প্রবাসে জীবন সংগ্রাম (পর্ব: এগারো ও বারো)

620
AdvertisementLeaderboard

Dr. Syeda Malihatun Nessa

।এগারো।

টরন্টো শহরে Trevarton Drive এর বেসমেন্টে পুরনো সংসার আবার নতুন করে পাতা হলো। নতুন ভাই তাঁর গাড়ি করে আমাদের Trevarton Drive এ নামিয়ে দিলেন। উঁনি মাহবুবকে নিয়ে বিছানা কিনতে গেলেন। আমার ছেলে-মেয়ে আর আমি অপেক্ষা করছি কখন মাহবুব আসবে, আমাদের একসঙ্গে গৃহ প্রবেশ হবে। ইতোমধ্যে নতুন  ভাবী অফিস থেকে ফোন করে বললেন, ভাত-তরকারি সব রান্না করা আছে, আমি যেন আমার ছেলে-মেয়েদের খেতে দিই। আমরা আসার সময় বার্গার খেয়ে এসেছিলাম, ভাবীকে এ কথা বলতে গেছি। আমার ছেলে-মেয়েরা বলে উঠলো, “আম্মু থামো থামো, আম্মু ফোনটা একটু বন্ধ করো, aunty’কে বলো না আমরা খেয়ে এসেছি, আমরা  ভাত খেতে চাই”। ওদের ভাত খেতে দিলাম I ওরা ভাত খাচ্ছে, গভীর আগ্রহ নিয়ে, আমি তাকিয়ে তাকিয়ে ওদের খাওয়া দেখছি। মাঝে মাঝে তোতন ওর ছোট্ট হাত দিয়ে ভাত মুঠি করে আমাকে খাইয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশে আমার একটা কাজের মেয়ে ছিলো, সারা দিন কাজ করে সন্ধ্যার সময় ভাত তরকারি বাসায় নিয়ে যেত। আমি যদি বলতাম তুমি তো সারা দিন ভাত খেলেনা, মেয়েটা হেসে বলতো, ‘আপা বাচ্চাগুলো সারাদিন অপেক্ষা করে আছে, আমি ভাত নিয়ে গেলে আমরা সবাই মিলে খাবো।’ সেদিন কি আমি আমার অন্তরের ভেতর থেকে নাসিমা বুয়ার দুঃখ ও বাচ্চাদের খাওয়ানোর আনন্দ বুঝতে পেরেছিলাম? মানুষ যখন সেই অবস্থার মধ্যে না পড়ে তখন পর্যন্ত মানুষ সেটা অনুভব করতে পারে না। আব্বা একটা কবিতায় লিখেছেন,

“গরীবের ব্যাথা কত, প্রেম কতো সুগভীরI পরশ পাইনি তাহা কবিরও লেখনীরI”

সুকান্ত নিজে একসময় চরম কষ্টের মধ্যে ছিলেন বলেই লিখতে পেরেছিলেন, ‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটিI’ অনেক সময় মানুষের মনে গর্ব আসে তার ধন সম্পত্তি নিয়ে, ছেলে-মেয়ে নিয়েI যে কোন মুহূর্তে এটা চলে যেতে পারে। আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন দুঃখ-যন্ত্রণা দিয়ে তাঁকে খাঁটি মানুষ করে তোলেন। আমার আব্বা ছিলেন তার উদাহরণ। আল্লাহ তাঁকে রূপবান, সেই সঙ্গে প্রতিভাবান করে পৃথিবীতে পাঠিয়ে ছিলেনI প্রচন্ড ধাৰ্মিক ছিলেনI আমি কোনোদিন তাঁকে মিথ্যা কথা বলতে শুনি নাই। কিন্তু তিনি সারাজীবন কষ্টই করে গেলেনI আমার দৃঢ় বিশ্বাস আল্লাহ তাঁকে পরপারে শান্তি দিবেন।

 ।বারো।

মাহবুব তিনটা ফোমের বেড নিয়ে এলো; দুইটা সিঙ্গেল আর একটা ডাবল। বেসমেন্টে একটা ছোট রুম আর বিরাট একটা রুম। রুমের এক প্রান্তে চন্দন-তোতন এর বিছানা করা হলো। আর আরেক প্রান্তে রান্নার ব্যবস্থা। ঘরের মধ্যে ঘুটঘুটে অন্ধকার, লাইট না জ্বালালে নিজের হাতটা পর্যন্ত দেখা যায় না। কোন একজন কবি লিখেছিলেন,

‘যায় যায় দিন, বসে বসে দিন।

জানিনা এখন রাত কিনা দিনI’

