বিমানের ঢাকা-টরন্টো ফ্লাইট সফল করতে যা করা প্রয়োজন

49
নিরঞ্জন রায়
AdvertisementLeaderboard

নিরঞ্জন রায়, টরন্টো থেকে ||

বাংলাদেশ বিমানের বহু কাঙ্ক্ষিত ঢাকা-টরন্টো সরাসরি ফ্লাইট চালুর বিষয়ে বেশ ভালো অগ্রগতি হয়েছে এবং এই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ বিমান গত ২৬ মার্চ পরীক্ষামূলক ঢাকা-টরন্টো সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনাও করেছে। তবে এই সফল পরীক্ষামূলক ফ্লাইট পরিচালনার পর কিছু বিষয় যেভাবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তাতে অনেকেই ভাবছেন যে হয়তো শেষ পর্যন্ত বিমানের ঢাকা-টরন্টো সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার উদ্যোগ সফল না-ও হতে পারে। বাংলাদেশ বিমান বিষয়টি নিয়ে যত দূর এগিয়েছে, তাতে এসংক্রান্ত কিছু বিষয় বিবেচনায় নিয়ে অগ্রসর হতে পারলে তাদের এই উদ্যোগ সফল হতে বাধ্য। কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশিরা দীর্ঘদিন ধরেই সরাসরি ফ্লাইটের দাবি জানিয়ে আসছিল।

কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা-টরন্টো বিমানের সরাসরি ফ্লাইট চালানোর ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়ায় এখানকার প্রবাসীদের মধ্যে এ ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহের সৃষ্টি হয়। বিমানের ঢাকা-টরন্টো ফ্লাইট চালু হলে তাদের সেই আশা পূরণ হবে এবং দেশে যাওয়ার পথ সহজ হবে। সরাসরি ফ্লাইট না থাকার কারণে বাংলাদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে আছে অনেক ঝামেলা ও বিড়ম্বনা। এমনিতেই দূরত্বের কারণে ঢাকা-টরন্টো দীর্ঘ যাত্রাপথ অর্থাৎ প্রায় ১৯ ঘণ্টা প্লেনে বসে থাকতে হয়। সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় ট্রানজিটে চলে যায় দীর্ঘ সময়। এ কারণে প্রতিবার দেশে যাওয়া-আসায় যাত্রাপথেই চলে যায় চার দিন। এটি একদিকে যেমন ভয়ানক বিরক্তিকর, অন্যদিকে তেমনি দেশে অবস্থান করার সময়ও বেশ কমে যায়। তা ছাড়া অনেক সময় বয়স্ক মা-বাবা একা যাতায়াত করেন। অনেক সময় মহিলা এবং ছেলে-মেয়েরা একা দেশে যাতায়াত করে। এসব ক্ষেত্রে নিজ দেশের ফ্লাইট, বিশেষ করে সরাসরি ফ্লাইট থাকলে অনেক সুবিধা এবং আরামদায়ক হয়। এসব কারণে ঢাকা-টরন্টো বিমানের সরাসরি ফ্লাইট চালু করা সময়ের দাবি।

এখানে একটি বিষয়ে সবার পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন যে সরাসরি ফ্লাইট এবং বিরতিহীন ফ্লাইটের মধ্যে একটু পার্থক্য আছে। সরাসরি ফ্লাইট টরন্টো থেকে ঢাকায় গিয়ে পৌঁছবে। মাঝপথে প্রয়োজনে, বিশেষ করে জ্বালানি সংগ্রহসহ নানা কারণে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি হতেই পারে, তবে সেখানে কোনো যাত্রী ওঠানামা করবে না। অর্থাৎ সরাসরি ফ্লাইটে যাত্রীদের এয়ারক্রাফট পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না। আর বিরতিহীন ফ্লাইট টরন্টো থেকে উড়াল দেওয়ার পর সোজা ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করবে এবং মাঝে প্রয়োজনে জরুরি অবতরণ ছাড়া কোনো যাত্রাবিরতি করবে না। ঢাকা-টরন্টোর যে দূরত্ব তাতে কোনো অবস্থায়ই বিরতিহীন ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। তারা যদি ঢাকা-টরন্টো সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারে, তাহলেই এই উদ্যোগ যথেষ্ট সফল এবং লাভজনক হবে। তবে সরাসরি ফ্লাইট চালু হলেও এই বিমানযাত্রা আরামদায়ক এবং আকর্ষণীয় করতে প্রথম থেকেই কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে এই সুন্দর উদ্যোগ ব্যর্থ হতে পারে।

