প্রিয় দাদা

2258
AdvertisementLeaderboard

মাসুদ রায়হান পলাশ এর লেখা চিঠি

প্রিয় দাদা,

তোমাদের এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ এবং তোমাদেরই রেখে যাওয়া বাংলার সংগ্রামী মানুষের পক্ষ থেকে লাল সবুজের বিজয়ী শুভেচ্ছা নিও। সাথে ভালোবাসা নিতে ভুলোনা। আশা করি বাংলাদেশের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায় তোমরা মুক্তিযোদ্ধারা নিজ পারে এবং পরপারে যে যেখানেই আছো ভালো আছো। তোমরা ভালো আছো ভেবে আমিও ভালো আছি।

পর সমাচার, আচ্ছা দাদারা আমাকে একটা কথা বলো তো, তোমরা কি দেশকে খুব ভালোবাসতে? দেশপ্রেমিকের বেশে সব সময় বাংলাদেশের মা, মাটি এবং বাংলার প্রকৃতিকে বুকে আগলে রাখতে চাইতে? তা না হলে কীভাবে সম্ভব এভাবে জীবন বাজি রেখে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া? আচ্ছা, তোমরা কি খুব সাহসী ছিলে? নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও কি ভাবে তোমরা রক্ত দিয়ে পুরো দেশটাকেই গোছল করিয়ে পাক পবিত্র করলে পাকিস্তানিদের হাত থেকে! ভাবতেই শিহরিত পরশে শরীরের লোমগুলো খাড়া হয়ে উঠে। যাক সে সব কথা, এসব নিয়ে অন্য সময় কথা বলা যাবে।

আচ্ছা তোমরা আমাকে চেন? আমার নাম জানো? আমি কি করি বা কি করতে চাই তোমাদের রেখে যাওয়া দেশের জন্য জানো তোমরা? ধুর, থাক এসব জানা শোনা। আমি কি এমন লোক যে, আমাকে তোমাদের চিনতেই হবে। আমি কিছুই না। তোমরাই উত্তম, জাতীর সূর্য সন্তান, লাল সবুজের জনক এবং আমাদের সকলের মধ্যমনি শহীদ কিংবা জীবিত মুক্তিযোদ্ধা! আর তাই এই বিজয়ের মাসে আমাকে নিয়ে কোনো কথা নয়, কথা হবে শুধুই তোমাদেরকে নিয়ে।

আচ্ছা, তোমাদেরকে ‘প্রিয় দাদা’ বলে সম্বোধন করেছি বলে রাগ করেছো? আরে শোনো নাহ্, রাগ করো না। আমার আব্বাজানের আব্বা, মানে আমার দাদা একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। শহীদ মনিরউদ্দীন মন্ডল। এই পৃথিবীতে আমি তাঁকে লালন করি, ধারণ করি এবং তাঁর আর্দশের কথাই রক্তে মেশায়! আর এই পৃথিবীতে আমি একটা বিষয় নিয়ে গর্ববোধ করি সেটা হলো, আমার দাদা একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা।

এই লাল সবুজের পতাকা উড়াতে যদি ত্রিশ লক্ষ শহীদের ত্রিশ লক্ষ ফোটা রক্ত লেগে থাকে তবে সেই ত্রিশ লক্ষ ফোটা রক্তের এক ফোটা রক্ত হলেও আমার রক্ত, আমার দাদার রক্ত! আমার রক্ত দিয়ে গড়ে উঠেছে জাতীয় পতাকা, পতাকার লাল অংশে আমারই রক্তের ঢেউ খেলা করে! এর থেকে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে বলো?

মুক্তিযোদ্ধাদের রেখে যাওয়া এই সোনার বাংলাকে আমি অনেক ভালোবাসি, আমিও দেশকে কিছু দিতে চাই দাদা। তোমারা একটা স্বাধীন দেশের জন্য কোনো কিছু না ভেবেই প্রাণ দিতে পারলে আর আমি তোমাদের রেখে যাওয়া দেশের জন্য কিছুই করতে পারবো না তা কি হয় বলো?

