প্রতিবন্ধীদের কেএফসি!

2115
AdvertisementLeaderboard
কলকাতার নিউ এম্পায়ার সিনেমা'র সাথে কেএফসি

সাইদুল ইসলাম

উইনিপেগ, কানাডা থেকে

এক দুপুরে ছোট মেয়ে বলল, বাবা কস্তুরিতে আর খাবোনা, অন্য কোথাও চল। আমাদের হোটেলের কাছের সবচেয়ে চালু রেস্টুরেন্টের নাম কস্তুরি। সকাল সাতটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত এখানে বাংলাদেশি বাঙালিদের ভিড় লেগে থাকে।

কলার মোচা ঘন্ট থেকে শুরু করে চিতল মাছের কোপ্তা পর্যন্ত সবই পাওয়া যায় সেখানে। মাঝে মধ্যে দুই একজন পরিচিত মানুষের সাথে দেখাও হয়ে যায়। পশ্চিম বাংলার বিশেষ করে কলকাতার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবদানও কিঞ্চিত স্পষ্ট হয়। আমি বললাম, অন্য কোথায়? প্রিন্সে খাবা?

– না প্রিন্স তো ওই একই খাবার।
– একই খাবার মানে! তুমি জানলা কী ভাবে? আমরা তো প্রিন্সে যাইনি-
– বাবা এটা তো মেইন রোডে, কস্তুরির জন্যে ডানে না গিয়ে তুমি যদি সোজা ফায়ার ব্রিগেডের দিকে যেতে থাকো, তোমার রাইট সাইডে পড়বে। আগেরবার সাবওয়েতে যাবার সময় ঢুকেছিলাম, তোমার মনে নেই।

কন্যার স্মৃতিশক্তি দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। মির্জা গালিব স্ট্রিটেই প্রিন্স রেস্তোরাঁ, কস্তুরির সাথে পাল্লা দেয়ার ইচ্ছে আছে, সাধ্য নেই। আশেপাশে আরও অনেকগুলি রেস্তোরাঁ আছে, খাবার জন্যে আমার পছন্দ ইসলামী ঈয়াদগার হোটেল। আমাদের হোটেলের সবচেয়ে কাছে এটি। বউ বাচ্চার দারুণ আপত্তি সেখানে বসতে। স্পেশাস নয়, ভেতরে একটু অন্ধকার সিঁড়ি ঘরের ভাব, রান্নাবান্নার অর্ধেক হয় হোটেলের সামনের ফুটপাথে। আমার ভালো লাগে, কারণ এই তল্লাটে একটি মাত্র হোটেল যেখানে গরুর গোস্ত রান্না হয় প্রকাশ্যে। আট টাকার যে শিক কাবাব পাওয়া যায়, তার স্বাদও তুলনাহীন, আমি খাবার কিনতে গেলে একটু খাতির টাতিরও করে। সেই হোটেলের নাম কন্ঠ ভোটেই বাতিল হয়ে গেল। বললাম, ঠিক আছে চলো দাওয়াতে যাই, ওখানে কাচ্চি বিরানী পাওয়া যায়। মার্কুইস স্ট্রিটে ঢুকে, কস্তুরিকে পশ্চিমে রেখে গজ বিশেক এগিয়ে গেলেই হবে।

লেখকের কলকাতা ভ্রমণ নিয়ে আরও পড়ুনঃ
পিয়ারলেস হাসপাতাল
পথের মানুষ
রঘূ দাসের ট্যাক্সি

দীপা বলল, তোমার এই সব এক্সপেরিমেন্ট রাখো তো, কস্তুরি চিনি, ওরা রাঁধেও ভালো, কস্তুরিতেই চলো। ছোট মেয়ের মুখ কালো হয়ে গেলো, বলল, ‘আমিতো আসলে সাবওয়েতে যেতে চাচ্ছি’। ওদের স্যান্ডুইচ ভালো না? আর তোমরা ভেজিটেবল খেতে বল, ওরা তো দেয় ফ্রেশ ভেজিটেবল।

আমার মেয়ের এই জ্ঞানটুকু হয়েছে সিঙ্গাপুরে। টাটকা সবজি আর নানানরকম সস দিয়ে বানানো সাবওয়ের স্যান্ডউইচ আমারও ভালো লেগেছিলো। তাই গতবার কলকাতায় সাবওয়ে পেয়ে মেয়েদের মত আমিও উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলাম। বললাম, ঠিক আছে চলো।

প্রিন্স রেস্তোরাঁ থেকে নিউমার্কেটের দিকে আরেকটু এগিয়ে গেলেই, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর দিল মাঙ্গে মোর, তার সাথে লাগোয়া। মিনিট দুয়েক হেঁটে সাবওয়েতে পৌঁছে শুনলাম ওদের এই আউটলেটটি বন্ধ হয়ে গেছে।

OLYMPUS DIGITAL CAMERA

নিউমার্কেটের পাশে

সাবওয়ের আরেকটি দোকান আছে মির্জা গালিব আর পার্ক স্ট্রিট যেখানে মিলেছে সেখানে, বেঙ্গল হূন্দাই এর শোরুমের কাছে। দীপা বলল, ‘উল্টো ঘুরে অতদূর যাবো না। তার চেয়ে নিউমার্কেটের দিকে যাওয়া ভালো। টাকা ভাঙ্গানোর দরকার ছিলো’। বললাম, ‘ওকে, আগে সোনাভাই এর দোকানে চলো টাকা বদলানো যাবে, আর ওনার কাছে আরেকটু জানা যাবে কাছে পিঠে কেএফসি-টি যদি থাকে।