প্রথমেই বিমানভাড়ার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে বাংলাদেশ বিমানকে প্রতিযোগিতা করতে হবে আমিরাত, টার্কিশ ও কাতার এয়ারওয়েজের মতো নামকরা সব এয়ারলাইনসের সঙ্গে। তাই তাদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে। এটি খুবই স্বাভাবিক যে সরাসরি ফ্লাইটের ভাড়া সব সময়ই বেশি হয়। যে ফ্লাইটের ট্রানজিট যত কম, তার ভাড়াও তত বেশি। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ বিমানের ঢাকা-টরন্টো সরাসরি ফ্লাইটের ভাড়া বেশি হতেই পারে। কিন্তু সেই বেশির পরিমাণটা যাতে অতিরিক্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আরামদায়ক ভ্রমণ বা দেশের বিমানে ভ্রমণের আবেগ যতই থাকুক না কেন, দিন শেষে অর্থের বিষয়টিই সবার আগে বিবেচনা করা হয়। এ কারণেই ঢাকা-টরন্টো সরাসরি ফ্লাইটের ভাড়া যেন প্রতিযোগী এয়ারলাইনসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা হয়।

সপ্তাহে যদি একটি ফ্লাইট চালানো হয়, তাহলে এই ফ্লাইট সফল করা কষ্টকর হবে। কেননা অনেকেই এক সপ্তাহ অপেক্ষা করে থাকবে না শুধু নিজের দেশের ফ্লাইটে ট্রাভেল করার জন্য। কমপক্ষে সপ্তাহে দুই দিন ফ্লাইট চালানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি টরন্টো ও নিউ ইয়র্ক মিলে দুই দিন করে সপ্তাহে মোট চার দিন ফ্লাইট পরিচালনা করা যায়। অর্থাৎ দুই দিন ঢাকা-নিউ ইয়র্ক এবং দুই দিন ঢাকা-টরন্টো ফ্লাইট চলবে, কিন্তু ঢাকা-টরন্টো ফ্লাইট নিউ ইয়র্ক হয়ে যাবে এবং ঢাকা-নিউ ইয়র্ক ফ্লাইট টরন্টো হয়ে যাবে এবং উভয় শহর থেকেই নির্দিষ্ট সংখ্যক প্যাসেঞ্জার নেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এতে দুই শহরের মানুষই সপ্তাহে চার দিন বাংলাদেশ বিমানে সরাসরি দেশে যাওয়ার সুযোগ পাবে। সেই সঙ্গে বিমানের ফ্লাইটের যাত্রীর কোনো সংকট কখনোই হবে না। আমি এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ নই, তাই এ ধরনের ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো কৌশলগত বা টেকনিক্যাল সীমাবদ্ধতা আছে কি না তা নিশ্চিত করে বলতে পারব না। যদি সেই ধরনের কিছু না থাকে এবং যেহেতু টরন্টো ও নিউ ইয়র্ক খুব কাছাকাছি দুটি শহর, তাই এই দুই শহরকে সংযুক্ত করে সপ্তাহে চার দিন ফ্লাইট চালাতে পারলে শতভাগ সফলতা পাওয়া যাবে। ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি না বাড়িয়ে সফলতা লাভ করা খুবই কষ্টকর। আগে এমিরেটস সপ্তাহে তিন দিন ফ্লাইট পরিচালনা করত এবং তখন তারা এতটা জনপ্রিয় ছিল না। এমিরেটস তাদের টরন্টোর ফ্লাইট সংখ্যা বাড়িয়ে সপ্তাহে পাঁচ দিন পরিচালনা করছে বিধায় এখন টরন্টো থেকে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে জনপ্রিয়।

স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, বিমান ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে যাত্রাবিরতির মাধ্যমে সেখান থেকে যাত্রী পরিবহনের সুযোগ রেখে এই ফ্লাইট পরিচালনার কথা ভাবছে। এটি হবে বিমানের একটি ভুল সিদ্ধান্ত এবং কোনো অবস্থায়ই এই উদ্যোগ সফল হবে না। এতে ফ্লাইটের দীর্ঘ পথ সিট খালি রাখতে হবে, যাতে ঢাকা-টরন্টো ফ্লাইটের ভাড়া বাড়বে এবং যাত্রীরা বিমানে ভ্রমণের আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। যদিও বিমানের প্রস্তাবিত ঢাকা-টরন্টো সরাসরি ফ্লাইটের প্রধান যাত্রী হবে বাংলাদেশের নাগরিক, তথাপিও আমাদের পাশের অঞ্চল, যেমন—ভারতের কলকাতা ও আসাম এবং নেপালের মার্কেটকেও টার্গেট করা যেতে পারে। এসব অঞ্চলের সঙ্গে আমাদের দেশের বেসরকারি এয়ারলাইনসের ফ্লাইট চলাচলের পরিমাণ সন্তোষজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সুন্দর কানেক্টিং ফ্লাইট চালুর সুযোগ সৃষ্টি করে ঢাকা বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে আমাদের আশপাশের অঞ্চল বাংলাদেশ বিমানের জন্য হতে পারে একটি লাভজনক বাজার। ভারতের মুম্বাই ও দিল্লির সঙ্গে টরন্টোর সরাসরি ফ্লাইট আছে, কিন্তু সেসব শহর থেকে কলকাতা এবং আসামের গুয়াহাটি শহরের দূরত্ব তিন ঘণ্টার অতিরিক্ত ফ্লাইং আওয়ার, অথচ ঢাকা থেকে মাত্র আধাঘণ্টা। সে কারণেই আমাদের আশপাশের অঞ্চলের মানুষ বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে ভ্রমণ করতে আগ্রহ দেখাতে পারে।