যাইহোক, যেহেতু আমার দাদা একজন মুক্তিযোদ্ধা তাই লিঙ্গের বিচার না করেই নারী-পুরুষ সকল মুক্তিযোদ্ধাদেরকে আমি দাদা বলে সম্বোধন করলাম! ভুল হলে ক্ষমা করে দিও। আচ্ছা দাদা, তোমরা কি জানো তোমাদের ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ আর এখানকার বাংলাদেশের মধ্যে কত পার্থক্য? কত কত উন্নতি, সম্বৃদ্ধি, শক্তি বা ক্ষমতা বেড়েছে তা শুনলে তোমরা হয়তো অবাকই হবে! কিন্তু একটা বিষয় খুব ভাবায় আমাকে আর তা হলো, তোমাদের রেখে যাওয়া পরবর্তী প্রজন্ম আজ মানবতাবোধ বা তোমাদের চিন্তা চেতনা হারাতে বসেছে! মুখে মুখে মুক্তিযুদ্ধের বুলি নিয়ে চিৎকার করলেও তাদের বাহিরের রূপ আলাদা!

তোমাদেরই হাত দিয়ে জন্মানো এই দেশের মানুষ আজ কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির রাজনীতি করে। জানো দাদা, ত্রিশ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধারা নাকি শহীদ হয়নি এমন প্রশ্নও তোলা হয় তোমাদেরই এই বাংলাদেশে! ছিঃ ছিঃ, লজ্জা আর ঘৃনায় আমার মাথা নত হয়ে আসে। একজন সেক্টর কমান্ডারের স্ত্রী এমন কথা মুখে তুলে কি করে?

স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরে এমন প্রশ্ন কতটা যৌক্তিক তা আমার বোধে আসে না। শুধু কি তাই, আরো কত যে কথা তা বলতে গেলেই ঘৃনা চলে আসে আমার। আজকাল রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য বিএনপির নেতারা বলে স্বাধীনতার ঘোষণাসহ সবই নাকি মেজর জিয়া করেছে! আবার একই সাথে আওয়ামী লীগের নেতারা বলে সবই শেখ মুজিব করেছে! এই কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির কোনো মানে হয় বলো দাদা? বঙ্গবন্ধু না থাকলে যেমন সোনার বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না, তেমনি জিয়াউর রহমানও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে করেছে অনেক কিছুই। দুজনেরই অবদান চরম মাত্রায় এই ভূখন্ডকে স্বাধীন করার জন্য। তাঁদেরকে নিয়ে রাজনৈতিক মাঠ গরম করার কী দরকার বলো? থাক এসব রাজনীতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির কথাবার্তা, বলতেও ভালো লাগেনা এসব।

কখনো কখনো আমার খুব মন খারাপ হলে বা খুব মন ভালো থাকলে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির পাশে যেয়ে বসে থাকি একা একা। জানো দাদা, বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার কথা হয় হৃদয়ে হৃদয়ে! আমি পুলকিত হয়, খারাপ মন ভালো হয়ে যায়। একই সাথে আবার জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে যেয়েও তাঁর সাথে দেখা করে আসি, কবর জিয়ারত করি।

আমাকে কেউ কেউ দো-আছড়া বলে গালি দেয়, আমি অবাক হই। তাদের ভাবখানা এমন যে, তুমি বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসলে জিয়াকে ভালোবাসতে পারবে না আর জিয়াকে ভালোবাসলে বঙ্গবন্ধুকে নয়! যে কোনো একদিকে তোমাকে যেতে হবে। এই জন্যই কি তোমরা সকলে মিলে বাংলাদেশের জন্ম দিলে দাদা? এর উত্তর আমি কার কাছে চাইবো? কি হতভাগা জাতি আমরা, শিকড় বাকড়ের খোঁজ রাখিনা।

দেশ যে কোন ট্রেনে চড়ছে তা বর্তমান সময়ে বোঝা মুশকিল। মারা-মারি, হানা-হানি আর কাটা-কাটিতে ভরপুর আমার সোনার বাংলা। তোমরাই তো এই দেশের জনক, তোমাদের রক্ত খেলা করে দেশ জুড়ে। তোমাদের রক্ত কি আরো একবার কথা বলতে পারে না এই দেশে শান্তির জগত তৈরি করতে?

