প্রবাসে জীবন সংগ্রাম (পর্বঃ উনিশ)

607
AdvertisementLeaderboard

 Dr. Syeda Malihatun Nessa

-গতকালের পর-

।উনিশ।

আমি নানান জায়গায় আপ্লাই করছি, এবার চাকরি হলো Edmonton এক কলেজে। এবার চাকরির কাহিনীগুলো আপাতত বন্ধ রেখে প্রবাসী জীবনের অন্যান্ন সমস্যায় যাওয়া যাক। এদেশে এসে আমাকে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যায় পড়তে হয়েছে সেটা হচ্ছে দুটো বাচ্চা যখন teenage এ পদার্পন করলো। ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের নিয়ে সমস্যাটা অনেক বেশি। শুরু হলো আমার ত্রিমুখী যুদ্ধ; একবার আমার মেয়ে তোতনের সঙ্গে, একবার আমার ছেলে চন্দনের সঙ্গে আর একবার মাহবুবের সঙ্গে।

এবার সত্যি গল্প দিয়ে শুরু করি। তোতন দেখি একদিন সকালে উঠে রেডি হচ্ছে; “বললাম, তোমার স্কুল তো ৮ টায়, এতো সকালে যাবে কেন? তোতন বললো, “একটা ছেলের সঙ্গে পড়বো।” আমি বললাম, “ঠিক আছে, আমি তোমার সঙ্গে যাবো, দেখি তুমি কার সঙ্গে পড় আর কোথায় পড়। ” তোতন বললো, “তোমার ইচ্ছা হলে যেতে পারো, তবে আমার সঙ্গে না। ” মনে মনে ঠিক করলাম কালকে খুব সকালে উঠে রেডি হয়ে বসে থাকবো, তোতন যখন বের হবে, ওর পিছনে পিছনে যাবো। আমাদের বাসা থেকে বাসস্ট্যান্ডে যাবার রাস্তা ছিলো দুটো, এটা ছিলো ত্রিভুজের মতো। ত্রিভুজের অতিভুজ বাহু দিয়ে গেলে শর্ট হয়, তবে শীতের দিনে বরফের মধ্যে হাঁটা বেশ কষ্টকর।

তোতনের উঠার শব্দ শোনা গেল, আমিতো আগেই রেডি হয়ে বসে আছি সিঁড়ির উপর, কোনভাবে তোতনকে মিস করা চলবে না। যখন তোতন বের হলো, আমিও বের হলাম, দেখলাম তোতন অতিভুজ রাস্তাটা ধরলো। আমি আমার যত ক্ষমতা আছে সব দিয়ে জোরে জোরে হেঁটে রাস্তা দিয়ে বাসস্ট্যান্ডে পোঁছাবার চেষ্টা করছি। তোতনকে দেখলাম সে তার লম্বা লম্বা পা ফেলে ইতিমধ্যে বাসস্ট্যান্ডে, দেখলাম বাস এলো, তোতন বাসে উঠলো, বাস ছেড়ে দিলো।

ইতিমধ্যে তোতনকে ফলো করার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছি। বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে ভাবছি কি করবো? কে যেন আমাকে বলল, “আরশাদ সাহেবের মেয়েকে হারলে চলবে না।” আমরা বাংলাদেশে সেন্ট্রাল গভঃ স্কুলে পড়তাম; বয়েস স্কুল আর গার্লস স্কুল পাশাপাশি। আমরা থাকতাম মতিঝিল কলোনীতে। আমরা কয়েকজন মেয়ে একসঙ্গে স্কুলে যেতাম-আসতাম। অনেক সময় দেখা যেত আব্বা প্রায় দশ ফুট পেছন থেকে ফলো করছেন। আমার মা অসুস্থ থাকার কারণে আমার আব্বাকে একাই এসব যুদ্ধ করতে হয়েছে। আর আমাকে অতি আধুনিক স্বামীর জন্য একাই যুদ্ধ করে যেতে হচ্ছে। ওর সাথে বাচ্চাদের ভীষণ বন্ধুত্ব। মাঝে মাঝে ভীষণ হিংসাও হচ্ছে।

