মহান বিজয় দিবসে শ্রদ্ধার্ঘ্য ও অঙ্গীকার

25
জাতীয় স্মৃতিসৌধের সামনে লেখক
AdvertisementCBN-Leaderate

সৈকত রুশদী, টরন্টো ||

পরম শ্রদ্ধা আমার বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা ও নির্যাতিত প্রতিটি বাঙালির প্রতি।

আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া দেশে ও বিদেশে প্রতিটি মানুষের প্রতি।

দেশকে মুক্ত করতে প্রাণ বিসর্জনকারী ও প্রাণের ঝুঁকি গ্রহণকারী প্রতিটি মানুষের অপরিমেয় ত্যাগ তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে যখন তাঁদের ত্যাগের মূল লক্ষ্য অর্জন হয়। মর্মবাণী প্রোথিত হয় জাতির অন্তরে। কাজে ও কর্মে।

স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণ জয়ন্তীর প্রাক্কালে বিজয় দিবসের ৪৯তম বার্ষিকীতে আজ ফিরে দেখা প্রয়োজন, তা’ কী সম্ভব হয়েছে? কতটুকু হয়েছে?

প্রকৃতপক্ষে, স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা ও নির্যাতিত নারী ও পুরুষের ত্যাগের মহিমা আমরা কণ্ঠে প্রকাশ করলেও হৃদয়ে কতটুকু ধারণ করি তা’ প্রশ্নসাপেক্ষ। কেননা জাতি হিসেবে বাংলাদেশীদের কাজে ও কর্মে তাঁদের সেই স্বপ্নের সার্বিক বাস্তবায়ন ক্রমেই অপসৃয়মান।

স্বাধীনতা যুদ্ধে শত্রু পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ভিত্তির প্রকাশ যে শব্দগুচ্ছে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সেই শব্দগুচ্ছ এখন রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কারণে-অকারণে বহুল ব্যবহার ও অপব্যবহারে জীর্ণ হয়ে পড়েছে।

স্বাধীনতা যুদ্ধে মানুষের যে আত্মত্যাগ ও ত্যাগ তা’ তখনই অর্থবহ উঠবে যখন আমরা বাংলাদেশে সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধিত্ব সম্পন্ন সত্যিকারের গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক, দুর্নীতিমুক্ত ও পরমতসহিষ্ণু সরকার ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারবো।

বিজয়ের ঊনপঞ্চাশ বার্ষিকীতেও তা’ এখনও সুদূর পরাহত।

নৈতিক মূল্যবোধে বলীয়ান, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ, আধুনিক ও অগ্রগামী একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে পারলে সেটি হবে তাঁদের প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা তর্পণ।

এটা বড় বেদনার বিষয় যে নিয়মিত ও অনিয়মিত বাহিনীর সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া বীর সেনানী প্রত্যেকের নাম যার সেক্টর, সাব-সেক্টর, কোম্পানী ও প্লাটুনের খাতায় লিপিবদ্ধ থাকলেও তা’ আর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরীর কাজে ব্যবহার করা হয়নি।

স্বাধীনতা উত্তর প্রথম সরকারের আশু করণীয় কাজের (immediate tasks) মধ্যে এটিও থাকা উচিত ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধের পক্ষে ও বিপক্ষে ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তিদের মধ্যে নিহত, আহত ও বেঁচে যাওয়াদের তালিকাও পরবর্তী কার্যতালিকায় থাকা প্রয়োজন ছিল। তার পরে থাকা উচিত ছিল দেশের অভ্যন্তরে ও শরণার্থীদের মধ্যে নিহত, আহত ও নির্যাতিত নাগরিকদের তালিকা। কিন্তু কোনটিই করা হয়নি।

আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের গভীরতা, ব্যাপ্তি ও মর্যাদা এবং কালের বিচারে তার তাৎপর্য স্বাধীনতা উত্তর ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারী কিংবা ১৯৭৩ সালে সাধারণ নির্বাচনের পর শপথ নেওয়া বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার উপলব্ধি করতে পেরেছিল বলে মনে হয়না।

মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ-এর নেতৃত্বে গঠিত প্রথম সরকার আরও কিছুদিন ক্ষমতায় থাকতে পারলে সেটা সম্পন্ন হতো বলে আমার ধারণা।

এর ফলে অগণন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে অপরিমেয় ত্যাগ স্বীকারকারী মহত্তর মানুষদের অনেকেই রয়ে গেছেন কোনো ধরণের তালিকা ও লোকচক্ষুর আড়ালে।

