ধর্মীয় উন্মাদনা এবং বর্তমান সমাজ

99
Advertisement

কাজী রাফি ||

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সম্মান জানানোর জন্য একবার ইরানে আমন্ত্রণ জানানো হলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন। তাঁকে সাদরে গ্রহণের জন্য তেহরান সর্বোচ্চ প্রস্তুতি সম্পন্ন করল। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানিয়ে গাড়িতে করে বহনের পথে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি আকর্ষিত হলো পথকে সাজাতে ব্যবহার করা ব্যানার এবং ফেস্টুনে। শত শত বর্ণিল ব্যানারে লেখাঃ

‘‘পারস্যের এই পবিত্র ভূমিতে শুয়ে আছেন এক মহান সাধক –কবি হাফিজ । সেই পুণ্যভূমিতে আজ একজন মহান কবিরপদধূলি পড়েছে। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার পদধূলিতে ইরান আজ গর্বিত। তাকে পেয়ে তেহরান আজ উচ্ছসিত!’’

শাহনামার শব্দভাণ্ডারে সমৃদ্ধ মহান পার্সিয়ান জাতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সম্মান জানিয়ে ধর্ম তো হারাননি! আগের দিনের ধার্মিক মানুষ, ঈশ্বরভক্ত দরবেশ এবং সব দার্শনিক এবং তাদের অনুসারীদের ভাবনায় ধর্মের বিষয়-আশয় অথবাএকই ধর্মের বিভিন্ন মতবাদের চেয়ে মহান স্রষ্টার ধারণা, জ্ঞান অন্বেষণ অথবা বন্দনাটুকুই ছিল বড়। সেজন্যই মানুষ যে ধর্মেরই হোক –মানুষ নিজেকে মহান এক স্রষ্টার সৃষ্টি ভেবে একাত্ম হতো। নিজেদের জীবনের তুচ্ছতা, অনিত্যতা আর অনিশ্চয়তার কারণে তারা স্রষ্টার কৃপা প্রার্থনা করে এক কাতারে ‘মানুষ’ পরিচয়কে তারা বড় করে দেখত। আগে স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী জ্ঞানীদের কাছে জীবনে (এবং বেহেস্তের) নিশ্চয়তার চেয়ে অনিশ্চয়তা, সুখের চেয়ে শান্তি অথবা মন খারাপের যোগসূত্র খোঁজার চেতনা ছিল। তাঁরা জ্ঞানী ছিলেন বলেই মতবাদের চেয়ে মানুষকে, উত্তরের চেয়ে প্রশ্নকে, নিশ্চয়তার চেয়ে জীবনের অনিত্যতাকে ভালোবাসতেন এবং বড় করে দেখতে জানতেন।

তাদের কাছে কে কোন ধর্মের তা বড় বিষয় ছিল না। সেজন্যই এই বাংলাতেও কয়েক যুগে আগে গেলেই আমরাদেখতে পাই যেখানেই জৈন-মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল সেখানেই পরবর্তীতে মানুষ হিন্দু মন্দির গড়েছে আর ঠিক তার আশপাশেই কোথাও ছিল মসজিদ। যে কোনো ধর্মেরই মানুষ স্রষ্টাকে পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে এই উপাসনালয়গুলোকে সম্মান এবং শ্রদ্ধা করত। কিন্তু যখনই স্রষ্টা/খোদা/ভগবান/ঈশ্বর বন্দনার চেয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব আর আধিপত্য বিস্তারে মানুষ মরিয়া হয়ে উঠেছে তখনই তারা স্রষ্টার মহান শক্তির উৎসের সাথে মানুষ আত্মিক যোগাযোগ হারিয়েছে – এবং তখনই ধর্ম আর ধর্মের মতবাদ তাদের কাছে বড় হয়ে উঠেছে।

