দূরদেশে পরবাসে

2796
AdvertisementLeaderboard

মুস্তাফা দুলারী

নিপুন শিল্পীর মত মনের মাধুরী দিয়ে রংতুলির আঁচড়ে আঁকা স্বপ্নের ডালি সাজিয়ে অভিবাসন ভিসা নিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের মোহনার উপকুলে উত্তর মেরুর সীমান্তে প্রচন্ড হিমবাহ ও তুষার রাজ্যের দেশ কানাডাতে স্থায়ীভাবে নোঙ্গর ফেলেছি কিছুদিন আগে। কানাডা ছিল আমার স্বাপ্নিক ও কাল্পনিক জগতের শুকতারা, সুখ ও স্বপ্নের দেশ। অনেক বছর ধরে যে দেশকে নিয়ে মনের হাজারো কল্পনা আল্পনা দিয়ে স্বপ্নের ছবি আঁকতাম, উড়োজাহাজে চড়ে, অযুত-নিযুত মাইল পাড়ি দিয়ে সাগর-সুমদ্র, পাহাড়-পর্বত, মেঘমালার উপর উড়ে, বাতাসে ভেসে ভেসে সুখের হিরক খুঁজতে দূরদেশ কানাডাতে এসেছি।

ভিনদেশ, ভিনভাষা, নতুন অপরিচিত জায়গা, সাদা-কালো মানুষ, হরেক রকমের বিচিত্র চেহারা, নানান কৃষ্টি-সংস্কৃতি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সুবিন্যস্ত রাস্তাঘাট, সুপরিকল্পিত আকাশচুম্বী অট্টালিকা দালান-ঘর, চিত্ত বিনোদনের সুব্যবস্থা, সুশৃংখল উন্নত নাগরিক জীবনব্যবস্থা, আইনের শাসন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যরাজী কানাডার এসব কিছুই আমাকে ভীষন মুগ্ধ করেছে। প্রতিদিন নতুন নতুন জায়গায় বেড়াতে গিয়েছি, অবাক হয়েছি সব কিছু দেখে। সবখানে ব্যস্ত জীবনের ধুমধামের মহড়া, সব জায়গায় স্থাপনাসমূহ আধুনিক শৈল্পিক কারুকার্যে চিত্রায়িত। চক্ষুদ্বয় জুড়িয়ে গেছে অবকাঠামোর কারুকার্য ও অভূতপূর্ব নকশা দেখে। যেখানে একবার গিয়েছি, সেই জায়গায় আবার কখনও গেলে চেনা জানা পরিচিত জায়গাটিও আবার নতুন ও অচেনা মনে হয়েছে।

দূরপাল্লার রেলগাড়ি ও বাসে চড়ে বিভিন্ন পার্ক, বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্রে ঘুরেছি। আঁখিযুগলকে দূরবীন বানিয়ে দেখেছি রাস্তার দু’পাশে সারি সারি গাছপালা, আকাশচুম্বী অট্টালিকা, সুউঁচ্চ ইমারত, বিশাল দালান-কোঠা, দৃষ্টিনন্দন সুন্দর সাজানো গোছানো দোকানপাট, ছোট-বড় পাহাড়, ঝর্ণা, শিলাময় পাথরের শক্ত মাটির ঢিঁবিসহ আরো কত কি! সব কিছু দেখে মনে হয়েছে, সৌখিন চিত্রশিল্পী যেন তার বানানো তৈল ও জল রঙের সব শিল্পকর্মের পশরা বানিয়ে সাজিয়ে রেখেছে। প্রানের সমস্ত আবেগ দিয়ে, মনের আয়নার সবটুকু অনুভূতি দিয়ে, চোখের দৃষ্টির সমগ্র পরিধি দিয়ে উপভোগ করেছি কানাডার সব নৈঃসর্গিক প্রাকৃতিক দৃশ্যমালার নান্দনিকতা। লেক অন্টারিওর নয়নাভিরাম দৃশ্যাবলী অবলোকন করে প্রশান্তিতে ভরে গেছে অশান্তিময় সমগ্র অন্তরাত্মা।

