টরন্টোয় বাংলাদেশি তরুণের অকাল মৃত্যু

AdvertisementCBN-Leaderate

এ যেনো ছবি নয়, একটা গল্প। জীবনের গল্প। ভালো করে তাকিয়ে দেখুন ওপরের ছবিটির দিকে। তিনটি মানুষ যেনো আপন মনে হাসছে আর কথা বলছে আমাদের সঙ্গে। মনে হচ্ছে আমাদের পরিবারের অনেক প্রিয় কেউ। আমার ভাই, অথবা বোন আর তাদের ফুটফুটে সন্তান। এ যেনো সুখি জীবনের এক অপরূপ প্রতিচ্ছবি। প্রিয়তমা স্ত্রী মৌরি আর মাত্র এক বছরে পা দেওয়া ছেলে অনীশকে পরম ভালোবাসা আর মমতায় আগলে রেখেছেন অমিত।

কিন্তু আচমকা এক ঝড় এসে যেনো লণ্ডভণ্ড করে দিলো এই সুখের স্বর্গকে। এমন ভালোবাসার বন্ধন ভেঙ্গে মৃত্যুদূত এসে কেড়ে নিলো অমিতকে।

প্রিয়তম স্বামীকে হারিয়ে এখন যেনো কষ্টে পাথর মৌরি। আর অনীশের তো বোঝার বয়সই হয়নি যে কী হারিয়েছে সে।

অমিতকে চিনতেন আরেক কানাডা প্রবাসী আরেফিন সামাদ খান। তার ভাষ্য, কয়েকদিন ধরেই অমিত বুকে একটু ব্যথা অনুভব করতো। ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্যথাটা বেড়ে গেলে অমিত টরন্টোর ইস্ট ইয়র্ক জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যায়। ঠিক হৃদপিণ্ডের পাশেই ব্যথা। রক্তচাপ মেপে দেখা গেলো ১১০-১৫০। কাজেই ভয়ের কিছু ব্যাপার আছে জেনে অমিতকে আগেভাগেই ভিতরে পাঠানো হলো। কিন্তু এটাতো মাত্র একটি ধাপ। যথারীতি অমিতকে ঘণ্টাখানেকের মতো বসতে হোল ডিউটি ডাক্তারকে দেখানোর জন্য। ডিউটি ডাক্তার করতে দিল ইসিজি। আবারো সেই ঘণ্টা খানেকের জন্য বসে থাকা। অবশেষে রিপোর্ট আসার পর ডাক্তার বললেন উচ্চ রক্তচাপ। হৃদপিণ্ডে কিছু অনিয়ম ধরা পড়লেও উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই বলে জানান ডাক্তার।

আরেফিন সামাদ খান জানান, অমিতের যেহেতু এর আগে তেমন শারীরিক সমস্যা হয়নি, তাই তার কোন ফ্যামিলি ডাক্তারও ছিলো না। ডিউটি ডাক্তারকে এটা বলার পর তিনি জরুরি বিভাগে পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেন। হাসপাতালে বেশিক্ষণ থাকতে ভালো না লাগায়, অমিত সেদিন চলে আসে বাসায়। পরদিন অমিতের একটু জ্বর আসে। কিন্তু আবার চলেও যায়। অমিত আর তার স্ত্রী মিলে জরুরি বিভাগে যাওয়ার জন্য মনস্থির করে। কিন্তু অমিতের পরদিন একটা পরীক্ষা ছিলো। পরীক্ষার আগের দিন ৪-৫ ঘন্টা জরুরি বিভাগে বসে থাকতে চায়নি সে। ঠিক করলো পরীক্ষা দিয়েই আবার জরুরি বিভাগে যাবে।

কীভাবে মারা গেলেন অমিত?