মির্জাগালিব স্ট্রিট, সাদার স্ট্রিট, ডঃ ইসহাক আহমেদ রোডে অসংখ্য মানি এক্সচেঞ্জ আছে। আমি দু’এক  বার ঘুরে ফিরে দেখেছি, সোহাগের সোনাভাইয়ের রেটটা অন্যদের চেয়ে ভালো। এখন আর দর জিজ্ঞাসা করতেও ইচ্ছে করেনা। ডলার, বাংলাদেশি টাকা যা থাকে ওনার হাতে দিয়ে দি। বাংলা টাকার (বাংলাদেশি) ক্ষেত্রে হাজারি নোট নাহলে সোনাভাইও ভালো দাম দিতে পারেন না। হাজার টাকার নোটে ৭৮০ রুপি পাওয়া যায়। বাংলাদেশ থেকে কিনলেও তার চেয়ে কম পাওয়া যায়। ১০০ ডলারের নোট হলে সোনাভাই দেন ৬৩০০ রুপি। কম বেশিও হয়। সেটা নির্ভর করে ব্যাংক খোলা না বন্ধ তার ওপর।

সোনা ভাই বললেন, নিউমার্কেটেই যখুন যাচ্চেন, তো ওদিকে খেয়ে নেবেন। পিজা হাট, ডোমিনোজ পিজা আরও কী কী দোকান আছে, নিউমার্কেটের পাশে। জিজ্ঞেস করলাম, কোন পাশে দাদা?
– ওই যো নিউ এম্পায়ার সিনেমা হলটা আছেনা ওটার সাথেই।

এবার মনে পড়লো, নিউ মার্কেটের পশ্চিম সীমানা ঘেঁসে বার্টম্যান স্ট্রিট তার পশ্চিম ধারে হুমায়ন প্লেস, এখানেই নিউ এম্পায়ার সিনেমা। এই সিনেমা হলটির সম্পর্কে একটু আধটু শুনেছিলাম। ১৯৩২ সালে নির্মিত হয়েছিলো নিউ এম্পায়ার অডিটোরিয়াম। ইংরেজ আমলে, থিয়েটার ছাড়াও ব্যালে নাচ, নাটকের আসর সহ জমজমাটা সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান হত এখানে। ১৯৩২ সালে রবীন্দ্রনাথের পরিচালনায় ন’টির পূজা নাটকটি অভিনীত হয়েছিলো এখানে। এখন আর নাটকের আসর বসেনা। সিনেমা চলে সারা সপ্তাহ।

8

লেম্বু পানিঃ কলকাতার প্রাণ

নিউ মার্কেটের এই এলাকায় এলে আমার অন্য রকম লাগে। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় আমি যেন পুরনো কোন সিনেমার দৃশ্যে ঢুকে পড়েছি। প্রাচীন আমলের দালান কোঠার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। সরু রাস্তা, হকারদের হাকডাক, ফলওয়ালাদের ডাকাডাকি, ঝাল মুড়ি, ফুচকা (পানি পুরি), লেম্বু পানির প্রলোভন আমার হাঁটার গতি কমিয়ে দেয়। দীপারও সমান আগ্রহ এসব ব্যাপারে। মেয়ে দু’টির একেবারেই অপছন্দ এই ভীড় ভাট্টা, রাস্তার খাবার।

হুমায়ুন প্লেসে এবং তাঁর আশেপাশে কেএফসি, ডোমিনো’জ পিজাসহ বেশ কয়েকটা খাবারের দোকান আছে। মেয়েদের পছন্দে আমরা গেলাম নিউ এম্পায়ার সিনেমার নিচের কেএফসিতে। আমার সিনেমা দেখার ইচ্ছে হচ্ছিল, মারদাঙ্গা একটা হিন্দি সিনেমা চলছিলো তাই আর সহস করলাম না।

7

অগোছালো কেএফসি

কেএফসির এই আউটলেটের ২৯ টাকার বার্গার থেকে ১৯৯ টাকার রক বক্স পর্যন্ত পাওয়া যায়, ৭৯ টাকার ভেজি রাইস থেকে ১৭৫ টাকার চিকেন রাইস মিলও অনেকের পছন্দ হতে পারে। ২৯ টাকা থেকে ৪০ টাকার মধ্যে নানান রকম ক্রাশার পাওয়া যায়।

এই রেস্টুরেন্টে বেশ কয়েকজন বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী কাউন্টার ক্লার্ক দেখে অবাক হলাম। নিজেদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে তাদের কোন হীনমন্যতা আছে বলে মনে হলনা। দারুণ দক্ষতায় তাদের কাস্টমার সামলাতে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

একটা জিনিষ অবশ্য খুব ভালো লাগলো না। আমাদের দেশের কেএফসির মত ঝকঝকে তকতকে নয় এই আউটলেটটি। খাবারের শেষ দিকে আমার ছোট মেয়ে পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কিত হরেক রকম ত্রুটি খুঁজে বের করতে লাগল। বললাম আগে বলনি কেন? তার সোজা সাপ্টা উত্তর তখন তো ক্ষুধায় চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল।

লেখকের ইমেইলঃ smsaidulislam@yahoo.com
Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email