ইন-ফ্লাইট সেবাও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দীর্ঘ ফ্লাইটের ক্ষেত্রে ইন-ফ্লাইট সার্ভিসের কোনো তুলনা নেই। এমনিতেই বিমান ভ্রমণ যারপরনাই বিরক্তিকর। এ কারণেই লং ফ্লাইটে ভালো সেবার ব্যবস্থা করে থাকে সব এয়ারলাইনস। এ ক্ষেত্রে এমিরেটসের রয়েছে খুবই সুখ্যাতি। তাদের ইন-ফ্লাইট সেবার কোনো তুলনা হয় না। মানুষ একটু বেশি ভাড়া দিয়ে এমিরেটসে যাতায়াত করে শুধু তাদের উন্নতমানের সেবার কারণে। বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে বলা যায় বাংলাদেশিরাই যাতায়াত করবে। তাই অন্য বিমান সংস্থার প্যাসেঞ্জারের মতো বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন ধরনের সেবার ব্যবস্থা করতে হবে না। এ কারণেই সদিচ্ছা এবং আন্তরিকতা থাকলে মানসম্মত ইন-ফ্লাইট সেবা নিশ্চিত করা মোটেই কঠিন কিছু নয়। উন্নত সেবার অর্থ যে শুধু ইন-ফ্লাইট সেবা প্রদান বা ভালো মানের খাবার পরিবেশন করা, তেমন নয়। সময় মেনে ফ্লাইট পরিচালনা করা এবং কেবিন ক্রুদের ব্যবহারের গুরুত্বও অনেক বেশি। এসব ঐতিহ্য আমাদের আছে। শুধু তদারকির মাধ্যমে এ বিষয়গুলো একটু নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ভিআইপি, মন্ত্রী বা এমপির আসতে দেরির জন্য ফ্লাইট অপেক্ষা করানোর মতো ঘটনা যেন না ঘটে, তা আগে থেকেই নিশ্চিত করতে হবে। এসব বিষয় শুরু থেকেই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের বেসরকারি বিমানে ঢাকা থেকে কলকাতায় গিয়েছিলাম। সেই স্বল্প সময়ের ফ্লাইটে যে সেবা পেয়েছি, তা মুগ্ধ হওয়ার মতো। এ ধরনের সেবাই ঢাকা-টরন্টো বা ঢাকা-নিউ ইয়র্কের দীর্ঘ ফ্লাইটে নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে টিকিট প্রাপ্তির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। টিকিট নিয়ে যাতে কোনো ঝামেলা বা কারসাজি না হয় সেদিকটিও খেয়াল রাখতে হবে। কারণ এই অভিযোগ বিমানের বিরুদ্ধে অনেক পুরনো। অবশ্য এরই মধ্যে ই-টিকিট চালু হয়েছে বলে শুনেছি। অনলাইনে টিকিট ক্রয়ের সুযোগ থাকলে এসংক্রান্ত অনিয়ম এমনিতেই দূর হয়ে যায়। তার পরও এক ধরনের নজরদারি রাখার কোনো বিকল্প নেই।

কানাডাপ্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন বাংলাদেশ বিমানের ঢাকা-টরন্টো সরাসরি ফ্লাইট চলাচলের উদ্যোগ। তাই এই উদ্যোগ যাতে দীর্ঘস্থায়ী, সফল এবং লাভজনক হয় সেই উদ্দেশ্যে সব প্রস্তুতি আগে থেকেই গ্রহণ করা প্রয়োজন। এটি সবচেয়ে দূরপাল্লার ফ্লাইট হবে, যা ঝামেলাপূর্ণ এবং যথেষ্ট ব্যয়বহুল। আবার সঠিকভাবে পরিকল্পনা করে এবং যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারলে এই ফ্লাইট বাংলাদেশ বিমানের জন্য হতে পারে সবচেয়ে লাভজনক একটি রুট।

লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং বিশেষজ্ঞ ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

Nironjankumar_roy@yahoo.com

লেখাটি গত ৬ এপ্রিল দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে।
Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email