ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা

2120
AdvertisementLeaderboard

নুরুল হুদা পলাশ

।। সাস্কাটুন, সাস্কাচুয়ান, কানাডা ।। 

সেই ভোর রাত থেকে জাল বেয়ে চলেছে খগেন, একটাও মাছের দেখা নাই। পুবের আকাশ লাল হয়ে গেছে, সূর্য উঠবে। নাহ, আর কত। শরীরটাও ভালো যাচ্ছেনা খগেনের কদিন হলো। সুরবালা বলেছিলো আজকে পানিতে না নামতে। সকালে ধরপর করে উঠেই খগেন জাল নিয়ে বেরিয়ে পড়তে চেয়েছিলো। কিন্তু সুরবালা তা করতে দেয়নি। কিছু না খেয়ে খগেনকে কখনোই সুরবালা বের হতে দেয়নি। আজকেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কাল নগেন এসেছিলো অনেকদিন পর। নগেন খগেনের ছোটভাই। বোয়ালিয়ার চর থাকে। সেই যে বছর পাঁচেক আগে ফুলজোর নদীতে ভাঙ্গন ধরলো, অনেকের বাড়ি রক্ষা হলেও নগেনের বাড়িটিকে টিকানো যায়নি। কার সাধ্যে নদীর সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকবে। খগেন চেয়েছিলো ওরই উঠোনে আরেকটা ঘর তুলে নগেন থাকুক। নগেন তা চায়নি। সদ্য বিবাহিত নগেন অনেক ভেবে চিনতে শেষে শশুর বাড়ি গিয়ে উঠেছে। আসলে আরতো কোনো উপায় ছিলোনা। তবে নগেনের শশুর খুব ভালো মানুষ। সুরোবালাদের আত্মীয় । সুরোবালাই অনেক বলে কয়ে দেবরের সাথে তার দূর সম্পর্কের মামাতো বোনের বিয়ে দিয়েছে। ইচ্ছে ছিল দুই বোন একসাথে থাকবে তা আর হয়নি। তবে বোয়ালিয়ার চর খুব একটা দূরে না। নৌকা পথে ঘন্টা দুই লাগে। ওই জেলে পারাটা অনেক বড়। এখনো অনেকে দিব্যি কষ্ট করে হলেও নিজেদের পেশাটাকে টিকিয়ে রেখেছে। এখানে অনেকের পক্ষেই সেটা সম্ভব হয়নি। সর্বনাশা ফুলজোর সব ভেঙে নিয়ে গেছে। নগেন আসার সময় চিড়া, মুড়ি, নারকেলের নাড়ু, মোটকা পিঠা আরো কত কি এনেছে। নগেনের বৌটা খুব ভালো। সরবালার সাথে গলায় গলায় মিল। দুই বোনে গল্প করতে বসলে আর কথা ফুরায় না। নগেনের শাশুড়ি সুরোবালাকে অনেক পছন্দ করেন। বছরে এক দুইবার এসব পাঠান। তবে পহেলা বৈশাখের আগে কিছু পাঠাতে তার কখনোই ভুল হয়না। সুরবালা ঘুম ঘুম চোখে খগেন কে দুইটা নারকেলের নাড়ু আর এক গ্লাস পানি দিয়েছিলো। তাই খেয়ে খগেন জাল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল। প্রায় দুই ঘন্টার ওপরে জাল টানার পরেও খগেনের জালে একটা মাছও জুটলোনা। আসলে নদীটাও ছোট হয়ে এসেছে। কবেযে নতুন পানি আসবে তখন হয়তো দুই একটা মাছ পাওয়া যাবে। নদীর অনেক অংশই শুকিয়ে গেছে। টুক টাক একটু আধটু পানি দেখে দেখে জাল ফেলছে খগেন।