এখন পরিস্থিতি এমন –একটা রাষ্ট্রে শুধুমাত্র একটামাত্র ধর্ম থাকলেও সেই ধর্মের ভিন্ন ভিন্ন মতবাদপুষ্টরা একে অন্যকে বিনাশের জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে। মুসলমানদের মধ্যে শিয়া-সুন্নীহ কোন্দল, অথবা মহানবীর জন্মদিন পালন অথনা পালন না করার মতবাদ, (ইত্যাদি) নিয়ে রণ-দামামা বাজার শঙ্কা অমূলক নয়। এই মতবাদ-যুদ্ধের কারণে তাদের কাছ থেকে ঈশ্বর তো পালিয়েছেনই – তাদের বধির আত্মা থেকে মহান স্রষ্টা সংবেদনশীলতাও কেড়ে নিয়েছেন। এখন প্রগতিশীল আর সাম্প্রদায়িক শব্দটাও লেপ্টে গেছে একে অন্যের সাথে। অথচ মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমি, মহাকবি হাফিজ অথবা ওমর খৈয়াম –তাদের আধ্যাত্মিক চেতনায়, সাধনায় ধর্মের চেয়ে স্রষ্টা/খোদা ছিলেন সংযুক্ত। কিন্তু তাদের জীবনের সকল ধ্যান-জ্ঞান আর সাধনা ছিল মানুষকেই ঘিরে। মহাত্মা লালনও ছিলেন সেই পথেরই পথিক,

‘মানুষ ভঁজলে সোনার মানুষ পাবে।’ -ঈশ্বরের সাথে নিজ আত্মাকে সংযুক্ত না করতে পারলে, তার সৃষ্টির রহস্যের গভীরে আত্মমগ্ন হতে না জানলে এমন কথা কেউ কি অনুভব করতে পারেন?

কিন্তু বর্তমান পৃথিবীতে অদ্ভুতভাবে স্রষ্টার বন্দনার চেয়ে ধর্মের গীত বড় হয়ে উঠেছে। ওমর খৈয়ামকে একবার পারস্যের এক গোঁড়া ধার্মিক ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন – ‘আমি একজন মানুষ।’ পরবর্তীতে ওমর খৈয়াম শুধু বিতাড়িত হননি। হয়েছেন নির্যাতিত, লাঞ্ছিত। তার ঘর-বাড়ি এবং সমস্ত বই আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

নিজের ধর্মকে অন্য সব ধর্মের চেয়ে বড় করে তুলতে গিয়ে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ বেড়েছে ভয়ংকরভাবে। কি আস্তিক, কি নাস্তিক সবার কাছে স্রষ্টা/আল্লাহ/ভগবান বা গড/ঈশ্বরের অস্তিত্বের জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রশ্নের চেয়ে ধর্ম, ধর্মীয় রাজনীতি, বিশ্ব রাজনীতির মাঠে ধর্মের অবস্থানগত উত্তর বা সমাধান নিয়ে সবাই যেন যুদ্ধের ময়দানে হাজির। ফলে দেবত্ব, ঐশ্বরিক জ্ঞান এবং কল্পনার সাথে মানুষের আত্মিক সংযোগ ক্রমশ শূণ্য হয়ে উঠেছে।

এখনকার ধর্মাচারিদের কাজটা যেন ঈশ্বরভক্তির চেয়ে ‘ধর্ম মঞ্চ’টাকেই চাঙা রাখা। এই মঞ্চটাকে চাঙা রাখার উপায় হিসেবে ঈশ্বরভক্তি অথবা সাধনা নয়, ধ্যান-জ্ঞান নয়, মানুষকে ভঁজন নয় –তাদের প্রয়োজন উত্তেজনার রসদ। সেই রসদ আহরন করছে তারা ধর্মকে ব্যবহার করে। অথচ ধর্ম হলো স্রষ্টার সৃষ্টিকে ভালোবাসার মাধ্যমে তাঁর কাছে নিভৃতে আত্মসমর্পন। এই সহজ কথাটা কেউ-ই যেন সহজে আর বুঝতে চাইছে না। এই ধর্মের ডঙ্কাধারীরা প্রকাশ্যে উত্তেজনা সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষকে বিভাজনের, ভিন্ন ধর্মালম্বীদের প্রতি ঘৃণা আর বিদ্বেষ ছড়ানোকেই মোক্ষ (ক্ষমতা লাভের পথ আর পন্থা হিসেবে জীবনের ব্রত বানিয়েছে। মানুষকে ভঁজে নয়, মতবাদকে ভঁজে এবং অন্য মতাবলম্বীদের ধ্বংসের মাধ্যমে তারা নিজেদের বিজয় নিয়ে ব্যতিব্যস্ত।

