মা দিবস নিয়ে কানাডা প্রবাসীর গল্প ‘মাতৃত্ব’

975
AdvertisementLeaderboard

যুথিকা বড়ুয়া

।। টরন্টো, কানাডা থেকে ।। 

 ( এক )

সারাদিনের কর্মক্লান্তিতে কখন যে তন্দ্রা লেগে এসেছিল, টেরই পায়নি গৌরীরানি। হঠাৎ বাসন-পত্রের টুং টাং শব্দে ধড়ফড় করে ওঠে। মুহূর্তের জন্য স্বপ্ন না বাস্তব, ঠাহরই করতে পাচ্ছিল না। চোখ পাকিয়ে দ্যাখে চারিদিকে। শোনে কান পেতে। ততক্ষণে বাবলু ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে কাঁদতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে। কতই বা আর বয়স ওর, বছর আটেকের হবে। মায়ের অজান্তে রান্নাঘরে ঢুকে এই কান্ড।

ছোটবেলা থেকেই ক্ষীর মিঠাই, পিঠা-পায়েশ খুব প্রিয় বাবলুর। সকালে খেয়ে ওর মন ভরেনি। বাটিটাই দেখতে বড় ছিল। গৌরী রানি দিয়েছিলও নামমাত্র। ঐটুকু খেয়ে তৃপ্তি হয় কারো! পেটের এককোণাও ভরেনি বাবলুর। অপেক্ষা করে ছিল, মা অন্যমনস্ক হলেই চুপিচুপি রান্নাঘরে ঢুকে ইচ্ছে মত ক্ষীর খাবে। আর ঠিক তক্ষুণি দৌড়ে পা টিপে নৈঃশব্দে রান্নাঘরে ঢুকে, দরজা বন্ধ করে ক্ষীরের পাতিলাটাই নিয়ে বসেছিল খেতে। কিন্তু একটুও মুখে দিতে পারেনি। সবে মাত্র আঙ্গুল ডুবিয়েছে, তৎক্ষণাৎ জানালার ধারে বসে থাকা হুঁলো বিড়ালটা মিঁয়াউ করে ডাক দিতেই বাবলু চমকে ওঠে। আর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষীরের পাতিলাটা ওর হাত থেকে ছিটকে পড়ে বাসন-পত্রের উপর। ব্যস আর কি! একটা লেগে তিনটে পড়ে। আর পড়তে পড়তে বাসন-পত্রের টুং টাং শব্দের ধ্বনি প্রতিঃধ্বনিতে কানে একেবারে তালা লেগে যাবার উপক্রম। সব হুড়মুড় করে বাবলুর পায়ের উপরে পড়ে। উফ্ অসহ্য যন্ত্রণা! বাবলু চিৎকার করে ওঠে, -‘ওমা, মা গো, শিগগির আসো! পা-টা আমার ভেঙ্গে গেল গো!’

শুধু কি যন্ত্রণা, মায়ের শরণাপন্ন হতেই ভয়-ভীতিতে বাবলু একেবারে আড়ষ্ঠ হয়ে যায়। হাত-পা  থরথর করে কাঁপতে শুরু করে। গলা শুকিয়ে আসে। দৌড়ে রান্নাঘর থেকে পালাবে, সে শক্তিও নেই। বড্ড লেগেছে পায়ে। তবু খাওয়ার লোভ সামলাতে পারেনা। আঙ্গুলের ডগায় যেটুকু ক্ষীর লেগে ছিল, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেটুকুই চেটে চেটে খায় আর ভাবে,- ‘মায়ের হাত থেকে আজ আর রক্ষে নেই। কপালে দুঃখ অনিবার্য!’

ক্ষীরের গন্ধ্যে ছেয়ে গিয়েছে সারাঘর। বাবলুর চোখেমুখেও ছিটকে পড়েছে। ওকে অদ্ভুত লাগছে দেখতে। মনে হচ্ছে ক্ষীরের পাতিলা থেকে ডুব দিয়ে উঠেছে। ততক্ষণে দ্রুত ছুটে আসে গৌরীরানি। ভেবেছিল, নিশ্চয়ই জানলা দিয়ে বিড়াল ঢুকে এঁটো বাসনগুলি সব ফেলে দিয়েছে। কিন্তু বাবলু রান্নাঘরে? কি করতে ঢুকেছে? ইতিমধ্যে বীভৎস বাবলুকে দেখে একেবারে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে। ওর আপাদমস্তক লক্ষ্য করে অনায়াসে বুঝতে পারে, ক্ষীর চুরি করে খেতেই রান্নাঘরে ঢুকেছিল বাবলু।

