‘যে যেখানে লড়ে যায়’

4405
লেখকঃ সালাহ উদ্দিন শৈবাল
AdvertisementLeaderboard

সালাহ উদ্দিন শৈবাল

।। টরন্টো, কানাডা থেকে ।।

২০১১ সাল। জানুয়ারি মাস। বছর খানেক হলো কানাডার টরন্টো এসেছি। ছোট্ট একটা অফিসে কাজ করি। রবার্ট কার্লাইল আমাদের অফিস ম্যানেজার। একদিন আমার ডেস্কের কাছে এসে বলল, “তুমি জানো টরন্টোতে কিং খান আসছে?“

আমি বুঝতে পারলাম না। একজন সাদা কানাডিয়ান বলছে বলেই হয়তো বুঝতে পারলাম না। আস্তে জিজ্ঞেস করলাম, “কিং খান? সে কে?” রবার্ট মনে হলো কিছুটা অবাক হলো। হাসিমুখে বললো, “কিং খান….তার এই একটা নামই আমি জানি। আজকের পত্রিকায় এসেছে সেই খবর। সে বলিউডের নায়ক। আমার এক বন্ধু অনেক কষ্টে সেই অনুষ্ঠানের একটা টিকিট পেয়েছে। জুনে অনুষ্ঠান হবে। রজার্স সেন্টারে।“

রবার্ট চলে গেলো। আমার চিন্তাটা রয়ে গেলো। বুঝলাম কিং খান মানে শাহরুখ খান। আমি খোঁজ-খবর নেয়া শুরু করলাম। যা জানলাম তাতে আমার চিন্তা আরো বেড়ে গেলো। জুন মাসের শেষ সপ্তাহে টরন্টো শহরের বিখ্যাত ভেন্যু (৪০ হাজারের উপর ধারণক্ষমতা) রজার্স সেন্টারে অনুষ্ঠিত হবে 2011 IIFA Awards (International Indian Film Academy Awards )। সেই অনুষ্ঠানের স-ব টিকেট এই জানুয়ারীতে মাত্র ১০ মিনিটে শেষ হয়ে গেছে! আমি চমকে গিয়েছিলাম। এতো টিকেট কিনলো কারা? সাদারাতো শাহরুখ খানের এতো ভক্ত হওয়ার কথা না! আমার জন্য আরো বড় চমক ছিলো পরের খবরটায়। টরন্টো ওন্টারিও প্রদেশের রাজধানী। ওন্টারিও প্রদেশের সরকার এই অনুষ্ঠান যেন টরন্টো শহরে হয় সেজন্য ইন্ডিয়ার আয়োজকদের ১২ মিলিয়ন ডলার…মানে প্রায় ৭০ কোটি টাকা দিয়েছে!! সরকার এতো টাকা দিয়ে দিলো? কেন? আমি অবাক হয়েছিলাম। উত্তর খুঁজছিলাম।

পুরো কানাডার কথা বাদ দেই…শুধু এই ওন্টারিও প্রদেশেই ৬ লক্ষ ভারতীয় বংশোদ্ভুত কানাডিয়ান থাকে। প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার ভারতীয় অভিবাসন নিয়ে কানাডা আসে। বেড়াতে আসে ১ লক্ষ ৩০ হাজার। IIFA Awards এর হাজার হাজার টিকেট এক নিমিষে কিভাবে শেষ হয়ে গিয়েছিলো তা বুঝতে আমার দেরি হলোনা।

আর ৭০ কোটি টাকা? কেন দিলো সরকার? প্রধানত দুটো কারণে সরকার এতো টাকা স্পন্সর করেছিলো। প্রথম কারণ টুরিজম। আইফা’র এই অনুষ্ঠান দেখে ৬০টি দেশের প্রায় ৭০০ মিলিয়ন দর্শক! ওন্টারিও সরকার মনে করেছে এতো দর্শকের কাছে টরন্টো শহরকে উপস্থাপন তারা খুব কম টাকাতেই সেড়ে ফেলতে পারছে। দ্বিতীয় কারন রাজনৈতিক। ভোটারদের খুশি করা। ৬ লক্ষ ভারতীয়!! এরা ছড়িয়ে আছে কানাডার সরকার, মিডিয়া, ব্যবসা, শিল্প, সংস্কৃতি…সব জায়গায়। বলে রাখি ওন্টারিওর মোট জনসংখ্যা কিন্তু মাত্র দেড় কোটিরও কম।