যিনি এটা লিখেছিলেন, তিনি নিশ্চয় জীবনের কোন একটা পর্যায়ে বেসমেন্টে ছিলেন। মাহবুব আমাদের রেখে বাংলাদেশে চলে গেল, তিন মাস পরে আসবে। আমার ছেলে-মেয়েরা স্কুলে ভর্তি হলোI বেশ কিছুটা রাস্তা, হেঁটে যাতায়াত করতে হয়। এদেশে জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারী দুই মাস অসম্ভব বরফI এরই মধ্যে বাচ্চা দুটো হেঁটে হেঁটে স্কুল করে। অবশ্য এনিয়ে ওদের কোনো অভিযোগ নেই। মাহবুব নেই, আমাদেরই বাজার করতে হয়। আমরা তিন জনে এক সঙ্গে বাজার যাইI বাজার ও অনেক দূরে। একটা ট্রলি পর্যন্ত কিনি নাই। কাজেই হাতে করে ভারী ভারী ব্যাগগুলো আনতে হয়। বাবা অনুপস্থিত, চন্দন গার্জিয়ান হয়ে উঠলো। চন্দন বোন বা মা কাউকে ভারী জিনিষ টানতে দিবে না। দোকান থেকে বাক্স নিয়ে, তার মধ্যে মাল নিয়ে বলল, ‘এবার আমার মাথায় বক্সটা উঠিয়ে দাও’।আমি চন্দনকে বললাম, ‘তারচেয়ে ব্যাগে করে কিছু কিছু নিলে ভালো হতো না?’ চন্দন জেদী ছেলে, ও যেটা বলবে সেটাই করবে।

আমরা একবার চারজন ইন্ডিয়া গেছি। হাওড়া স্টেশনে নামলাম। কুলির মাথায় সব মাল তুলে দেওয়া হলো। কুলি মাল নিয়ে জোরে জোরে হাঁটছে, আমরা চারজন পিছু পিছু আসছি। চন্দন তখন ৫/৬ বছরের। চন্দন দৌঁড়ে গিয়ে কুলির জামাটা পেছন থেকে ধরলো, যাতে কুলি পালাতে না পারে। কুলির মাথায় মাল কাজেই তাকে দৌঁড়াতে হচ্ছে, আর চন্দনও দৌঁড়াচ্ছে কুলির জামা ধরে। পাছে চন্দন হারিয়ে যায় সেজন্য আমিও চন্দনের হাত ধরে দৌঁড়াচ্ছি। তোতন আব্বুর হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে। মাহবুব বার বার বলছে, “চন্দন, বাবা কুলির কষ্ট হচ্ছে ওকে ছেড়ে দাও, ও পালাবে না।”

আমি বললাম, “চন্দন ইন্ডিয়াতে কুলির পিছনে দৌঁড়ানোর কথা মনে আছে?” সেটা মনে করে তিনজনেই হাসতে লাগলাম।

তোতন বললো, “চন্দন তোমাকে পিছন থেকে ধরে রাখি? আমাদের খাবারগুলো নিয়ে পালিয়ে যেও নাI”  আবার আমরা তিনজনেই হাসতে লাগলাম।

কিছুদিনের মধ্যে আমার ছেলে স্কুলে খুবই নাম করলো। টিচার একদিন ক্লাসে এসে বললেন, “এতদিন আমরা বাংলাদেশ বলতে জানতাম একটা দরিদ্র দেশ, যে দেশে প্রতি বছর বন্যা হয় ইত্যাদি…  সে দেশে এতো ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা আছে আমার জানা ছিলো নাI” আমার ছেলে ক্রমেই টিচারদের ডান হাত হয়ে উঠছিলো, বিশেষ করে কম্পিউটারের ব্যাপারে।

তোতন আলাদা স্কুলে গেলI তোতন রোজ বাড়ি এসে ওর ক্লাস টিচারের বিরুদ্ধে নালিশ করতো। মনে হলো ওর টিচার কোন কারণে ওকে দেখতে পারছে না। parent-teacher মিটিংয়ে আমি গেলাম, ক্লাস টিচার ষাটের উপরে; ক্লাস টিচার এর সাথে কথা বলে তাঁকে একটু বদমেজাজি মনে হল। কথার এক পৰ্যায়ে জানালাম, আমি দেশে ইউনিভার্সিটির টিচার ছিলাম। এসব কথা সাধারণত আমি বলি না। মহিলা আমাকে যে তাচ্ছিলো ভাব  দেখাচ্ছেন, এটা না বলে আর উপায় ছিলো না। এবার উনার কথার মধ্যে একটু নরম সুর পেলাম। তোতনের নালিশ বন্ধ হলো। তোতন উদয়ন স্কুলে প্রথম পাঁচ জনের মধ্যে ছিলো, আমার ভয় টিচারের কারণে মেয়েটা যেন পড়াশোনায় খারাপ না হয়ে যায়।

…………………চলবে

Dr. Syeda Malihatun Nessa

লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক

প্রবাসে জীবন সংগ্রাম (পর্ব: নয় ও দশ) http://cbn24.ca/প্রবাসে-জীবন-সংগ্রাম-পর্-4/

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email