তবে দূরদেশ কানাডায় এসে আমি অনেকটা অসাড় যান্ত্রিক দানবের মত হয়ে গেছি। জীবন ও জীবিকার তাগিদে সারাদিন ব্যতি-ব্যস্ত থাকি রুজি রোজগারের অন্বেষণে। অবসর ও পেছনে তাকানোর ফুরসৎ নেই। লাগামহীন ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে অনিয়মতান্ত্রিক ছকে চলছে আমার প্রবাস জীবনের চাকা। একটু হেরফের হলেই দেখা দেয় নানান জট-জটিলতা ও বিপত্তি।  নিজ দেশে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পার্থিব জীবনে বর্ণাঢ্যতা ও বৈচিত্র্যতা সবই ছিল। তারপরও বিত্ত-বৈভব, বৈদেশিক চাকচিক্য আর প্রাচুর্য্যের প্রতি প্রচন্ড মোহ আমাকে পেয়ে বসে। অবশেষে পোটলা-পাটলা পেঁচিয়ে, বিবি বাঁচ্চা সঙ্গে নিয়ে ভিনদেশীয় অচেনা স্বপ্নের সুখ পাখিকে ধরতে কানাডায় আসি। এখন সেই পাখিকে ধরতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছি। হিমশিম খাচ্ছি ভীষণভাবে। সুখ পাখিটির আর নাগাল পাচ্ছি না।

প্রবাস জীবনে স্রোতের প্রতিকূলে বৈঠা বাইতে গিয়ে ভাটার জলে পড়েছি। লোহায় জং ধরার মত মরীচিকা ধরেছে অনুরাগ-অনুভূতির। আমার জন্য কোন অবসর সময় বরাদ্দ থাকে না। মননের নান্দনিক প্রয়োজনে বিনোদনের ফুরসৎ নেই। গরমিল আর গোঁজামিল দিয়ে চলছে বিদেশ-বিঁভূইয়ের যান্ত্রিক জীবন। একটি স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে আরো কয়েকটা স্বপ্ন আটকে যায়। মরিচা ধরে অন্যটায়।

স্বপ্নের দেশ কানাডায় বেসমেন্টে ছোট একটি কক্ষে আমার বসবাস। যে কক্ষের কোন জানালা নেই, দরজাও নেই। বাড়ীওয়ালার দরজা দিয়ে আমাকে আমার কক্ষে আসতে হয়। প্রকৃতির আলো বাতাস আমার কক্ষে ঢোকে না। যতক্ষন এই বেসমেন্টের ছোট কক্ষে অবস্থান করি, মনে হয় কুরুক্ষেত্রের অন্ধকারের গহ্ববরে, বন্দি শিবিরের এক অন্ধকার প্রকোষ্টে কয়েদি হয়ে রাজদণ্ড ভোগ করছি। মনে হয় আটকে গেছে আমার জামিনের ও উদ্বারের সব প্রচেষ্টাও। আমার দুর্বল দেহটা অসাড় ও অবচেতন হয়ে পড়ে থাকে বেসমেন্টের ছোট কক্ষের মেঝেতে। পা ভাঙ্গা আহত পাখির মত ডানা ঝাপটাতে থাকি, ছটফট করতে থাকি অনবরত। তখন রাজ্যের সমস্ত দুঃস্বপ্নের বিষাক্ত কীট-পতঙ্গগুলো আমাকে ঘিরে ধরে। দিশেহারা হয়ে আমি বুক চাপড়াতে থাকি আর গড়াগড়ি যাই বেসমেন্টের ছোট কক্ষের অমসৃণ কংক্রিট মেঝেতে।

একসাথে অনেক মানুষকে খুশী করার জন্য কানাডা প্রবাসী হয়েছি। ঘাত প্রতিঘাতের দুর্গম গিঁরিখাতের উঁচু সিঁড়ি বেয়ে, সুখপাখির শান্তির নীড় খুঁজে বেড়াচ্ছি। দেখছি, ভাগ্য দেবতার আঁখড়া দূরে, বহুদূরে। ভাগ্য দেবতার নাগাল পাইতে আমাকে হাজারো মাইল পাড়ি দিতে হবে। সুদীর্ঘ যাত্রা পথের প্রথম পর্বটাই যেন আমি অতিক্রম করতে পারছি না। পা ফসকে পিছলে পড়ে আঁছাড় খাচ্ছি। স্বদেশীয় শিক্ষা, মেধা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও কর্ম অভিজ্ঞতা কোন কাজে লাগছে না। সুখপাখির আবাসস্থল অনেক দূরে। যারপরনাই চেষ্টা করছি সুখ পাখি ধরার জন্য। ফাঁদও পেতেছি। কোন প্রচেষ্টাই আমার কাজে আসছে না। সব ফঁন্দিফিকির এলোমেলো এবড়োথেবড়ো হয়ে যাচ্ছে। সকলকে তাক লাগিয়ে দেবো বলে নিজ দেশ থেকে যে শিক্ষা সনদ, তাবিজ-তকমা ও পাণ্ডিত্যের বাহারী জ্ঞান সঙ্গে এনেছিলাম, সেই সব মন্ত্রতন্ত্রের গোপণ ফর্মুলা সব অকেজো হয়ে গেছে, ভেস্তে গেছে। আমার স্বকীয় যোগ্যতার হামকি-দামকিতে কোন কাজ হচ্ছে না।