তখন ভিক্টোরিয়া পার্ক সাবওয়ে স্টেশনের কাছেই থাকি। প্রতিদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় স্টেশনে এসে দেখি প্রায় ১০-১২ জন ভারতীয় সাবওয়ের জন্য দাঁড়িয়ে আছে। নিজেদের মধ্যে হিন্দিতে কথা বলছে। এদের বেশভূষাও খুব একটা সুবিধার না। কারো হয়তো সেইভ-টেইভ করা নেই। বয়স ২২-২৫ এর মধ্যে। হাসি-খুশি। একদিন ডাউন টাউনে লাঞ্চ টাইমে আমার অফিসের নীচ তলায় ক্যান্টিনে এসে চমকে উঠলাম। পুরো ক্যান্টিন ভারতীয়তে ভরা। প্রায় ৫০ জন! ভিক্টোরিয়া পার্ক সাবওয়ে স্টেশনের কয়েকজনকেও দেখলাম। কৌতূহল হলো। আস্তে আস্তে এদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলাম। দিপকের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। জানলাম ভারতীয়দের আরেক রাজ্য জয়ের গল্প। এরা সবাই IGATE নামের একটা আইটি কোম্পানির কর্মী। IGATE বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি টাকার আইটি প্রজেক্টগুলোতে দক্ষ লোক সাপ্লাই করে। অনেকটা কন্সট্রাকশন ফার্ম দিয়ে আপনার বাড়ি বানানোর মতো। ফার্মকে কন্ট্রাক্ট দিয়ে দিলেন। সে তার ডিজাইনার, ইঞ্জিনিয়ার, রাজ-মিস্ত্রি, কামলা দিয়ে কাজ তুলে দিলো। আমি শুনলাম এই তরুণদের IGATE বাসা ভাড়া করে রাখে। মাসে ১৫০০-২০০০ ডলার করে দেয়। তাদের জন্য অনেক টাকা। কিন্তু বড় বড় কোম্পানিগুলোর জন্য এটা কিছুই না। তারা যদি এই স্কিলের একজন আইটি প্রফেশনলাকে কানাডায় চাকরি দিতে চায় তার বেতন ন্যূনতম ৫০০০ থেকে ৬০০০ ডলার হবে। আমি দিপকের পাসপোর্টে ১০-১২টা দেশের ভিসা দেখলাম। সে আর কিছুদিন এইভাবে কাজ করবে। তারপর কোন একটা দেশের রেসিডেন্স নিয়ে বসে যাবে। তার থাকবে তখন ৩-৪ বছরের মূল্যবান অভিজ্ঞতা। এইসব দেশের মেইনস্ট্রিমে চাকরি পাওয়ায় তার কোন সমস্যাই হবে না। খোঁজ নিয়ে জানলাম আমার প্রতিষ্ঠানেই এই ধরনের কর্মীর সংখ্যা ২-৩ হাজার! বাকি আরো অনেক প্রতিষ্ঠানেও IGATE কাজ করে।

iGATEআমি IGATE নিয়েও খোঁজাখুজি শুরু করলাম। IGATE যাত্রা শুরু করেছিলো ভিন্ন নামে ইউ. এস এ প্রায় বছর তিরিশেক আগে। এই প্রতিষ্ঠান শুরু করেছিলো দুইজন ভারতীয় প্রবাসী বন্ধু। অশোক ত্রিবেদী আর সুনীল ভাদওয়ানী। সুনীল আমেরিকায় এম. বি. এ. শেষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় বছর দশেক কাজ করে। সে আর অশোক মাঝে মাঝে পিট্‌সবার্গের একটা বারে আড্ডা দিতো। সেখানেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠে চিন্তা, প্ল্যান এবং এগিয়ে যাওয়া। যারা বিস্তারিত পড়তে চান তারা Dilip Hiro’র লেখা “Indians in a Globalizing World” বইটি পড়তে পারেন। IGATE হাত-বদল হয়েছে। নাম পরিবর্তন হয়েছে। এখন এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান আরেক অশোক। ইনি ইন্ডিয়ান আমেরিকান অশোক ভার্মা।

কিভাবে এইসব সম্ভব হলো? ভারতীয়দের সস্তা-দক্ষ জনশক্তি আছে এটাই কি এক মাত্র কারণ? তারা শাহরুখের মতো নাচতেও পারে আবার সুনীল ভাদওয়ানীর মতো ব্যবসাও চালাতে পারে?