হাতের সামনে একটা ঝাঁটা ছিল। চোখমুখ রাঙিয়ে গৌরীরানি সেটা নিয়েই তেড়ে আসে। গলার স্বর বিকৃতি করে বলে,- ‘হতচ্ছাড়া রাক্ষশ, তর এত্তবড় সাহস!’ বলতে বলতে ঝাঁটা দিয়ে দমাদম পিটাতে শুরু করে। যন্ত্রণায় বাবলু আর্তনাদ করে ওঠে। মায়ের পা-দু’টো জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে। হিচকি তুলে বলে,-‘মাগো, মেরনা মা, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, আমায় মের না। আর কখনো করবো না। তোমায় না বলে আর কোনদিন রান্নাঘরে ঢুকবো না।’

পাষাণ হৃদয় গৌরীরানির। সহজে গলার নয়। শাড়ির আঁচল কোমড়ে গুঁজতে গুঁজতে চোখ রাঙিয়ে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে কর্কশ কণ্ঠে গর্জে ওঠে,-‘হইছে হইছে, আমার পা-খান্ ছাড়। তরে না বাটি ভইর‍্যা দিছিলাম। খাইয়া প্যাট ভরে নাই। বাসনগুলারে তো সব ফ্যালাইয়া দিছস। আমার কাম একখান্ বাড়াই দিছস। পাইছস কি আমারে কয়! এত্তো জ্বালাশ ক্যান তুই?’

বাবলুর কান দু’টো মলে দিয়ে বলে, -‘হারামজাদা, তলে তলে এত্ত বুদ্ধি তর। চুরি বিদ্যাও শিখছো। আবার দেখি রান্নাঘরে, তর ঠ্যাং আমি ভাইঙ্গা দিমু। আউক তর বাপ। এর একখান্ বিহিত করতেই হইব!’

বলে ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে হিংস্র বাঘিনীর মতো কটাক্ষ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। চোখ দুটো দিয়ে যেন আগুনের গরম শলাকা বের হচ্ছে। যেন গিলেই খেয়ে ফেলবে বাবলুকে।

ইতোমধ্যে বাবলুর বাবা শশী ভূষণের গলা শোনা গেল। তিনি হলেন আরেক জগতের মানুষ। তার প্রচন্ড মাছ ধরার বাতিক। একরকম নেশাও বলা যায়। ছুটির দিনে বাড়িতে তার দর্শনই পাওয়া যায় না। তন্মধ্যে প্রতিদিন মায়ে-পুতের পাঁচালী শুনতে শুনতে তার বিরক্তি ধরে গিয়েছে। সাতসকালেই ছিপ নিয়ে মাছ ধরতে বেরিয়ে পড়েছিলেন। পড়ন্ত বিকেলে ফিরে এসে হাঁক ডাক দিয়ে বলেন, -‘কোইগো ছোট গিন্নী, কোই গ্যালা। আইশ্যা ধরো শিগগির। আজ একখান গঙ্গার ইলিশ আনছি।’

স্বামীর গলার আওয়াজ কর্ণগোচর হতেই রক্তের চাপ আরো দশ ডিগ্রি বেড়ে যায় গৌরীরানির। সবুর সয়না। ক্রোধে মুখের পেশীগুলি ফুলে ওঠে। চোখমুখ রাঙিয়ে ঝাঁটা হাতেই উত্তপ্ত মেজাজে হন্ হন্ করে রান্নাঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। হাঁপাতে হাঁপাতে অভিযোগ করে ছেলের বিরুদ্ধে। -‘ওগো, শুনছো। তোমার গুনধর পুত্তুর কি করসে আইস্যা দেইখ্যা যাও। আমার হাঁড়-মাংস এক্কারে চিবাইয়া খাইতাছে। আর পারুম না। সহ্য হইতেছে না আমার। অর শীগ্গির একখান্ ব্যবস্থা করো।’

শুনে থ্ হয়ে যান শশী ভূষণ। বিস্ময়ে হাঁ করে থাকেন। মনে মনে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন। গিন্নীর আপাদমস্তক নজর বুলিয়ে বললেন,-‘এ তুমি কি কইলা ছোট গিন্নী? পোলাপাইন মানুষ, জ্ঞান-বুদ্ধিও হয় নাই। দোষ তো একটু আধটু করবই। তুমি না অর মা, অরে শাসন করো। তুমিই তো কইছিলা, অরে দ্যাখবা, মানুষ করবা। হেই ভরসায় তো তোমারে আনছি। নিজের প্যাটের সন্তান হইলে কি আর কইতে পারতা! বুঝি না বাপু, কও কে করেছে? অন্তরে কি মায়া-দয়াও নাই তোমার?”

