপূর্ব শর্মার রচিত উল্লেখযোগ্য গবেষণা গ্রন্থগুলো হচ্ছে, বীরাঙ্গনা কথা (২০১৩), মুক্তিযুদ্ধের এক অসমাপ্ত অধ্যায়: ফিরে আসেনি ওরা (২০১৩), মুক্তি সংগ্রামে নারী (২০১৪), মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর(২০১৬), চা-বাগানে গণহত্যা : ১৯৭১ (২০১৬) ও মুক্তিযুদ্ধে সিলেটজেলা (২০১৭), অনন্য মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি (২০০৯), মুক্তিযদ্ধের পূর্বাপর (২০১৬)।

এরমধ্যে চা বাগানে গণহত্যা: ১৯৭১ এবং অনন্য মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি গ্রন্থ দুটি অনুবাদ হয়েছে। অনুবাদ করেছেন রবীন্দ্র গবেষক মিহিরকান্তি চৌধুরী। দেশ বরেণ্য গুণীজনেরা তাঁর কাজের প্রশংসা করেছেন। তাঁর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি ‘ গ্রন্থের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন প্রয়াত পরিবেশবিদ ও লেখক দ্বিজেন শর্মা। তার মতে গ্রন্থটিতেঅপূর্ব একাগ্রতা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়ে তরুণ প্রজন্মের কাছে পরিচিত করেছেন জগৎজ্যোতির মতো অগ্নিসন্তানের সাহসিক অগ্রযাত্রার কথা।

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ হায়াৎ মাহমুদ অপূর্ব শর্মারবহুল আলোচিতগ্রন্থ ‘সিলেটে যুদ্ধাপরাধ ও প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র’ গ্রন্থটিকে ‘অপরিশোধ্য’ঋণ বলে আখ্যা দিয়েছেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক ও অমর একুশের গানের রচয়িতা চিন্তাবিদ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী অপূর্ব শর্মাতে গবেষণা কাজের বিশেষ প্রশংসা করে বলেছেন, অপূর্ব শর্মা মুক্তিযুদ্ধ গবেষাণায় নুতন মাত্রা যুক্ত করেছেন। ২০১০ সালে ‘সিলেটে যুদ্ধাপরাধ ও প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র’ গ্রন্থের জন্য এইচএসবিসি কালি ও কলম তরুণ সাহিত্য পুরস্কার, ২০১৩ সালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সাংবাদিকতায় বজলুর রহমান স্মৃতিপদক লাভ করেছেন তিনি। সিলেট জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধ গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁকে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ওপ্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর গবেষণাকর্ম নিয়ে হয়েছে সেমিনার।

সম্প্রতি দিল্লী বাংলা একাডেমি ট্রাস্ট থেকে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক গবেষণা-জার্নাল‘ বীক্ষা’ গবেষণা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে গবেষণা-প্রবন্ধ অপূর্ব শর্মার ‘বীরাঙ্গনা কথা : মুক্তিযুদ্ধে নারীর অশ্রুত আখ্যান। অপূর্ব শর্মা বর্তমানে শুধুমাত্র সিলেট জেলায় নয় বর্তমানে বাংলাদেশে উত্তররাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় অপূর্ব মুক্তিযোদ্ধাদের অশ্রুত ইতিহাসে সন্ধানে তাঁর কর্ম সম্প্রসারিত করেছেন।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা প্রকাশনা ও বাংলার কৃষ্টির শুদ্ধ চর্চার বিবিধ অঙ্গনে শর্মার বিস্তৃত কর্মপরিধি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ লেখক পোর্টাল অতি সম্প্রতি যাত্রা শুরু করেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণায় আগ্রহীরা বিস্তারিত  তথ্য নির্দেশনা পাবেন (http://www.apurbasharma.com)

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের গবেষক শ্রদ্ধেয় অপূর্ব শর্মার ও ছান্দসিক সংগঠন ও মুনিরা পারভীনের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ছড়িয়ে দেবার এই অনবদ্য প্রয়াসের আলো ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বময়। আত্মত্যাগের আদর্শের বিনিময়ে কষ্টার্জিত আমাদের বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সমৃদ্ধ আমাদের কৃষ্টির মূল শেকড়কে দেশে ও প্রবাসের নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরবার দায়িত্ব আমাদের সবার। মহান মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা ও মহিয়সী মা বোনদের অনন্য আত্মত্যাগের ইতিহাসের প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে আমার লেখার ইতি টানছি।

ফারজানা নাজ শম্পা, হ্যালিফ্যাক্স প্রতিনিধি, CBN
https://www.facebook.com/cbn24.ca/
Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
CBN-Leaderate