আমি খুব কাছ থেকে কানাডার শত বছরের পুরনো বিশাল এক প্রতিষ্ঠানের কয়েক কোটি টাকার এক প্রজেক্ট বাস্তাবায়িত হতে দেখেছি। এখন আমি সেই গল্প বলবো। কিন্তু মানুষের নামগুলো পাল্টে দেবো। প্রজেক্টের আইডিয়া যে তৈরি করেছে তার নাম দীপা অরোরা। সে শতবছরের পুরনো সেই কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানের একজন ডিরেক্টর। দীপার বাবা ইন্ডিয়া ছেড়ে প্রথমে লন্ডন যায়। তারপর তারা কানাডা সেট্‌ল করে। দীপা তার প্রজেক্টের আইডিয়া আমেরিকায় কোন এক পার্টিতে আরেক আমেরিকান ভারতীয় আশিষ বাগাইয়ের সঙ্গে শেয়ার করে। সে আমেরিকায় IGATE এর মতোই একটা আইটি ফার্ম চালায়। সে আইডিয়াটা বাস্তবায়িত করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে। দীপা কানাডা ফিরে এসে পুরো প্রজেক্ট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাবৎ বাঁধা অতিক্রম করে, সবাইকে বুঝিয়ে সে কাজটা আশিষের কোম্পানীকে দেয়। আমি তাদের একটা মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলাম। টরন্টোর সুসজ্জিত আর্ন্তজাতিক সেই করপোরেট সভা কক্ষে কোটি টাকার কানাডিয়ান প্রজেক্ট নিয়ে কথা হচ্ছিলো। আমিসহ মোট সাতজন সেখানে উপস্থিত ছিলো। দুই পক্ষ মিলিয়ে সেই সাত জনের পাঁচজনই ভারতীয় বংশোদ্ভুত! দীপা অরোরা, প্রজেক্টের ক্লায়েন্ট/ ওনার। রাজ চৌহান, প্রজেক্টের আই.টি আর্কিটেক্ট। আশিষ বাগাই, আইটি ফার্মের মালিক। রত্নাকর, আশিষের ফার্মের টেকনিক্যাল প্রধান। তাদের ইউ. এস অফিসে বসে। পবন, ফোনে যোগ দিয়েছিলো ভারত থেকে। সে প্রডাক্টশনের প্রধান।

যারা ব্যবসা করেন বা রাজনীতি করেন তারা জানেন। বাস্তবে ব্যবসা বা রাজনীতি সহজে বা আপনা-আপনি হয় না। অনেক অনেক টাকা যেখানে জড়িত সেখানেতো আরো না। সেখানে কামড়া-কামড়ি থাকে। আইডিয়া সেল করার ব্যাপার থাকে। মনোযোগ আকর্ষনের ব্যাপার থাকে। আধিপত্য বিস্তারের ব্যাপার থাকে। কাউকে না কাউকে বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধার জন্য চেষ্টা করে যেতে হয়। টরন্টো বসে..পৃথিবীর আরো আরো দেশে বসে….সেই কাজটা অনবরত করেছেন এবং করছেন ভারতীয় বংশোদ্ভুত এইসব প্রবাসীরা।

এরা কি বিরাট বিরাট সব দেশপ্রেমিক? তারা কি একে ওপরকে খুব বিশ্বাস করে? তা কিন্তু না। আপনারা শুনলে অবাক হবেন ভারত কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের মতো দ্বৈত নাগরিকত্ব অনুমোদন করে না। অর্থাৎ যারা যারা কানাডা, আমেরিকা বা অন্যান্য দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছে তারা ভারতীয় নাগরিকত্ব হারিয়েছে!