ফোঁস করে ওঠে গৌরীরানি। -‘অ, এইবার বুজ্ঝি। হ্যার লাইগ্যাই তো চাইর চাইরটা বছর গত হইল গিয়া, আমারে আজও একখান সন্তান দিলা না। উল্টা বাপ-ব্যাটা দুজনে মিল্যা আমারেই জব্দ কর। দোষারোপ করো। পোলারে তো আস্কারা দিয়া এক্কারে মাথায় তুইল্যা রাখছ। আমারে মানবো ক্যান! হক্ কথা কই দেইখ্যা তোমোগো জ্বলন ধরছে। বুঝি না কিছু!’

বলে স্বামীর হাত থেকে ঝট্ করে মাছের ব্যাগটা টেনে নিয়ে উগ্র মেজাজে গজ্গজ্ করতে করতে দ্রুত ঢুকে পড়ে রান্নাঘরে।

শশী ভূষণ বরাবরই শান্তি প্রিয় মানুষ। কোনরকম ঝঞ্ঝাট ঝামেলা, অশান্তি একদম পছন্দ করেন না। সর্বদা এড়িয়ে চলেন। গায়ে মাখান না। কিন্তু আজ আচমকা ছোট গিন্নীর অপ্রীতিকর বাক্য শ্রবণে হতাশায় মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। স্তম্ভিত হয়ে যান। ইচ্ছে হচ্ছিল, প্রতিবাদ করবেন। ন্যায-অন্যায় বিচার করবেন। কিন্তু পরিস্থিতি বেগতিক লক্ষ্য করে নীরবে হজম করে গেলেন। গৌরীরানির মুখের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তে মোমের মতো গলে একদম নরম হয়ে গেলেন। একটি শব্দও আর উচ্চারণ করলেন না। ধপাস করে বসে পড়লেন বারান্দায়।

ইত্যবসরে ল্যাঙরাতে ল্যাঙরাতে দ্রুত রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে পিছন দরজা দিয়ে গোয়ালঘরের দিকে চলে গিয়েছিল বাবলু। আড়ি পেতে মা-বাবার কথা শুনছিল। কিন্তু মগজে না ঢুকলেও আলোচ্যের বিষয় বস্তু কিঞ্চিৎ বোধগম্য হতেই ভারাক্রান্ত মনে চুপটি করে বসে পড়ে মাটিতে। বেচারার অনুতাপের আর শেষ নেই। নিজের উপরেই প্রচন্ড রাগ হয়। ধ্যাৎ, কোন্ কুক্ষণে যে রান্নাঘরে ঢুকতে গিয়েছিল, মরার বিড়ালটাও মিঁয়াউ করবার আর সময় পায় নি। তাও যদি একটু তৃপ্তি ভরে খেতে পারত। সব মাটিতে পড়ে গেছে।

ভাবতে ভাবতে পায়ের পাতায় প্রচন্ড যন্ত্রণা অনুভব করে। বড্ড কষ্ট হচ্ছে। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পাচ্ছে না। একসময় মনটা ওর উদাস হয়ে যায়। হাজার প্রশ্নের ভিড় জমে ওঠে। নিশ্চয়ই মা আমায় ভালোবাসে না। তাই বুকে জড়িয়ে ধরে কক্ষনো আদর করে না, চুম্বন করে না। কিন্তু কেন? পাশের বাড়ির ছোটনকে ওর মা কত আদর করে, ভালোবাসে। ওকি কখনো অন্যায় করেনা? ঘরের জিনিসপত্র অনিষ্ট করেনা? সেদিন মুরগির বাচ্চাগুলিকে ফার্ম থেকে ছেড়ে দিয়ে সেই কি কান্ড। একটাকেও বাঁচাতে পারেনি। সবগুলি গেছে কাঁকের পেটে। ঠোঁট দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে। কোই, ওর মা তো ছোটনকে মারধোর করেনি, চিৎকার, চেঁচামিচি করেনি।

বাবা বলে, -‘পৃথিবীতে মায়ের চে’ বড় আর কেউ নেই। মায়ের স্থান কেউ পূরণ করতে পারেনা। আপন গর্ভে লালিত সন্তান আর মায়ের নারীর চিরন্তন বন্ধন, সে এক অদৃশ্য শক্তি, এক অবিচ্ছেদ্য গভীর টান। তাকে ছিন্ন করা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। স্বয়ং বিধাতারও নেই। মাতা-পিতা দেব-দেবীর সমতুল্য।’

তা’হলে আমার মায়ের মন কেন এমন নির্দয়, নিষ্ঠুর? কেন আমায় এতো আঘাত করে? খাবার জিনিস মায়ের অনুমতি ছাড়া খেতে গিয়েছিলাম। আর সব পড়ে গিয়েছে মাটিতে। যেন গুরুতরো অপরাধ করেছি। আমি ইচ্ছে করে করেছি, যে মা আমায় সহ্যই করতে পারছে না। আমি কি মায়ের ছেলে নই!