আমি এমন বাংলাদেশ চাই না, আমি চাই এমন এক বাংলাদেশ যেখানে থাকবে শুধু অনাবিল সুখ আর শান্তি। যেখানে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে বারংবার, চাই রাজনীতির সুষ্ঠু ধারা। থাক রাজনীতির কথা, লিখতে লিখতে অনেক বড় করে ফেলেছি দাদা, একটু কষ্ট হলেও আমার আবেগের দাম দিতে চাইলে পুরোটা পড়ো। আমি খুশি হবো।

আর একটু লিখবো, এবার লিখবো শুধুই আমার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা দাদাকে উদ্দেশ্য করে। এই চিঠি যখন লিখছি তখন ২০শে ডিসেম্বর, আমার জন্মদিন। সারা দিন একা একা ঘুরেছি, একজন পরিচিত মানুষের সাথে দেখা করিনি। বাসায় ফিরে তোমাকে লিখতে বসেছি। শুভেচ্ছা না জানিও সমস্যা নাই, তবে আমার শরীরে থাকা তোমার রক্তকে কথা বলতে বলো!

আচ্ছা মনিরউদ্দীন মন্ডল তুমি কি জানো, তোমার একমাত্র সন্তান আর তোমার পরিবার কেমন আছে? কোনো দিন খোঁজ নিয়েছো তুমি? ১৯৭১ সালে যখন খান সেনারা তোমাকে বেওনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে গুলি করে মেরেছিলো তখন তোমার ছেলে মজনুর রহমানের বয়স মাত্র ৯ মাস। তার কিছু দিন পরেই তোমার ছেলের মা ডাইরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।

একজন শিশুর যদি মাত্র তিন বছর বয়সে তার রক্তের বলতে পৃথিবীতে আর কেউ না থাকে তাহলে তার অবস্থা কি হতে পারে এটা কল্পনা করতে পারো তুমি? তুমি চলে গেলে পৃথিবী ছেড়ে আর সব কিছু চলে যেতে শুরু করলো তোমার ছেলের জীবন থেকে।

তুমি যখন বেঁচে ছিলে তখন তোমার প্রায় দুইশত বিঘা জমি ছিলো মনে আছে তোমার? তোমার শিশু সন্তান কিছু বুঝে উঠার আগেই গ্রামের মানুষজন সব ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছে তোমার ধন সম্পত্তি, নিঃস্ব করেছে আমার আব্বাজানকে। আজও আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি তোমার সব সম্পত্তি মানুষজনে ভোগ দখল করছে!

তোমার ছেলে মজনুর রহমান মানুষের মতো মানুষ হতে পারেনি শুধু তার মাথার উপর ছাদ বলতে কিছু ছিলো না বলে। একটা সময় আব্বাজান একা একা রান্না করেছে, স্কুল কলেজে গেছে আবার মাঠ ঘাটও দেখাশোনা করেছে। জানো দাদা, তোমার ছেলেকে গ্রামের লোকজন বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলো তার একার কষ্ট দেখে। আমি জন্মগ্রহণ করার পরে আব্বাজান এসএসসি এইসএসসিসহ লেখা পড়া শেষ করে! এই পৃথিবীতে আমি আর আমার ছোট ভাই ছাড়া যে তাঁর এখনো রক্তের বলতে কেউ নেই!