মাছ না পেয়ে কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগতে শুরু করে খগেনের। জাল আর খালই রেখে আলো আধারিতে নদীর ধারে ঘাসের ওপরে বসে পরে খগেন। মাথাটা কেমন টন টন করতে থাকে। আজকে মুরাদপুরের মেলা। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে মুরাদপুরে মেলা হয়। খগেন প্রতিবছর মেলায় মাছ বিক্রি করে। মেলাতে বেশ চড়া দামে মাছ বিক্রি হয়। গ্রাহকেরা কোনো দরদাম করেইনা। সবাই কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে থাকে। যা দাম চায় তাই দিয়ে নিয়ে যায়। এবারই প্রথম খগেন কোনো মাছ ধরতে পারেনি মেলার দিনে। ঘরে তো কোনো জমানো টাকাও নাই। মাছের যা আকাল পড়েছে কয়েক মাস হলো, দিন এনে দিন খাওয়াই জটিল হয়ে পড়েছে। যতীন তিন দিন হলো বায়না ধরেছে এবারের মেলায় তাকে চশমা আর ঘড়ি কিনে দিতেই হবে। এবার তো শুধু যতীন কে দিলেই হবেনা। মেয়ের জন্যেও কিছু আনতে হবে। আর সুরবালা? সুরবালা কে সাদা সারি লাল পারে সুন্দর মানায়। কতদিন সুরবালা বছরের পয়লাদিন সাদা শাড়ি লাল পাড় পড়েনি। ইচ্ছে ছিল এবার একটা কিনে দেবে। তা আর হলো কই। নাহ খগেন আর ভাবতে পারছেনা। এবার উঠতে হবে। বেলা উঠে যাচ্ছে। আহা কি সুন্দর নির্মল আকাশ। আজকে পুবের আকাশে কোনো মেঘ নেই। কি শীতল ঝিরি ঝিরি বাতাস। এখন সুরবালা কে নিয়ে হাটতে বের হলে ভালোই হতো। স্বল্পভাষী খগেন নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে করে। সুরবালার মতো এমন লক্ষী মেয়েকে বৌ হিসেবে পেয়েছে। কোথাও বের হলে সারাক্ষন কথা বলতেই থাকে। খগেন ভাবে আচ্ছা সুরোবালাও যদি ওর মতো কম কথা বলতো তাহলে তো সব কিছুই বিরক্তিকর লাগতো।

খগেনের পৃথিবীটা খুবই ক্ষুদ্র। নিজের জীবনের বাইরে আরো তিনটে প্রাণী। এদের কাউকে ছাড়া খগেন কিছুই ভাবতে পারেনা। একটুওনা। আজকাল মাঝে মাঝে নিজেকে খুব ক্ষুদ্র মনে হয়। খগেন ভাবে বিধাতা কেন মানুষকে সব কিছু দিয়ে পাঠায়না। কেন এতো অভাব দিয়ে বিধাতা মানুষকে দুনিয়াতে পাঠায়। কিছুদিন আগেও খগেন স্বপ্ন দেখতো, সে অনেক বড় হবে। বাড়িটা আরো বড় আর সুন্দর করবে। উঠোন টা বাড়বে। সেই উঠোনে ছোট ছোট পা ফেলে যতীন ঘুরে বেড়াবে আর যতীনের পিছে দৌড়াতে দৌড়াতে সুরবালা ক্লান্ত হয়ে যাবে। খগেন কে বলবে, ও যতীনের বাপ, তুমি এ কেমন পোলা দিলাগো, তার সাথে তো পারিনা। তোমার বেটাক তুমি সামলাও। তা কখনো হয়নি। ক্ষুদ্র উঠোন।দুই পা দিলেই বাহির বাড়ি আবার দুই পা দিলেই ঘর। খগেনের শোবার ঘরের পিছনে এক চিলতে সরু জায়গা। ওখানেই কত যত্ন করে সুরবালা কত রকমের সবজি লাগায়। খগেন ইচ্ছে করেই কখনো ঘরের পিছনের সবজির বাগান দেখতে যায়না। খগেন জানতে চায়না সুরবালা আসলে ওখানে কি কি গাছ রেখেছে। কোন গাছে কোন সবজি ধরলো। জানতে চায়না এই জন্যে যে সুরবালা মাঝে মাঝে খগেনকে অবাক করে দিয়ে কি সব তরকারি প্লেটে উঠিয়ে দেয়। দিয়েই জিজ্ঞেস করে, ক্যা গ্যাদার বাপ কউ তো কিসের তরকারি, কিসের ঝোল ? খগেন জেনেও অভিনয় করে। এটা ওটা অন্যটা বলে। খগেন জানে এইযে সুরবালার ক্ষুদ্র আনন্দ এর কোনো মূল্য হয়না। এই আনন্দকে সে কোনোভাবেই নষ্ট করে দিত চায়না।