ভাবতেই মাথাটা কেমন ঘুরে উঠল বাবলুর। শরীরটাও ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে, গোটা পৃথিবীটাই যেন বন্ বন্ করে ঘুরছে চারদিকে। তবু মা-বাবা কাউকে ডাকছে না। দু’চোখ বন্ধ করে বাঁশের খুঁটিতে মাথাটা ঠেকান দিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে।

ততক্ষণে ক্লান্ত সূর্য্য অস্তাচলে ঢলে পড়েছে। পশ্চিমপ্রান্তে নিস্তেজ সূর্য্যরে ক্ষীণ আলোর আভা মুখের উপর এসে পড়তেই শশী ভূষণ নড়ে চড়ে বসেন। বেচারা স্ত্রী-পুত্রের ভবিতব্য রচনা করতে করতে সেই তখন থেকে অন্যমনস্ক হয়ে ছিলেন। অগত্যা, করণীয় কিছুই নেই।

ইতোপূর্বে চালের ওপর থেকে একটা বাচ্চা টিকটিকি গায়ের উপর ঝাঁপটে পড়তেই চমকে ওঠেন। -‘হেই, হট্, হট্!’ বলতে বলতে চোখ যায় রান্নাঘরের দিকে। ‘অ বাবলু, বাবলু! কোই গেলি বাবা! শীগগির আয় দেখি নি!”

ধারণা করে ছিলেন, নিশ্চয়ই ঘরের ভিতর লুকিয়ে আছে বাবলু। কিন্তু কোথায়! কোনো সাড়া-শব্দই নেই ওর। শশী ভূষণ ঘাঁড় ঘুরিয়ে সন্ধানী দৃষ্টিতে তাকাতেই নজর পড়ে গোয়ালঘরের দিকে। বিস্মিত কণ্ঠে বললেন,-‘করস কি তুই ঐখানে?’

বলতে বলতে শশী ভূষণ দ্রুত এগিয়ে আসেন। বাবলুর গায়ে একটা ঝাঁকা দিয়ে বলেলন, -‘অ বাবলু, ঘুমায় পড়ছস! দাঁড়াই দাঁড়াই ঘুমাশ ক্যান বাবা! মায়ে মারছে বুঝি খুব!’

পিতার আলতো স্পর্শেই ঈষৎ নড়ে ওঠে বাবলু। ওর কানে কানে ফিস্ ফিস্ করে শশী ভূষণ বললেন,-‘হ্যারে, করছস কি তুই! কইলাম তরে, চল আমার লগে! গেরাহ্যই করলি না! তড় গা-হাত-পা এত্ত নোংরা ক্যান? সাদা সাদা ওগুলা কি মাখছস?’

চোখ মেলে তাকায় বাবলু। কিছু বলল না। গোমড়া মুখে একপলক চেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো। শশী ভূষণ বুঝলেন, বাবলু অভিমান করেছে, গোস্যা করেছে। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,-‘চল বাবা, ঘরে চল। ইলিশ মাছ আনছি। মায়ে রানতাছে। গরম গরম ভাত দিয়া দুইটা খাবি চল!’

বাবলু নিরুত্তর। পদাঘাতে থপ্থপ্ শব্দ করে এগিয়ে যায় পুকুরঘাটের দিকে। মুখ-হাত-পা ধুয়ে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে বিছানায়। শশী ভূষণ আর্তকণ্ঠে বললেন,-‘কোথায় যাস বাবলু! মায়ে মাইর দিব কিন্তু!’

( দুই)

বেশ কিছুদিন যাবৎই বাবলুর ব্যতিক্রম পরিবর্তন দেখা দেয়। স্কুল থেকে এসে বাইরে বারান্দার কোণে বিষন্ন মুখে চুপটি করে বসে থাকে। কারো সাথে কথা বলে না। সময় মতো নাওয়া-খাওয়া করে না। খেলতেও যায় না মাঠে। বিকেল হলেই ওর সঙ্গী-সাথিরা বাড়ির সামনে এসে ভীঁড় জমায়। দূর থেকে উঁকি ঝুঁকি মারে। কিন্তু বজ্রকণ্ঠি গৌরী রানির ভয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করার সাহসই হয় না কারো। কেউ কেউ কানাকানি করে, মুখ টিপে হাসে। আর কেউ ব্যঙ্গ করে বলে,-‘কি রে বাবলু, তোকে আজ খুব পিটিয়েছে বুঝি তোর মা!’