আল্লাহ আমাকে ‘মা’ করে পৃথিবীতে পাঠালে কেন? পৃথিবীতে বাচ্চাদের জন্য সব চিন্তা মা এর। ছেলে ৩০ বছরের, মা তখনও বলে আমার বাচ্চা, শুধু বলে না মনে মনে ভাবেও।  ৩০ বছরের বাচ্চা একটু মোটা হয়ে গেলে, মা ভাবে হায় হায় আমার ছেলে মোটা হয়ে যাচ্ছে, আজকাল মেয়েরা তো মোটা ছেলে পছন্দ করে না। ছেলে ডিয়েটিং করে রোগা হয়ে যাচ্ছে, হায় হায় আমার ছেলেটার কোন অসুখ হয় নাই তো? এসব দুশ্চিন্তা কারো কাছে প্রকাশ করা যায় না, স্বামী বলে তোমার ‘চিন্তা করার অসুখ হয়েছে’, ছেলে-মেয়েরা ও বাপের সাথে গলা মিলিয়ে একই কথা বলে। ছেলে-মেয়ে-স্বামীর টেনশন হলে রাগ মায়ের উপর ঝেড়ে ওরা টেনশন রিলিফ করে। মায়েদের টেনশন রিলিফের কোন জায়গা নাই।

তোতনের বাস চলে গেল, আমি পরাজিত সৈনিকের মতো কিছুক্ষন বাসষ্টান্ডে দাঁড়িয়ে থাকলাম। বাসে চেপে সাবওয়েতে গেলাম, তোতনকে দেখতে পেলাম না। এই বরফের মধ্যে আর গোয়েন্দাগিরি করতে ইচ্ছা করলো না, বাসায় ফিরে এলাম। রাতে খাওয়ার টেবিলে তোতন বললো , “আব্বু আজ যে মজার কান্ড হয়েছে, আম্মু তো আজ গোয়েন্দাগিরি করতে গেয়েছিল। আমি আর থাসফিনা  ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি এমন সময় দেখলাম একটা পেংগুইন (বাংলাদেশের বঙ্গ বাজার থেকে কিনে আনা মোটা কোটগুলো পড়লে ওই রকম  মনে হতো ) গুট গুট করে আসছে, এমন সময় থাসফিনা বললো ‘ওটা তোর মা’। আমি সঙ্গে সঙ্গে  উল্টো দিকে ফিরে বসলাম যাতে আম্মু  দেখতে না পায়।”

আমি হাড়ে হাড়ে টের পেলাম আব্বার টেকনিক অচল হয়ে গেছে। আমরা আব্বাকে  যমের মতো ভয় পেতাম। যার ফলে জীবনে একটা প্রেমপত্র পযন্ত লেখার সাহস হয় নাই। এখন এই বয়সে মনে হয় মানুষের জীবনে এই মধুর অভিজ্ঞতারও দরকার আছে।

এবার তোতনের সাথে বন্ধুত্ব শুরু করলাম। আমি তোতনকে আমার অতীত জীবনের সব কথা বলতে শুরু করলাম আর তোতন তার বর্তমানের। ওই বয়সে, মেয়েদের কাউকে ভালো লাগলে তার কথা বলতে ভালো লাগে। তোতন কয়েক দিন ধরে একটা ছেলের কথা বলছে, বুঝলাম আমার তোতন প্রেমে পড়েছে। বললাম, ”ছেলেটাকে একদিন নিয়ে এসো”। ইতিমধ্যে মাহবুব খুব ভালো একটা চাকরি পেয়েছে, আমরা বাড়ি কিনেছি, বাচ্চারা একেকটা নিজস্ব রুম পেয়েছে।

…………………চলবে

Dr. Syeda Malihatun Nessa

লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক

প্রবাসে জীবন সংগ্রাম (পর্বঃ আঠারো) http://cbn24.ca/প্রবাসে-জীবন-সংগ্রাম-পর্-12/

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email