প্রবাস জীবন আমার মনোজগতকে অস্থির করে তুলেছে। আশা নিরাশার মধ্যে বিস্তর ফারাক আমাকে প্রতিনিয়ত কুঁড়েকুঁড়ে খাচ্ছে। জাগতিক ব্যস্ততা, যান্ত্রিক কোলাহল আর মনের অভ্যন্তরে নানান অরাজকতা আমাকে অক্টোপাসের মত ঘিরে ধরেছে। আমার যখন এরকম ত্রাহি অবস্থা তখন দেখি, আমার প্রাণের ফুলে যেন খুশীর হাওয়া দুলছে। আমি উল্টা পথ ধরি। আমার মন যা চায় তাই করি। কাউকে থোড়াই কেয়ার করি। এখন আমি আর আগের মত নই। আমার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আমি আগের চেয়ে বহু গুণে সাহসী আত্মপ্রত্যয়ী। আমি নাচি আর গান গাই। কর্কশ গলায় উচ্চস্বরে গান ধরি। নতুন স্বপ্নে নব উদ্যমে নতুন অনুপ্রেরণায় মেতে উঠি। মনের অজান্তেই  নিজের  সুরে বাজে কালজয়ী আমার বিজয়ের গানঃ

তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবো রে,
জীবন কাটে যুদ্ধ করে,
প্রাণের মায়া সাঙ্গ করে,
জীবনের স্বাদ নাহি পাই।
বৈশাখের ঐ রূদ্র ঝড়ে,
আকাশ যখন ভেঙ্গে পড়ে,
ছেঁড়া পাল আরো ছিঁড়ে যায়
তবু তরী বাইতে হবে
খেঁয়া পাড়ে নিতে হবে,
যতই ঝড় উঠুক সাগরে।

আমার গলা ভেঙ্গে গানের সুর বেসমেন্টের ছোট কক্ষের দুর্ভেদ্য চারি দেয়ালের প্রাচীর ভেদ করে, গণ্ডি পেরিয়ে আকাশে বাতাসে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। আমি জ্বলে উঠি বজ্র হুংকারে আপন শক্তিতে।  আমার কন্ঠের লহরী বিউগল সুরে বাজতে থাকে আমারই কর্ণকুটিরে অনুপ্রেরণার চালিকা শক্তি হয়ে। সময় পেলেই আমি নজরুল, সুকান্ত, জীবনানন্দ পড়ি। বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবিদের কবিতার চরণগুলো আওড়াই। কবিতা আবৃত্তি করি জোরছে আমার ধাঁচে, একা একা নাচি আর গান গেয়ে বেড়াই বনে-বাদারে।

আমি এখন দৌড়াই আমার স্বপ্নের পেছনে আপন ভুবনে। আমি আবারও নতুন স্বপ্নের ঘুড্ডি বানাই, নতুন স্বপ্নের বীজ বুনি, নতুন চারা গাছ লাগাই। দুচোখ ভরে দেখি, আমার স্বপ্নের ঘুড্ডি উত্তর আমেরিকার আকাশ জুড়ে উড়ছে। উত্তর মেরুর গিরিখাতের স্বপ্ন চূড়ায় আমার বিজয় কেতন, আমার বিজয় খুঁটির পতাকা পত পত করে উড়ছে তো উড়ছেই। দেখছি, সুখ পাখিটা আমার পাতানো ফাঁদে আটকে ছটফট করছে। তারে পাবার আশে আমি হন্তা সেঁজে দিক বিদিক দৌড়াচ্ছি! তাকে যে আমি ধরতে পারছি না কিছুতেই!

লেখকঃ

মুস্তাফা দুলারী

ডিসেম্বর ৩০, ২০১৬
মিসিসাগা, টরন্টো থেকে ।

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email