ইতিপূর্বে বারান্দায় বেরিয়ে আসে গৌরীরানি। চোখমুখ রাঙিয়ে কটাক্ষ করে বলে,-‘বান্দর পোলাপাইন কতগুলা, তগোর দরদ এক্কারে উথলে উঠতাছে! দাঁড়া, তগো মজা দেখাই!’ বলে হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে উঠোনে। ততক্ষণে ছেলে-মেয়েরা হৈ-হুলোড় করতে করতে ছুটে পালায়। কিন্তু বাবলু গোঁ ধরে ঠাঁয় বসে থাকে। মন্ত্রের মতো শুধু জপতে থাকে, মায়ের সাথে কোনদিনও আর কথা বলবে না।

বলিহারী মহিলা গৌরীরানি। গ্রাহ্যই করল না। অকারণে মুখখানা বিকৃতি করে হন্ হন্ করে গোয়ালঘরের দিকে এগিয়ে গেল। কোণা চোখে বাবলুকে দেখলো, কিন্তু কিছু বলল না।

মনে মনে অবাক হয় বাবলু। বোবার মতো শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। আশা করেছিল, মা কাছে আসবে, মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করবে। স্নেহভরা কণ্ঠে জিজ্ঞ্যেস করবে,-‘হ্যাঁ রে বাবলু, মায়ে মারছিল, খুব ব্যথা পাইছিলি। আহা রে, বাছা আমার। আয় বাবা আয়, আমার বুকে আয়। আর কক্ষনো মারুম না!’
কিন্তু কোই, মা তো কিছুই বলল না। তবে কি সত্যিই মা আমায় ভালোবাসে না?

তুব নিস্পাপ নাবালকের মন কিছুতেই বিশ্বাস হয় না যে, সন্তানের প্রতি মা কখনো এতোখানি নির্দয় নিষ্ঠুর হতে পারে না। মায়ের অবাধ্য হয়েছি বলেই তো মা রেগে গিয়েছে। মারধোর করেছে। রাত পোহালে নিশ্চয়ই সব ভুলে যাবে মা। এই ভেবে বাবলু উঠে দাঁড়ায়। মায়ের উপর সমস্ত মান-অভিমান মুহূর্তে দূর হয়ে যায়। ততক্ষণে সন্ধ্যে ঢলে পড়েছে। প্রতিদিনকার মতো মুখ-হাত-পা ধুয়ে পড়তে বসে। আর বাবলুর পড়তে বসা মানে ফুটবল খেলার রিলে করা। দাঁড়ি নেই, কমা নেই, বিরতি নেই। এক নাগারে কান তালা লাগিয়ে সজোরে পড়তে পড়তে ক্লান্ত দেহের অবসন্নতায় কখন থেকে যে ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল, টের পায় নি। হঠাৎ ঘড়ির ঘন্টা শুনে চমকে ওঠে। চোখ মেলে দ্যাখে, রাত প্রায় এগারোটা বাজে। বইপত্রর সব বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মা-বাবা কারো সাড়া -শব্দ নেই। ভাবল, নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছে।

ধীর পায়ে বিছানা ছেড়ে নেমে আসে বাবলু। নৈঃশব্দে দরজা খুলে গলা টেনে রান্নাঘরের দিকে চেয়ে দ্যাখে, দরজা বন্ধ, অন্ধকার। কিন্তু মায়ের ঘরের জানালা দিয়ে ঈষৎ আলোর রশ্মি এসে পড়েছে বারান্দায়। এদিকে ক্ষিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। সেই দূপুর থেকে কিছুই আর খাওয়া হয়নি। মাকে ডাকাডাকি করলে হয়ত এক্ষুণিই চেঁচামিচি শুরু করে দেবে।

এই ভেবে বাবলু নিজেই পা টিপে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতেই থমকে দাঁড়ায়। মনে হলো, ওর সম্বন্ধ্যেই খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মা-বাবা আলোচনা করছে। কিন্তু কেন? ওতো আজ কোনো অন্যায়, অপরাধ করে নি! মায়ের কোনো অনিষ্ঠ করে নি! তা’হলে!