এসব ভাবতে ভাবতে খগেন কখন বাড়ির উঠোনে এসে পৌঁছেছে বুঝতেই পারেনি। জাল আর খালই রেখে মাটিতেই বসে পরে। সুরবালা হাত মুখ ধুয়ে উঠোন ঝাড়ু দিচ্ছিলো। খগেনের দিকে এগিয়ে আসে। কিগো যতীনের বাপ মাছ পাও নাই? আমি জানিতো তুমি আইজকা মাছ পাইবানা, হের্ জন্যেইতো না করছিলাম যাইতে।আমার কতাতো হুনোনা। কেন গেলা? আইচ্ছা অইছে, হাত মুখ দৌ। এহন এল্লা গুমাও। খগেন বিড়বিড় করে বলে গুম কি আর এতো সোজা। আমি কি আর এতো সুখে আছি যে হুলেই গুম আসপো। খগেনের উত্তর না পেয়ে সুরবালা এগিয়ে আসে। একদম খগেনের গা ঘেসে বসে। কিগো, মন খারাপ কইরা কি অইবো। কপালে না থাইকলে তুমি আর আমি কি করবার পারুম কও। এতো চিন্তা কইরোনা খগেনের বাপ। যাও এল্লা গুমাও।

খগেন কোনো কথা না বলে ঘরে ঢুকে পরে। বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখে যতীন আর হৈমবালা ঘুমুচ্ছে।হৈমবালা খগেনের মেয়ে। মাত্র এক বছর বয়স হলো। যতীনের বুকের ওপরে তাল পাতার পাখাটি। হয়তো সুরবালা বাতাস করতে করতে ছেলের বুকের ওপরেই রেখে গেছে। খগেন তালপাতার পাখাটি হাতে নেয়। এক নিমেষেই অনেক দূর অতীতে ফিরে যায়। কত আগের এই পাখাটি।খগেনের মায়ের হাতের বানানো। তখন খগেনের মা তালপাতার পাখা বানাতো মেলায় বিক্রি করার জন্যে। এখনো একটুও নষ্ট হয়নি পাখাটি। কত যত্ন করে মা পাখাটি বানিয়েছিল। পাখার চারিদিকে লাল, নীল আর সবুজ সুতা দিয়ে মোড়ানো। রঙিন সুতার ভাঁজে ভাঁজে পাখি, ফুল আর গাছের ছবি। সুরবালা শাশুড়ির হাতের জিনিসটাকে কত যত্ন করে রেখেছে। খুব মনে পরে। বৈশাখ মাসের দুপুরে গরমে গাছের ছায়ায় মায়ের কোলে মাথা রেখে নগেনের গায়ের সাথে গা লাগিয়ে খগেন শুয়ে পড়তো। মা তালপাতার পাখায় বাতাস করতো। কি শান্তি ছিল সেই বাতাসে। কখন যে ঘুমিয়ে পড়তো বুঝতোইনা। মায়ের হাতের পাখা নড়তেই থাকতো। প্রতিবার বৈশাখী মেলায় বাবা খগেন আর নগেনকে নিয়ে মেলায় যেত।একহাতে কাপড়ে মোড়ানো কয়েক ডজন তালপাতার পাখা। সেইসাথে নগেনকে বাবা কাঁধে নিতো আর খগেন বাবার অন্য হাতের দুইটা আঙ্গুল ধরে থাকতো। তারপর সোজা মেলায়। কোনোকোনোদিন দুইবার যাওয়া হতো। সকালে বাবা সারারাতের ধরা মাছ মেলায় নিয়ে বিক্রি করতেন। আবার দুপুরে ফিরে এসে মায়ের হাতের বানানো পাখা আর দুই ছেলেকে নিয়ে আবার মেলায় যেতেন। কতযে মজা ছিল। মেলার সুরেশ কাকার দোকানে বসে ধূলি মাখা রসগোল্লার কথা কি আর ভোলা যাবে।দুইজনকে দুইপাশে বসিয়ে বাবা সুরেশ কাকাকে বলতেন, দাদা খগেন আর নগেন কে রসগোল্লা দেন দেহি। খাওয়া শেষ হলে বাবা সংসারের খুঁটিনাটি কতকি কিনতেন। এরপর সারা গায়ে ধূলি মেখে বাড়ি ফিরতো সবাই।