এভাবেই মহান স্রষ্টার সান্নিধ্য পাওয়ার মাধ্যমের চেয়ে ধর্মকে ক্ষমতা, আর্থ সমাগমের মাধ্যম এবং রাজনীতির খেলার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে সবাই মরিয়া হয়ে উঠেছে। বর্তমানকালের অধিকাংশ ধার্মিকদের কাছে স্রষ্টার চেয়ে তাই ধর্ম বড়। স্রষ্টার সৃষ্টির অবমাননা এমনকি তাদের জীবন বিনাশের চেয়ে ধর্ম অবমাননা এদের কাছে বিরাট সংকট।

স্রষ্টার চেয়ে তাই ধর্মকে তাদের বড্ড ভয়। ভিতরে স্রষ্টার যেহেতু অস্তিত্ব নাই সেজন্যই মিথ্যা, ঘুষ, অপরা্ধ, দুর্নীতি, ভণ্ডামি ভিতরে ভিতরে ভিতরে লুকিয়ে ধর্মের কলটাকে উপরে সজীব রেখে সমাজে দিব্যি সম্মানিত ব্যক্তি হওয়ার সুফল নিতে অনেকেই এখন লেবাসধারী। সাধারণ মানুষের কাছে স্রষ্টা অথবা ধর্মের এসব জটিল সমীকরণ স্পষ্ট নয়। তাদের চোখের সামনে ধর্মের আস্তিন আর পৈতাটুকুই বড়। মানুষের আত্মার খবর অথবা আত্মিক উন্মেষের মতো কঠিন বিষয় তাদের মাথা থেকে সযত্নে এই শ্রেণিই হটিয়ে দিয়েছে।

​ফলাফল? ফলাফলে এই উপমহাদেশে একই সাথে বাড়ছে ধনী এবং গরীবের সম্পদের পার্থক্য এবং পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোক দেখানোর প্রবণতা এবং ধর্মীয় অন্ধত্ব। এ সবই একে অন্যের সমানুপাতিক।

যারাই পাক্কা ঘুষখোর, চাঁদাবাজ আর দুর্বৃত্ত তাদেরকেই দিনশেষে দেখা যায় প্যাণ্ডেল বানিয়ে, অনুষ্ঠান করে মানুষকে সৎপথে আনার জন্য মরিয়া হতে। যত বেশি ভণ্ডামি তত বেশি লেবাস বদলের প্রচেষ্টা লক্ষ্যণীয়। নিজ সংস্কৃতির ‘স’ নিয়ে সামান্যতম ভালোবাসা এবং সংরক্ষণের মনোভাব নেই, নেই ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত হওয়ার মতো সামান্যতম সংবেদনশীলতা (কারণ তাদের আত্মা বধির), যা আছে তা হলো অন্য সংস্কৃতির বেশভূষা ধরে, মানুষের কাছে নতুন অবতার রূপে আবির্ভাব হওয়ার সংক্রামক রোগ। সংক্রমনের মতো এই উপ মহাদেশে এই ঝোঁকের রোগ বেড়েই চলছে। গরীবদের চোখে অচেনা এই অবতার তাদের সারাক্ষণ চমকে দিতে মরিয়া। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের ধর্মীয় উন্মেষ ঘটিয়ে তারা বস্তুত এই মানুষগুলোর চেতনাকে আরো পিছিয়ে দেয়।