হঠাৎ ওর কৌতূহল জেগে ওঠে। গিয়ে উঁকি দেয় জানালায়। শোনে আড়ি পেতে। আর শোনামাত্রই বিস্ময়ে থ্ হয়ে যায় বাবলু। যেন আকাশ থেকে পড়ল। কিছুতেই ওর বিশ্বাস হয় না। আজ এ কি শুনলো ও’! মনে মনে বিড় বিড় করে ওঠে। এসব কি বলছে মা? মা যা বলছে সত্যিই কি তাই? আমি ওর ছেলে নই? না, না, এ হতে পারে না। এ কেমন করে সম্ভব। নিশ্চয়ই ও’ ভুল শুনেছে।

না, ভুল নয়। ঠিকই শুনেছে বাবলু। হাত নেড়ে গৌরীরানি চিৎকার করে বলছে,-‘অড়ে আমি দেখুম ক্যান? ক্যান দেখুম? হে তো আমার পোলা নয়। আমি তো অরে প্যাটে ধরি নাই, অরে জনম দেই নাই। আমার পোলা হইল ক্যাম্নে? বান্দর একখান্। খালি ল্যাজটাই দেয় নাই ভগবানে। অরে কক্ষনোই স্বীকার করুম না! মানুম না। এই আমার শ্যাষ কথা!’

হঠাৎ যেন একটা বিস্ফোরণ ঘটে গেল। চমকে উঠল গৌরীরানি। চোখমুখ রাঙিয়ে শশী ভূষণ তীব্র কণ্ঠে গর্জে উঠেন,-‘তোমারে আল্বাত মাইনতে হইব। বাবলুই আমাগো একমাত্রর সন্তান। তোমারেই মানুষ করতে হইব!’
কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন,-‘হায়রে কপাল আমার, কেম্নে বুঝাই অরে!’

স্বামীর অস্বাভাবিক মুখায়ব লক্ষ্য করে নরম হয়ে পড়ে গৌরীরানি। গলার স্বর ভারি হয়ে আসে। কিন্তু চোখেমুখে আকুতি মিনতির ছাপ প্রকট। একজন বিবাহিতা নারী তার প্রাপ্য অধিকার থেকে সে কখনোই বঞ্চিত হতে পারে না। এ অন্যায়, অবিচার। আপন সন্তানের জননী হওয়াই জগতে প্রতিটি নারীর একমাত্র কাক্সিক্ষত স্বপ্ন, জীবনের স্বার্থকতা, পরিপূর্ণতা। আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ীত করতেই গৌরীরানি হঠাৎ প্রতিবাদ করে ওঠে,-‘ওগো না, তোমার দু’টি পায়ে পড়ি। আমার পরাণ থাকতে এ আমি কক্ষনো হইতে দিমু না। এ হইতে পারে না। আমি সক্ষম, গর্ভে ধারণ কইর‍্যা আমার সন্তানের মা হইতে চাই আমি। দোহাই তোমার, আমারে বঞ্চিত কইরো না!’

care-2024469_1280স্ত্রীর কাতর অভিযোগে অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন শশী ভূষণ। চকিতে মনে পড়ে যায়, ভাগ্য বিড়ম্বনার সেই দিনটির কথা। যেদিন দ্বিতীয় স্ত্রী তার প্রথম সন্তান লাভের প্রচেষ্টার ব্যর্থতার কারণে শশী ভূষণ মর্মাহত হয়ে ছিলেন। বিপদ সংকেতের আশক্সক্ষায় সেদিন একেবারে যমে মানুষে টানাটানি। বাঁচবার কোনো আশাই ছিল না। যার বিনিময়ে প্রচুর রক্তক্ষয় হয়েছিল গৌরীরানির। যেকথা আজও ওর অজানা। শুধু কি তাই, বুকের পাঁজরখানাও ভেঙ্গে চৌচির করে দিয়েছিল। সে কি অপরিসীম যন্ত্রণা একেলা শশী ভূষণকে নীরবে নিঃভৃতে সইতে হয়েছিল, তা ঘুণাক্ষরেও গৌরীরানিকে কখনো জানতে দেয়নি। মনে মনে অসন্তুষ্ট হলেও চোখেমুখে ক্ষোভ, দুঃখ, অনুশোচনার কোনো চিহ্নই তার ছিল না। নিজের অদৃষ্টকে মেনে নিয়ে বুকের কষ্টগুলিকে হাসি মুখেই গ্রহণ করেছিলেন, শুধুমাত্র স্ত্রীর মুখ চেয়ে। গৌরীরানি জানে সেখবর? জানতেও তো চায় নি কোনদিন! আবেগ-অনুভূতি কিছুই কি নেই ওর অন্তরে?