দিনে দিনে কতকি বদলালো। খগেন বিয়ে করলো বাবা মা মারা গেলো। চারপাশের অনেক কিছুই চোখের সামনে বদলালো, কিন্তু খগেনের ভাগ্য বদলালোনা। খগেন ভাবে এইযে ভাগ্য না বদলানো এর জন্য তো সে কাওকেই দায়ী করতে পারেনা নিজেকে ছাড়া। আর নিজেরই বা কি করার ছিল। পড়া লেখাওতো করতে পারেনি বেশিদূর। সেইতো নাম সাক্ষর পর্যন্তই। আগে বাবাকে সবাই কার্তিক হালদার বলে ডাকতো। জেলে পাড়াতেও নাম ডাক ছিল। ফুলজোর নদীতে বছরে একবার সব জেলেরা মিলে মাছ ধরতো। তিন চারদিন ধরে সেই মাছ ধরা হতো। পুরো নদী জুড়ে জাল ফেলা হতো। কত বড়ো বড় মাছ। দূর দূরান্ত থেকে মাছের বেপারিরা আসতো। কয়েক গ্রামের মানুষ এসে সেই মাছ গুলো কিনে নিয়ে যেত। মাছের একটা ভাগ কয়েক গ্রামের গণ্য মান্য লোকজনকে দেয়া হতো। সবাই বলতো ইজারার ভাগ। যদিও খগেন এখনো বুঝেনা এই ইজারাটা আসলে কি। তার পরও অইকদিন পুরো জেলে পাড়ায় কি এক আনন্দ বিরাজ করতো। নদীতে আর সেভাবে মাছ ধরা হয়না। মাছই নাই, ধরবে কি। খগেন কে কেও আর হালদার বলে ডাকেনা শুধু একজন ছাড়া। পূর্বপাড়ার রমিজ মাস্টার। খগেনের এইযে নাম দস্তখত শেখা তাও ওই রমিজ মাস্টারের বদৌলতেই। রিটায়ার করেছে কবে কিন্তু এখনো দেখা হলেই বলে কিরে খগেন হালদার নিজেতো পড়ালেখা করলিনা, পোলাডারেও জাইল্যা বানাইসনা। খগেন মাথা নাড়ে। সত্যিই খগেন আর সুরবালা চায়না যতীন ওর বাপ্ দাদার পেশায় থাক। যদিও ভোটার লিস্টে তার নাম খগেন হালদার, কেও ডাকে খগেন, কেও খগেননা। সুরবালা অনেক মেধাবী ছিল বুঝা যায়।তাওতো ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছে। ইশ সৃষ্টিকর্তা কেনোযে এতো ভালো একটা মানুষকে খগেনের এই অভাবী জীবনের সাথে জড়িয়ে দিলো খগেন বুঝতে পারেনা। সুরবালার তো আরো ভালো বিয়ে হতে পারতো। ধ্যাৎকি সব সব ভাবছে খগেন।

ভাগ্য বদলানোর জন্যে খগেন আর সুরবালা যে চেষ্টা করেনি তা কিন্তু নয়। কিন্তু যতবারই চেষ্টা করেছে ওদের ভিতরে বহুদিনের লালিত বাপ্ দাদার পেশার প্রতি সন্মান আর ভালোবাসা এই জেলে পেশাকে ছেড়ে আসতে দেয়নি। সাহা পাড়ার ফটিক সাহা কতবার বলেছিলো জাল ফেলা ছেড়ে দিয়ে বাজারে গিয়ে তার দোকানে সাহায্য করতে। একবার গিয়েছেও। মন টেকেনি। মাছ ধরার নেশা তাকে আবার টেনে নিয়ে এসেছে। বাপ্ দাদার এই পেশাকে সে কোনোভাবেই হেলা ফেলা করতে পারেনি। সুরবালাও একবারও সায় দেয়নি মাছ ধরা ছেড়ে অন্য কিছু করতে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? জীবনের চেয়ে বড় আর কিছু কি আর আছে। হয়তো একদিন সব ছেড়ে ছুড়ে অন্য কোনো পেশায় নেমে যেতে হবে। পেটে ভাত না জুটলে আবেগ আর ঐতিহ্য রক্ষার বৃথা চেষ্টায় তো জীবন চলবেনা।