মানুষের আত্মিক উন্মেষ হলে তো সমস্যা। সেজন্যই অঢেল কালো টাকার এই মানুষগুলো আজকাল গ্রামে-শহরে একটাও লাইব্রেরি গড়ে তোলে না, বিজ্ঞান চর্চার ক্লাব গড়ে না, বাচ্চাদের খেলাধুলার একটা মাঠও এদের কোটি কোটি টাকা হতে পয়দা হয় না। বরং এ দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে, শিল্প-সাহিত্য নিয়ে তাদের রয়েছে এক ধরণের বিবমিষা।

কোনো পার্ক নয়, বিজ্ঞান ক্লাব নয়, লাইব্রেরি নয় ব্যাঙের ছাতার মতো গ্রাম-শহর ভরে যাচ্ছে মসজিদ-হেফজুখানায়।

এই হাতভরে সম্পদ লুন্ঠনকারীরা গভীর অন্ধকারে রেখে যাচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মের একটা শ্রেণিকে যারা তাদের মৃত্যুর পর তাদের জন্য মোনাজাত, দোয়া-খায়ের করে আয় করার পাশাপাশি কে কত বড় বয়ানকারী/ওয়াজকারী হয়ে উঠতে পারে তার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়ার স্বপ্নে বিভোর।

ধর্ম ‘ভিক্ষা’ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করলেও সেজন্যই সমাজ এ থেকে মুক্ত হয় না। তখন ধর্মকে বরং কে কত দরে ছড়াতে (বিকাতে) পারে তার প্রতিযোগিতা চলে। ধর্মের দাওয়াত নামের ‘ভিক্ষাবৃত্তি’র ভয়ংকর বৈধতার নামে দেশ ভরে যায় ধর্ম ব্যবসায়ী দিয়ে।

বেশ্যাবৃত্তিকে ধর্ম চরম মানব অবমাননা বললেও সেই সমাজ ধর্মীয় আস্তিনের আড়ালে তাকেই লালন করে নিজেকে লুকাতে চায়। ভিতরে ভিতরে পচে গেলেও উপরে উপরে তারা দারুণ পরিপাটি, আপাদমস্তক পবিত্রতার আবরণ নিয়ে বড় ব্যস্ত।

আইনস্টাইন, রাদারফোর্ড, নিউটনসহ অনেক মণিষীর ধারণা ছিল তাদের আবিষ্কারের কারণে মানুষের চোখ খুলে যাবে এবং একশ বছরের মধ্যে ধর্মীয় মতবাদগুলো ক্ষীণ হয়ে আসবে এবং হয়তো তা বিলুপ্ত হয়ে গিয়ে এক মানবিক সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠা পাবে। কিন্তু এক শতাব্দীর পর হয়েছে ঠিক তার উলটা। ১৯৭০ –এর পর থেকে ধর্ম এক কিন্নরকণ্ঠী গায়িকা হয়ে প্রবেশ করেছে বিরাট এক নাট্যমঞ্চে। ( হায়! একজন রাষ্ট্রপতিও এখন, বিজ্ঞানের এত আবিস্কারের পরও গো-মূত্র খাদক। উপরে উপরে গরুকে এত ভক্তি করলেও হাজার হাজার মানুষকে ধর্মীয় হাঙ্গামায় গুজরাট হত্যার নেপথ্য নায়ক তিনি)।

বিশ্বের মানুষ (এবং রাষ্ট্রগুলো) যত দুর্বিনীত, ক্ষমতাধর আর দুর্নীতিবাজ হয়ে উঠছে – ততই মানুষকে অন্ধত্বের আফিম খাইয়ে ধর্মের আড়াল নিতে অভ্যস্ত করে তোলার মাধ্যমে ধর্মীয় উগ্রতা ও অন্ধত্বকে তারা স্পন্সরও করছে।

মানুষের মাঝে সম্পদের সমতা না এলে এখান থেকে আমাদের মুক্তি মিলবে বলে মনে হয় না।

কাজী রাফি, কথাশিল্পী

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email