মানসিক বিভ্রান্তিতে হৃদয়-মন-প্রাণ সারাশরীর বিষন্নতায় ছেয়ে যায় শশী ভূষণের। চেয়েছিলেন এতবড় সত্য চেপে রাখবেন। অন্তরের অন্তরস্থলে গোপন করে রাখবেন। কিন্তু পারলেন না। উত্তেজনায় ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে আলমিরার ড্রয়ারটা একটানে খুলে মেডিক্যাল্ রিপোর্টের কাগজটা বের করে তীব্র কণ্ঠে গর্জে উঠলেন,-‘এই দ্যাখো, ডাক্তারে কি লিখছে দ্যাখো। মনে কষ্ট পাইবা, তাই এদ্দিন কই নাই। আমার কি ইচ্ছা হয় না ছোট গিন্নী? আমারও কি ইচ্ছা হয় না, তোমার কোলে একটি ছোট্টশিশু জন্ম গ্রহণ করুক! আমি স্বার্থপর নই ছোট গিন্নী। আমারে ভুল বুইঝ না!’

গৌরীরানি সেকেলে মহিলা। সংস্কার প্রবণ মন-মানসিকতা। কিন্তু সে যে নিজেই অক্ষম, নিজের রক্তে মাংসে গড়া সন্তানের মা সে কোনদিনও হতে পারবে না, তা বুঝতে একটুও দেরী হলো না। যা স্বপ্নেও কখনো ভাবতে পারে নি। সন্তান ধারণের ক্ষমতা গৌরী রানির নেই। এতবড় দুঃখ সে কোথায় রাখবে। কেমন করে সইবে।

একটা শব্দও আর উচ্চারণ হয় না গৌরী রানির। রুদ্ধ হয়ে আসে কণ্ঠস্বর। শোকে দুঃখে হতাশায় পাথরের মতো শক্ত হয়ে ধপ্ করে বসে পড়ে বিছানায়।

একেই বলে বরাত। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস। কত আশা ছিল, কত স্বপ্ন ছিল জীবনে। কিছুই পূরণ হলো না। সব সাধ-আহাল্লাদ নিমেষেই ভেসতে গেল গৌরীরানির। অথচ এতকাল স্বামী শশী ভূষণকেই মিথ্যে ভুল বুঝে কত আঘাত করেছে। মনে কত কষ্ট দিয়েছে। অথচ কখনো কোনো অভিযোগ করেনি, অসন্তুষ্টজনক কোনো কথাবার্তাও বলেনি।

আজ নিজেকেই অপরাধী বলে মনে হয় গৌরীরানির। অনুতাপ অনুশোচনায় পাষাণ হৃদয়টা গলে একেবারে নরম হয়ে যায়। লজ্জায় অপমানে শাড়ির আঁচলে মুখ গুঁজে রাখে। অশ্রুকণায় ছল্ছল্ করে ওঠে চোখদু’টো। একসময় সশব্দে ফ্যাঁচ্ ফ্যাঁচ্ করে কাঁন্না কেঁদে ওঠে।

শশী ভূষণ সন্নিকটে এগিয়ে আসেন। শান্তনা দিয়ে বললেন,-‘তুমি কান্দ্ ক্যান ছোট গিন্নী? দোষ তো আমারই। এত্তবড় সত্য কথাডা আগে কইতাম, পোলাটারে কক্ষনো আঘাত করতা না। মাইত্যা না। যাউগ্ গিয়া, যা হইবার ছিল, হইয়াই গ্যাছে। পোলাডা বোধহয় এতক্ষণ ঘুমায় পড়ছে। ডাইক্যা তোলো অরে। বুকে জরাই ধইর‍্যা আদর করো।’

শূন্যতাবোধে বুকের ভিতরটা এতক্ষণ খাঁ খাঁ করছিল গৌরীরানির। হঠাৎ কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। অনুভব করে, মমতাময়ী মায়ের স্নেহ-মমতা আর ভালোবাসার এক মধুর আবেশ। স্পর্শ করে হৃদয়কে। জাগ্রত হয়, অদ্ভুদ এক চেতনা, এক অভিনব অনুভূতি। যে অনুভূতি দিয়ে গৌরীরানি আজ নিজেকেই প্রশ্ন করে,-মা হারা একটি ছোট্ট শিশুকে দীর্ঘ নয় বৎসর যাবৎ কোলে পিঠে করে যাকে বড় করেছে, যে মায়ের হাত ধরে ছোট্ট বাবলু চলতে শিখেছে, কথা বলতে শিখেছে, ও’তো সেই মায়েরই সন্তান। আজ কেন সে তার মা হতে পারবে না? সে কেনইবা মায়ের আদর-স্নেহ-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হবে? লাঞ্ছিত, অবহেলিত হতে হবে। বাবলুই রায়চৌধূরী পরিবাবের একমাত্র উত্তরাধিকারী। বংশের প্রতীক। বাবলুই গৌরীরানির একমাত্র সন্তান।

হঠাৎ দু’চোখে গঙ্গা বয়ে যায় গৌরীরানির। এতকাল নির্দয় নিষ্ঠুরের মতো বাবলুকে কত আঘাত করেছে। কত মারধোর করেছে। ওকে কোনদিনও আদর করেনি, ভালোবাসেনি।

হঠাৎ মনে পড়ে, সন্ধ্যে থেকে বাবলুর আজ কিছুই খাওয়া হয়নি। ‘আহারে, সোনা আমার, বাছা আমার। পোলাডা আজ অনাহারেই ঘুমায় পড়ছে!’