এরই মধ্যে সুরবালা ঘরে প্রবেশ করে। গ্যাদার বাপ তুমি এহনো মন খারাপ কইরা আছো? হোনো, একবার না ওয় মেলায় যাইবানা। কিছু অইবোনা। ওপরওয়ালা কি আমাগোরে কোনোদিন না খাওয়ায়ে রাখছে কও। তার ওপরে ভরসা রাহো। ব্যবস্থা একটা অইবোই। সুরবালা কিছুক্ষন চিন্তা করে বলে, আইচ্ছা গ্যাদার বাপ্ তুমি কেবা মানুষ কও দেহি। খগেন সুরবালার দিকে তাকায়। সুরবালা বলে, রইছ মোল্লার কাছ থাইকা টেহা গুনা আনবানা? আরে হে দিলে তো, খগেন বিরক্তি সহকারে উত্তর দেয়।টেহা চাইবাতো। যে দিন জোর কইরা অতো বড় মাছটা নিয়া গেলো আর দাম দেওনের নাম নাই। এল্লা যাওনা, বৎসরের পয়লা দিন, দিবারতো পারে। কতোগুনা টেহা। খগেন বলে, আর দিছে, হের্ মধ্যে তো তার মাও মইরা গ্যাছে। এহন কি টেহা চাওয়া ঠিক অইবো? কিজানি তোমার কতা আমি বুজিনা। তোমার টেহার দরকার, তুমি চাইবানা, সুরবালা বলে। খগেন চুপ করে থাকে। সুরবালা খগেনকে ডাকে। এই, আইসো পান্তা খাও।

হঠাৎ বাইরে কারো গলার আওয়াজ পাওয়া যায়। ক্যারে খগেন বাড়িত আছুৱে ? খগেন বলে, মনে ওয় মোল্লা সাবের গলা। আইছে মাছের খোঁজে। টেহা দেওনের নাম নাই, মাছ চায়। খগেন দ্রুত পায়ে বের হয়ে যায়। সুরবালা মনে করিয়ে দেয়। হুনো মোল্লা সাবের কাছে টেহা চাওনের কতা বুইলোনা। খগেন মাথা নাড়ে। রইছ মোল্লা টাকা দিতে এসেছে। কিরে খগেন কেবা আছুৱে ? বৎসরের পয়লা দিন, টেহা দিতে আইলাম। পকেট থেকে টাকা বের করে খগেনকে দেয়। অনাকাঙ্খিত এবং অপ্রত্যাশিত এই ঘটনায় খগেন একটু হকচকিয়ে যায়। কোনোভাবেই মেলাতে পারেনা। মোল্লা সাব এভাবে টাকা দেবে বুঝতে পারেনা। আস্তে হাত বাড়িয়ে টাকা নেয়। মোল্লা সাহেব কে বলে, এল্লা বইবেন্না? আহেন ভিতরে আহেন। বৎসরের পয়লাদিন এল্লা চিড়া মুড়ি মুহে দিয়া যান। মোল্লা সাহেব দ্রুত পায়ে যেতে থাকেন। নারে, বৎসরের পয়লাদিন। মেলা কাম। খগেন কিছু মনে করিসনা, টেহা সময় মতো দিবার পারি নাই। খগেন কৃতজ্ঞতা ভরে মোল্লাসাহেবের দিকে তাকায়। কোনো কথা বলতে পারেনা। খগেনের কাছে আজকে মোল্লা সাহেবকে প্রথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষ মনে হয়।

সুরবালা আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনেছে। খগেন ভিতরে ঢুকতেই খগেন এর হাত জড়িয়ে ধরে। কিগো গ্যাদার বাপ কি অইলো? কৈছিলামনা, চিন্তার কিছু নাই। সব কিছু হে দেহে বুঝছো? খগেন মাথা নারে। কি এক আনন্দে খগেনের মনটা ভরে উঠে। চোঁখ মুছতে মুছতে সদ্য ঘুম ভাঙা যতীন সামনে এসে দাঁড়ায়। বাবাকে জিজ্ঞেস করে, বাবা, মেলাত যামুনা? হ যামুরে বাপ্, খগেন যতীনকে জড়িয়ে ধরে। চারটি প্রাণীর এই ছোট্ট্র গৃহকোণ অভূতপূর্ব এক আনন্দে ভরে উঠে। সে আনন্দে ভেসে যেতে থাকে খগেন আর সুরবালা।

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email