প্রবাসে জীবন সংগ্রাম (পর্বঃ সাত ও আট)

865
AdvertisementLeaderboard

Dr. Syeda Malihatun Nessa

-গতকালের পর-

 ।সাত।

‘ও’ বললো, ব্যাংকে চলো। ব্যাংকে যাওয়া এতো সোজা ব্যাপার না। ঝরঝর করে বরফ পড়ছে, তাপমাত্রা মাইনাস ৩০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। মাহবুবের সঙ্গে আছে তিনটে অলস বাঙালি। সিদ্ধান্ত হলো কাল যাওয়া হবে।

পরদিন সকাল সকাল ব্যাংকে পোঁছালাম। ব্যাংকের ম্যানেজার বললেন টাকা রাখতে গ্যারান্টর লাগবে। আমি বললাম,”আমরা তো টাকা রাখছি, টাকা তুললে না হয় এটা বলতে পারতে!” মাহবুব আবার একই কথা repeat করলো, মাহবুবের ধারনা ওরা আমার ইংলিশ বুঝতে পারে নাই। মনে পড়লো কানাডিয়ান ইমিগ্রেশনে ইন্টারভিউ দিতে গেছি, আমি ছিলাম প্রিন্সিপ্যাল ক্যান্ডিডেট। মহিলা আমাকে ইন্টারভিউ করছেন, সব উত্তর মাহবুবই দিচ্ছে। মহিলা মাহবুবকে দিলেন এক ধমক! বাংলাদেশী ছেলেরা মনে করে মেয়েরা কিছুই করতে পারবে না।

এই প্রসঙ্গে একটা সত্যি ঘটনা মনে পড়লো। আমি ঢাকার গাজীপুরে IUT’তে পার্ট টাইম চাকরি করি। এক মহিলা তার ৪/৫ টা ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে বাসে উঠলেন, দেখে নিম্নবিত্ত মনে হচ্ছে। বাস চলছে, ৮/১০ টা স্টপ পরে মহিলার স্বামী বাচ্চাদের নিয়ে নেমে গেলেন। মহিলা আর নামছেন না। বাসের সিটের তলায় কী যেন খুঁজছে। এবার স্বামী বাসে উঠে এলেন, বললেন, “তুমি বাস থেকে নামছো না কেন?” জানা গেল মহিলা তার স্যান্ডেল খুঁজে পাচ্ছে না। স্বামী বললেন, “আমি তো তোমার স্যান্ডেল নিয়ে আগেই নেমে গেছি।” মহিলা এবার খালি পায়ে স্বামীর পেছন পেছন বাস থাকে নামলেন।

কবি এজন্যই বলেছেন, “রেখেছো অবলা করে মানুষ করো নি।” আমার একজন সাদা সহকর্মী আমাকে জিজ্ঞাসা করে ছিলেন, “অনেকে বলে বাঙালি ছেলেরা যখন বউ নিয়ে হেঁটে কোথাও যায়, যদি স্বামীকে দেখতে পাও, জানবে বৌকে কয়েক মিনিট পরে দেখা যাবে।” মাহবুব একদিন এরকম আগে আগে হাঁটছিলো আমি অ্যাবাউট টার্ন করে বাড়ী ফিরে এলাম। মাহবুব অনেক খোঁজাখুঁজি করে আমাকে না পেয়ে পরে বাড়িতে ফোন করলো, আমি ফোন ধরলাম না। ভাবলাম এই অপরাধের জন্য একটু শাস্তি হওয়া দরকার!

আমার তখনো সুপারের মাসিক রোজকার কতো সে অঙ্ক শেষ হয় নাই।

মাহবুব খুবই চিন্তিত, বাচ্চারাও। মাহবুব বললো, “এখন কি হবে?” আমি তখন বললাম দরকার হলে পুরো বিল্ডিংটা কিনে ফেলবো (আমাদের সম্বল তখন তেরো হাজার ডলার)! চন্দন বললো, “আম্মু ঠাট্টা করো নাতো। সবসময় ঠাট্টা ভালো লাগে না।” আমি ঢাকায় যেভাবে বলতাম ঠিক সেভাবে। বাচ্চা মানুষ করার প্রথম থিওরিটা হচ্ছে, বাচ্চারা যা দেখে তাই শেখে, উপদেশ দিলে হবে না, নিজে করে দেখাতে হবে।

।আট।

মামী একটু কাচুমাচু করে ব্যাগ থাকে পাঁচ টাকার একটা নোট বার করে ম্যানেজারকে দিয়ে বললেন, “আমি শুনেছি টাকা-পয়সা না দিলে কোনো কাজ হয় না, বাবা আমি বিধবা মানুষ তোমাকে মাত্র পাঁচটা টাকা দিলাম, তুমি আমার কাজটা তাড়াতাড়ি করে দিও”। মামীর গল্প শুনে রাফায়েল ও প্রপা তো হেসে কুটি কুটি, দুজনেই এক সঙ্গে বলে উঠলো, তুমিও তোমার মামীর মতো সুপারকে ঘুষ দিবে? আমি বললাম, “বাবা তোমাদের এমন দেশে এনেছি, এখানে ঘুষ দেওয়া যায় না। দিলে আমাকে জেলে নিয়ে যাবে। তোমার নানাভাই জীবনে কোনদিন ঘুষ দেন নাই, মনে রেখো।” আমি বাচ্চাদের মুরুব্বিদের ভালো কথা গুলো বলি, যদি ওরা এর থেকে ভালো কিছু শেখে। বাচ্চাদের সঙ্গে মাঝে মাঝে দুষ্টুমিও করতে হয়। এতে ওদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো হয়। আব্বা বলতেন, বাচ্চারা যখন Teenage এ যাবে তখন থেকে ওদের সাথে বন্ধুর মতো ব্যবহার করবে। বাচ্চাদের Teenage সময়টা বড়ো কষ্টের। একবার তারা নিজেদের বড় মনে করে, আবার আরেকবার নিজেদের ছোট মনে করে। তাছাড়া তারা তাদের শারীরিক পরিবর্তন নিয়েও বড় চিন্তিত থাকে। এ সময় মা-বাবাদের উচিত বকাঝকা না করে, হাত ধরে দূর্গম রাস্তাটা পার করা।

…………………চলবে

(আগামীকাল পড়ুন নবম ও দশম পর্ব)

Dr. Syeda Malihatun Nessa

লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক

প্রবাসে জীবন সংগ্রাম (পর্বঃ পাঁচ ও ছয়) http://cbn24.ca/প্রবাসে-জীবন-সংগ্রাম-পর্-3/

 

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email