থাক এসব, সব হারিয়েও আমি গর্বিত তোমার আত্ম ত্যাগের জন্য। তোমার চলে যাওয়া এবং একটা পরিবারের জীবন ধ্বঃস হয়ে যাওয়ার কাহিনী নিয়ে আমার কোনো অক্ষেপ নেই। আমার শুধু দুটি আক্ষেপ আছে। এক- এই বাংলাদেশের কারণে তোমার শত শত বিঘা জমি থাকার পরেও তোমার কবরটা তোমার ভিটাতে হতে দেয়নি পাকিস্তানিরা। দুই- তোমাকে আমি একটি বারের জন্যও চোখে দেখিনি জীবনে!

জানো দাদা, আমার খুব ইচ্ছে করে অন্তত স্বপ্নে হলেও তোমাকে একটি বার দেখতে। আমি যখন ঢাকা থেকে বাড়িতে যাই তখন প্রতিদিন তোমার কবরের পাশে যেয়ে একা একা দাঁড়িয়ে থাকি। কবর জিয়ারত করি।

এবার ঢাকা থেকে বাড়িতে যেয়ে আমি তোমার কবরটা অন্যের জমি থেকে সরিয়ে তোমার ভিটাতে নিয়ে যেতে চাই দাদা! তাতে আমার পাপ হলেও আমি সেটা করতে চাই। জানো দাদা, আমার কানে একটা দেশের গান বাজলেই তোমার কথা মনে পড়ে, দেশ ভালো নেই কিংবা ভালো আছে চিন্তা করলেও তোমার কথা মনে পড়ে, কেউ দেশ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করলেও তোমার কথা মনে পড়ে, জাতীয় পতাকায় চোখে পড়লেই তোমার কথা মনে পড়ে। এক কথায় প্রতিটা সময়েই যেন আমি তোমাতেই বুধ হয়ে থাকি।

কিছু দিন আগে আমার মা আমাকে প্রশ্ন করেছিলো আমি কাকে বেশি ভালোবাসি? আমি একটুও না ভেবে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়েই বলেছিলাম, আমি এই পৃথিবীতে সব চাইতে বেশি ভালোবাসি আমার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা দাদাকে। যাকে আমি কোনোদিনও দেখিনি, যে আমাকে কোনো দিনও আদর করেনি এমনকি যে আমার নামটা পর্যন্ত জানে না আমি সেই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা দাদাকেই বেশি ভালোবাসি! আর দ্বিতীয় ভালোবাসা হলো আমার দাদার হাতে জন্ম গ্রহণ করা বাংলাদেশ! জানো দাদা, আমার মা একথা শোনার পরেই বেশ অবাক হয়েছিলো। আমার মায়ের চোখে তখন আক্ষেপ ছিলো, আমি কেন আব্বাজান অথবা মাকে বেশি ভালোবাসি না? এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই, আমি এর কোনো জবাব দিতে পারিনি মাকে।

ও দাদা তুমি জানো, আমি কেনো তোমাকে আর তোমার দেশকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি? জানলে উত্তর দিও আকাশের ঠিকানায়, আমি নীল আকাশে চোখ মেলে দেখে নেবো! আর লিখতে পারছি না দাদা, চোখ ঝাপসা হয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে!

তুমি যেখানেই থেকো ভালো থেকো। আমিও তোমার প্রত্যয়ে বিশ্বাসী আর দেশ এবং দশের জন্য কিছু করতে চাই বলে মানবিকতার চর্চা করার চেষ্টা করি, পাশাপাশি সাংবাদিকতা করি। আমার জন্য দোয়া করো আমার প্রাণের দাদা। এই দেশ যাতে ভালো থাকে, এই দেশের মানুষ যাতে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারে তার জন্যও দোয়া করতে ভুলো না কিন্তু!

অনেক আনেক ভালোবাসি তোমাকে দাদা। আজ রাখছি, কথা হবে বাংলার আকাশে-বাতাসে, পথ প্রন্তরে আর সংগ্রামী সৈনিকের বেশে!

ইতি,

তোমাদের নাম না জানা

এক দাদা!

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email