আর ভাবতে পারছে না গৌরীরানি। মাথাটা বোঁ বোঁ করে ঘুরছে। হাত-পা সারাশরীর ক্রমশ অসাড় হয়ে আসছে। কি করবে দিশা খুঁজে পাচ্ছে না। আচমকা শশী ভূষণকে কাঁপিয়ে দিয়ে উন্মাদের মতো চাপা আর্তকণ্ঠে চিৎকার করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে বারান্দায়।-‘আমার বাবলু, সোনা আমার, বাবা আমার। আয় বাবা উঠ্! ভাত খাবি আয়!’

কিন্তু বারান্দায় বেরিয়েই থমকে দাঁড়ায় গৌরীরানি। দ্যাখে, অভিমানে গাল ফুলিয়ে জানালার পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বাবলু। চোখমুখ বিষন্নতায় ছেয়ে আছে।

বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে গৌরীরানির। বড্ড মায়া হয়। আর তৎক্ষণাৎ নিঃসন্তান মায়ের শূন্য বুক জুড়ে কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে মাতৃত্বে ভরে ওঠে। অনুভব করে, নারীর অস্তিত্ব। নারীর জীবনের চরম সার্থকতা, পরিপূর্ণতা এবং মাতৃস্নেহের দৃঢ় বন্ধন শক্তি। যে বন্ধন শক্তির প্রভাবে গৌরীরানি অনুভব করে, সব কিছু হারিয়েও আজ সবই ফিরে পেয়েছে। সেই সঙ্গে মুছে যায়, অন্তরে জমে থাকা সমস্ত গানি। আজ যেন বাবলুকে নতুন করে আবিস্কার করে। চেয়ে থাকে ব্যাকুল নয়নে। যেন কতকাল দ্যাখেনি। আর ধৈর্য্য ধরেনা। আবেগের বশীভূত হয়ে দুহাত প্রসারিত করে দেয়। মমতা মাখানো হাসি কাঁন্নার সুরে বলে ওঠে,-‘আয় বাবা আয়, আমার বুকে আয়। আর কক্ষনো তরে মারুম না!’
বলেই কাছে এগিয়ে আসে। কিন্তু ছুটে পালায় বাবলু। বলে,-‘না, তুমি আমার মা নও। আমি তোমার কেউ নই। তোমার কোনো কথা আমি শুনবো না।’

ততক্ষণে দৌড়ে এসে বাবলুকে খপ্ করে ধরে ফেলে শশী ভূষণ। বলে-‘ছিঃ বাবা, ও কথা কইতে নাই। মায়ের কথা শুনতে হয়। যা বাবা যা! মায়ে ডাকে!’

অধীর আগ্রহে চেয়ে থাকেন শশী ভূষণ। দেখলেন, একটুও অবাধ্য হলো না বাবলু। গুটি গুটি পায়ে কিছুটা এগিয়ে এসে থমকে দাঁড়ায়। সাশ্রু নয়নে গৌরীরানি বলে,-‘আয় বাবা, আমার বুকে আয়। এই অভাগিনী মায়ের বুকখানা যে কতকাল শূন্য হয়ে আছে বাবা, আমার বুকের আয়।’

নাবালক ছেলে বাবলু। মনের ভিতর জমে থাকা সমস্ত মান-অভিমান নিমিষে দূরীভূত হয়ে যায়। তৎক্ষণাৎ দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে মায়ের কোলে। অপ্রত্যাশিত অব্যক্ত আনন্দ-বেদনার সংমিশ্রণে সজোরে কেঁদে ওঠে মায়ে-পুতে দু’জনেই। স্নেহাস্পদে বাবলুকে বুকে জড়িয়ে ধরে ওর কপালে গালে চুম্বনে চুম্বনে মাতৃস্নেহে ভরিয়ে দেয় বিমাতা গৌরীরানি।

অদূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন শশী ভূষণ। জানালা দিয়ে অন্ধকার রাতের গ্রহ-তারা-নক্ষত্রে ভরা ঝলমলে আকাশের পানে একপলক চেয়ে ফোঁস করে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন।

যুথিকা বড়ুয়া, কানাডা প্রবাসী গল্পকার, গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত শিল্পী
ইমেইলঃ jbaruajcanada@gmail.com
Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email