আরেফিন বলেন, গত পহেলা মার্চ বুধবার অন্যান্য দিনের মতই অমিত বাসাতেই ছিলো, পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। সন্ধ্যার পর নিজের ২০ তলার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ৫ তলার এক ছোট ভাই অর্ণবের অ্যাপার্টমেন্টে গল্প করতে আসে অমিত।

আরেফিনের ভাষ্য, ওরা দুজন বারান্দায় গল্প করছিল। হঠাৎ করেই অর্ণবের মনে হয় অমিত রেলিংয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে টলোমলো পায়ে। মনে হচ্ছে হয়তো পড়েই যাবে। গিয়ে ধরতে ধরতেই অমিত পড়ে যায় মাটিতে। মুখ থেকে ফ্যানা ওঠা শুরু করে। অর্ণব সাথে সাথেই কল করে ৯১১ এ। বুঝতে পারে নিঃশ্বাস ছোট হয়ে আসছে অমিতের। ৯১১ এ অপারেটর ক্রমাগত অর্ণবকে বলে যায় কীভাবে সিপিআর এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হবে। অর্ণবও যথাসাধ্য চেষ্টা চালায়। কিন্তু অর্ণব বুঝতে পারে নিঃসাড় হয়ে আসছে অমিত।

১৫ মিনিটের মধ্যে চলে আসে প্যারামেডিক-এর টিম। চেষ্টা চালায় সব দিয়ে। এরপর হাসপাতালে নিয়ে যায় অমিতকে। তখন বাজে রাত ১১টা। সব কিছু পরীক্ষা করে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে।কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ!

আরেফিন বলেন, ‘পৃথিবীর বুক থেকে জলজ্যান্ত সদা হাস্যোজ্জল একটা ছেলে চলে গেলো, এটা কিছুতেই কেনো জানি মানতে পারছি না।’

অমিতের ব্যক্তি জীবন সম্পর্কে আরেফিন বলেন, খুবই মেধাবী, বিচক্ষণ একটা ছেলে ছিলো অমিত। খেলাধুলা, পড়াশোনা সব কিছুতেই দাপিয়ে বেড়ানো একটা ছেলে। ২০০৮ সালে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পাশ করে বের হবার সাথে সাথেই চাকরি হয়ে যায় ইউনিলিভার বাংলাদেশে। নিজের যোগ্যতায় ক্রমাগত প্রমোশন পেয়ে ২০১৪ সালে ইউনিলিভার এর টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশন-এর ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব নেয় অমিত।

কর্পোরেটে সাবলীল ক্যারিয়ার থাকলেও অমিতের বরাবরই ইচ্ছা ছিলো নিজের স্বপ্নের বিষয় নিয়ে পড়ার। মেকানিক্যাল, রোবটিক্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিষয়গুলো ওকে খুব টানতো। ২০১৬ সালে বাংলাদেশের চাকরি ছেড়ে দিয়ে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে অভিবাসী হয়ে অমিত চলে আসে টরন্টোতে।

আসার পরই অমিত পেয়ে গেলো তার স্বপ্নের সাবজেক্ট মেকাট্রনিক্স, ভর্তি হল রায়ারসন ইউনিভার্সিটিতে। ভালোই চলছিলো সব, পড়াশোনা, বন্ধুদের সাথে খেলা, রাতের বেলা হুটহাট করে বন্ধুদের বাসায় হামলে পড়া, অনীশকে নিয়ে খেলা।

আরেফিন বলেন, অমিত খেলতে ভালবাসে, অমিত দৌড়াতে পছন্দ করে। মাঝে মাঝেই ট্র্যাক স্যুট পড়ে ৭-৮ কিলোমিটার দৌড়ে বন্ধুদের বাসায় চলে যায়। ধমক দিয়ে বন্ধুদের আসতে বলে “এম্নে বসে বসে থাকলে শরীরে মেদ জমে কবে যে হার্ট অ্যাটাক করবি, চল বেটা দৌড় দিয়ে আসি।” বন্ধুরা বের হয়, কিন্তু অমিতের সাথে পেরে ওঠে না।

কিন্তু সেই অমিতই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। অমিতের অকাল মৃত্যুতে টরন্টোর বাঙালিদের মাঝে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তার আত্মার মাগফিরাত এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন অনেকেই।

আজ রোববার স্কারবোরোর নাগেট মসজিদের প্রথম তলায় বাদ যোহর অমিতের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

 

আরেফিনের সাক্ষাৎকার এবং ছবিটি কানাডায় বাংলাদেশিদের ফেইসবুক গ্রুপ 'বিসিসিবি' থেকে নেওয়া।
Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
CBN-Leaderate