আসলে এই পুরো ব্যাপারটা সম্ভব হচ্ছে কারণ এটার মধ্যে সংশ্লিষ্ট সব্বার লাভ রয়েছে। বুদ্ধি রয়েছে। সাহস রয়েছে। ইতিবাচক চিন্তা রয়েছে।

কানাডায় বাংলাদেশির সংখ্যা সর্ব সাকুল্যে ৭০-৭৫ হাজার হবে। তাই জেম্‌স আসলে এখানে ৩০-৪০ হাজার টিকেট বিক্রির সম্ভাবনা নাই। ওন্টারিও সরকারও তাই ১২ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেবেনা। টাকা যে দেয়া যায় সেই কথাটা অন্তত: তাদের কানে তোলার মতোও কেউ সরকারে নাই। Infosys, IGATE, Tata Consultancy Services এর মতো কোটি কোটি টাকার প্রজেক্ট দখল করার মতো কোন প্রতিষ্ঠান নাই। কিছু কিছু ছোট প্রতিষ্ঠান যদি গড়েও উঠে তাদের ব্যবসা দেয়ার মতো টেবিলের এই পারে কোন চেনা-জানা পরিচিত ‘দীপা অরোরা’ বসে নাই।

পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি সম্পদ এখন মাত্র ১% মানুষের হাতে। তারা কেউ গরিব দেশে থাকে না।

যারা এখনো প্রবাসী হলে বলেন, “দেশেইতো ভালো ছিলে। বাইরে কেন? দেশে থাকো দেশের জন্য কাজ করো। দেশকে কিছু ফিরিয়ে দাও।” অথবা যারা বিদেশে এসে কিছু করতে না পেরে দেশের মানুষকে বলেন, “দুর..দুর….বিদেশে এসে কি করবা? দেশে না খেয়েও পরে থাকো। মনে শান্তি আছে।”………তারা আসলে জানেন না গ্লোবাল এই খেলাটার নাম ফুটবল। এটা এগার জনের খেলা। ঘরেও লোক লাগবে। বাইরেও। কেউ ডিফেন্সে খেলবে। ঘর সামলাবে। কেউ মিড ফিল্ডে বল লেনদেন করবে। কেউ ফরোয়ার্ডে খেলবে। তাকে প্রতিপক্ষের এলাকায়ই থাকতে হবে। প্রতিপক্ষের গোল বারের যতো কাছে থাকা যায়।

কেউ যদি প্রবাসে গিয়ে তেমন কিছু করতে নাও পারে। রেমিটেন্স পাঠাতে নাও পারে। তাতেও ক্ষতি নেই। সে অন্তত: খাওয়ার জন্য বাংলাদেশের মাছ খুঁজবে। রুচির মসলা কিনবে। প্রাণের আমসত্ত্ব। বাংলাদেশের গান খুঁজবে। বই খুঁজবে। পহেলা বৈশাখ হলে ‘সাদা শাড়ী লাল পাড়’ খুঁজবে। বাংলাদেশি এই সব প্রডাক্টগুলোর নতুন বাজার তৈরি হবে। ব্যবসা বাড়বে। দশ জনে চিনবে।

যারা আমার লেখা নিয়মিত ফলো করেন তারা জানেন আমার লেখায় আমার প্রবাস জীবনের কথা থাকে। পাশাপাশি দেশের জন্য কষ্ট থাকে। দেশের জন্য কান্না থাকে। আমার এই ব্যক্তিগত ভালোলাগা আর কষ্ট পৃথিবীর খেলার নিয়ম পাল্টে দেয় না। সম্পদের ভাগ বুঝে নিতে আমাদের পৃথিবীর পথে নামতেই হয়। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম যোদ্ধারা….ব্রিটিশরা এক সময় প্রায় সারা পৃথিবী জয় করে সেটার প্রমান দিয়ে গেছে। এখন ভারতীয়রা, চাইনিজরা বুঝে নিচ্ছে।

লেখকঃ কানাডার রয়েল ব্যাংক (আরবিসি) -এর মানব সম্পদ বিভাগের রিক্রুটিং সেকশনের সিনিয়র অ্যানালিস্ট, এবং কানাডায় বাংলাদেশিদের সংগঠন বিসিসিবি’র মানবসম্পদ ও সাংগঠনিক উন্নয়ন প্রধান

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email