অবহেলায়, অশ্রদ্ধায়, অর্থকষ্টে, অনাহারে ও অসম্মানে কেটেছে ও কাটছে তাঁদের এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের।

এই সুযোগে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়নি, এমনকী যুদ্ধের ও স্বাধীনতার চেতনার বিরোধিতাকারী এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষের প্রাণহরণকারী ও তাঁদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতাকারী অনেক ব্যক্তিই প্রতারণামূলকভাবে মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সেজে বসেছেন।

রাষ্ট্রীয় তালিকায় নাম অন্তর্ভূক্ত করেছেন এবং সরকারী চাকুরীসহ নানা ধরণের সুবিধা নিয়েছেন। এই প্রতারকরা কেউ অশিক্ষিত নন।

প্রতারণা ধরা পড়া অল্প কিছু অমানুষের মধ্যে আধ ডজন সচিব বা তার কাছাকাছি পদমর্যাদার ব্যক্তিও রয়েছেন। এই ধরা পড়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকার বা রাষ্ট্র কোন প্রশাসনিক, আইনগত ও ফৌজদারি ব্যবস্থা না নিয়ে বরং তাদের প্রতারণামূলক কাজকে স্বীকৃতি দিয়েছে বলা যায়।

এযেন স্বাধীনতাযুদ্ধ ও তার চেতনার সাথে প্রতারণাকারীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রশ্রয় দেওয়া।

এটা বড়োই পরিতাপের বিষয় যে বিগত ঊনপঞ্চাশ বছরে স্বাধীনতা উত্তর থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি সরকার হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস লিপিবদ্ধ করতে অবহেলা করেছে, অথবা নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে রাজনৈতিক স্বার্থে স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে।

অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তি উন্নয়নের এই যুগে বোধকরি সময় এসেছে রাজনৈতিক পক্ষপাতহীনভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস অনুসন্ধান করার।

প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধে অবদান রাখা, নির্যাতিত নারী ও পুরুষ এবং নানাভাবে ত্যাগ স্বীকারকারী প্রতিটি মানুষের সঠিক তালিকা তৈরী করে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা এবং সম্মাননা জানানোর ব্যবস্থা করা।

স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজনীতিক ও শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস নামের ঘাতক বাহিনী এবং পাকিস্তানী শাসকদের এদেশীয় সক্রিয় দোসরদেরও সঠিক তালিকা তৈরী করা।

প্রয়োজন সেই ব্যবস্থা করা, যাতে বর্তমান এবং আগামী প্রজন্মের মানুষেরা জানতে পারে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কারা ছিলেন বীর।

কারা ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষে ও কারা ছিলেন বিপক্ষে। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের কারা ছিলেন মিত্র, কারা ছিলেন শত্রু।

এই সত্য ইতিহাস জানা এবং আগামীতে তা’ জানানোর ব্যবস্থা করাটা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য জরুরী।

এর ফলে, ক্ষমতার লোভে মদমত্ত রাজনীতিকদের কখনও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি, কখনও স্বৈরশাসক, কখনও ধর্মান্ধদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে ও পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন করে, আবার অন্যদিকে মিথ্যাচারের মাধ্যমে জনগণকে ধাপ্পা দেওয়ার দিন শেষ হবে।

সেই সাথে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সংবিধানে ঘোষিত মৌলিক অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠা করা আরও জরুরী।

সমাজের যেকোনো পর্যায়ের মানুষের যেন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার নিশ্চয়তা থাকে। থাকে জীবনমান উন্নয়ন করে রাষ্ট্র পরিচালনায় অবদান রাখার সুযোগ। থাকে সংবিধান সম্মত আইনের শাসন ও সকলের সমান অধিকার।

বাংলাদেশের নাগরিকরা যেন ফিরে পায় তার বাক স্বাধীনতা, মত প্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতা, একাত্তরে বুদ্ধিজীবীদের তুলে নিয়ে হত্যা করার মতো নিরস্ত্র নাগরিকদের বিনা বিচারে গুম ও খুন হওয়া থেকে সুরক্ষা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং নির্বাচনে ইচ্ছেমতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নিজের পছন্দমতো ভোট প্রদানের অধিকার।

এই হোক পঞ্চাশতম বিজয় দিবসে আমাদের অঙ্গীকার।

https://www.facebook.com/cbn24.ca
Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
CBN-Leaderate