পথিকৃৎ সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার (১৯৪৬-২০২১)

33
AdvertisementCBN-Leaderate

সৈকত রুশদী, টরন্টো থেকে ||

আন্তর্জাতিক খ্যতিসম্পন্ন পথিকৃৎ সাংবাদিক ও সংগঠক প্রিয় হাসান শাহরিয়ার ভাই আর নেই।

ভয়ংকর অতিমারী করোনা ভাইরাসের কালে ফুসফুসের সংক্রমণ তাঁকেও কেড়ে নিল নশ্বর পৃথিবী থেকে। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। তিনি চিরকুমার ছিলেন।

টরন্টোয় আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে খবরটি জানার পর থেকেই মনটা বেদনা ও শূন্যতায় আবিষ্ট হচ্ছে।

সেই ১৯৮০-র দশকের শুরুতে তাঁর সাথে আমার পরিচয়। জাতীয় প্রেস ক্লাবে। তখন তিনি দেশের সর্বাধিক প্রচারিত পত্রিকা ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এর বিশেষ সংবাদদাতা। ডাকসাইটে সাংবাদিক। ক্ষমতার শীর্ষ মহলের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগ। তখন আমি ‘দৈনিক দেশ’-এ তরুণ স্টাফ রিপোর্টার।

সেই থেকে বিগত চার দশকের বেশি সময় ধরে তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠতা এবং জাতীয় প্রেস ক্লাব ব্যবস্থাপনা সহ নানা ক্ষেত্রে একসাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা। নবীন সাংবাদিকদের কাছে তিনি ছিলেন এক আলোকবর্তিকা স্বরূপ।

অনেক স্মৃতি তাঁর সাথে। মন পড়ছে অনেক কথা। বিশেষ ভাবে মনে পড়ে, ঢাকায় দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা সংস্থা সার্ক-এর (SAARC) শীর্ষ সম্মেলন এবং সেগুনবাগিচায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং কালে তাঁর সরব উপস্থিতি এবং তীক্ষ্ণ ও শাণিত প্রশ্ন ও মন্তব্য।

দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির বিশ্লেষক হিসেবে তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতি, বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যমে দীর্ঘকাল কাজের অভিজ্ঞতা, বহু দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান সহ বিশ্বের খ্যাতনামা ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও সান্নিধ্য এবং সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠনের শীর্ষ পদের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন নিরহংকারী এবং সাংবাদিকসহ পরিচিত সকলের খুব কাছের মানুষ।

সাংবাদিকতায় নীতি ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দৃঢ় চিত্তের অধিকারী। সহকর্মী ও অনুজদের জন্য পথ প্রদর্শক। তাঁর সাহস ও পক্ষপাতহীন সাংবাদিকতা ছিল আমাদের জন্য প্রেরণাদায়ী। বিশেষ করে স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনকালে।

বাংলাদেশের এই গুণী সন্তান কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস এসোসিয়েশনের (Commonwealth Journalists Association) সম্মাননামূলক এমেরিটাস সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন আমৃত্যু। এর আগে তিনি এই সংগঠনের আন্তর্জাতিক সভাপতি ছিলেন দুই দফা। তার আগে এই সংগঠনের বাংলাদেশ শাখার সভাপতি ছিলেন তিনি।

তিনি বাংলাদেশের জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ছিলেন ১৯৯৩-১৯৯৪ সালে। আর বাংলাদেশে বিদেশী গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সংগঠন ওকাব (Overseas Correspondents’ Association of Bangladesh)-এর সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

তিনি দক্ষিণ এশীয় প্রেস ক্লাব এসোসিয়েশন-এর সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

অবিভক্ত বাংলা ও আসাম অঞ্চলের যশস্বী সাংবাদিক ও রাজনীতিক মকবুল হোসেন চৌধুরী’র কনিষ্ঠ পুত্র হাসান শাহরিয়ারের জন্ম সুনামগঞ্জে। ১৯৪৬ সালে। তাঁর জ্যেষ্ঠ ভাই হোসেন তৌফিক চৌধুরীও একজন সাংবাদিক, লেখক ও খ্যাতনামা আইনজীবী।

স্বাধীনতার আগে, ১৯৬০-এর দশকে, হাসান শাহরিয়ার পাকিস্তানে করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণ শেষে পাকিস্তানের সবচেয়ে নামী পত্রিকা ‘ডন’-এ রিপোর্টার হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন। একইসাথে তিনি ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এর করাচী প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। পাকিস্তানের ‘দ্য মর্নিং নিউজ’ ও ‘ইভনিং স্টার’ পত্রিকায়ও তিনি কাজ করেছেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ঢাকায় ফিরে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এ যথাক্রমে কূটনৈতিক সংবাদদাতা, বিশেষ সংবাদদাতা ও কার্যনির্বাহী সম্পাদক পদে কাজ করেন ২০০৮ সাল পর্যন্ত।

তিনি দীর্ঘকাল যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা সাময়িকী ‘নিউজউইক’-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে খ্যাতি অর্জন করেন। এছাড়া, সংযুক্ত আরব আমীরাতের ‘খালিজ টাইমস’, ভারতের ‘ডেকান হেরাল্ড’, ‘ইনডিয়ান এক্সপ্রেস’ ও ‘এশিয়ান এজ’ পত্রিকার বাংলাদেশ সংবাদদাতা ছিলেন।

তিনি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘দ্য ডেইলি সান’-এর প্রথম সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম ভিত্তিক ‘ডেইলি পিপল’স ভিউ’-এর প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট-এর অন্যতম প্রশিক্ষক হাসান শাহরিয়ার বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

নিরলস ও পরিশ্রমী হাসান শাহরিয়ার প্রণীত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, ‘অতীত, অতীত নয়’, ‘নিউজউইক-এ বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ, বিজয় এবং তারপর’ ও ‘শেষ ভালো যার সব ভালো তার’।

প্রার্থনা করি, আল্লাহ যেন মরহুম হাসান শাহরিয়ার ভাইয়ের রূহকে জান্নাতুল ফেরদৌসে চিরশান্তি প্রদান করেন।

তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবারের সকলের জন্য আমার গভীর সমবেদনা।

https://www.facebook.com/cbn24.ca
Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
CBN-Leaderate