রঘূ দাসের ট্যাক্সি

2221
AdvertisementLeaderboard
মির্জা গালিব স্ট্রিট

সাইদুল ইসলাম

।। কানাডা থেকে ।।

রিজেন্ট এয়ারলাইন্সে চড়ে কলকাতায় যাচ্ছি শুনে অনেকেই নাক সিটকে ছিলেন। হয় ভালো এয়ারলাইন্সে যাও না হলে ট্রেনে যাও রিজেন্টে কেন?

এবার আর হঠাৎ করে যাওয়া নয়। প্রায় মাস খানেক খুঁজেটুজে সবচেয়ে সস্তার টিকেট কেটেছি। ১০,৪০০ টাকায় আসা যাওয়া। কিন্তু উপরে বসে যিনি আমাদের সবার চলাফেরার উপর নজরদারি করছেন, তাঁর দৃষ্টি এড়াবো কী করে। যাওয়ার দুইদিন আগে আমার এক সহযাত্রীকে জ্বরে ফেলে দিলেন। আর আমাকে আরও সাড়ে সাতহাজার টাকা জলে ফেলে টিকেট বদলাতে হল। তারপরও সময় মত যাত্রা শুরু হলনা। সকালের তুমুল বর্ষায় ডুমুর পাতার নিচে লুকিয়ে থাকা দোয়েল পাখির মত ঘাড় গুঁজে পড়ে রইলো রিজেন্ট।

একটু পর বড়, মাঝারি দুই একটা প্লেনের ওড়া শুরু হল। ক্ষুদ্র রিজেন্টের ঠাঁই হয়েছে প্রায় ট্যাক্সিওয়ের মাথায়। ব্যাপারটা মন্দ হলনা। ‘এ জার্নি বাই বাস ফ্রম লাউঞ্জ টু এয়ারক্র্যাফট’ করে যখন প্লেনে উঠে বসলাম তখনও থেমে থেমে বৃষ্টি পড়ছে। দু’একজন শুভাকাঙ্ক্ষীর রিজেন্ট জনিত আশঙ্কা আমাতেও সংক্রমিত হতে শুরু করছে। রিজেন্টের কেবিন ক্রুদের সেবা-যত্নে সে শঙ্কা কেটে গেল ধীরে ধীরে। বার্গার, কেক আর জুসের নাস্তা শেষ হতে হতে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের টারমাক ছুলো আমাদের প্লেন।

গতবার কলকাতায় আসার সময় খুত ধরার মানসিকতা নিয়ে এসেছিলাম। অনেক কিছুই ভালো লাগেনি। এবার ব্যাপারটি হল উল্টো, কলকাতা বিমানবন্দর অনেক দিক দিয়েই ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চেয়ে আধুনিক। খুব বেশি প্লেন ওঠানামা করেনা বলে ভিড় ভাট্টা কম। ইমিগ্রেশন পার হতে সময় লাগলো না। লাগেজ কালেকশনও হলো ঝামেলা ছাড়াই।

কলকাতা বিমানবন্দরের সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে ভ্রমণ সংক্রান্ত নানা রকম সেবা ও তথ্যের চমৎকার পরিবেশনা। কাস্টম পেরুনোর পর রেলের টিকেট বুকিং কাউন্টার আছে। মোবাইলের সিম কেনার কাউন্টার আছে, তিন রকম ট্যাক্সির কাউন্টার আছে, চিকিৎসা নেবার জায়গা আছে। ট্যাক্সির জন্যে তাড়াহুড়োর দরকার নেই। একটু কষ্ট করে লাইনে দাঁড়ালেই প্রিপেইড ট্যাক্সি পাওয়া যায়। নিয়ম হলো কাউন্টারে গন্তব্য বলে পয়সা দিয়ে একটি রশিদ নেওয়া। রশিদটা বাইরের কাউন্টারে দিলে তারাই আপনাকে ট্যাক্সি চিনিয়ে দেবে। পুরো ব্যাপারটা বড় জোর পাঁচ ছয় মিনিটের কাজ।

এসব শেষ করে ট্যাক্সি চড়ে বিধান নগর এয়ারপোর্ট অথরিটির কাছে এসেছি, ড্রাইভার বলল, স্যার মির্জা গালিব স্ট্রিট তো আপনি চেনেন?
বললাম, আমি আরো দু’বার ছিলাম। চিনি।
ড্রাইভার বলল, খুবই ভালো হল স্যার আমি কলকাতায় নতুন এসেছি। পথ চিনিনা’।
আমি ভাবলাম, বলে কি? বললাম, পথতো আমিও চিনিনা।

আমার উত্তর শুনে ড্রাইভার রঘূ দাসকে একটু চিন্তিত মনে হল। ঝাড়খন্ডে বৌ বাচ্চা রেখে কিছুদিন হল সে কলকাতায় এসেছে। কলকাত্তা এখনও পুরোপুরি চেনা হয়ে ওঠেনি। লালবাতিতে গাড়ি থামার সাথে সাথে মোবাইলে কার সাথে মাতৃভাষায় কথাবার্তা শুরু করলো সে। সামাঝ গিয়া বলে ফোন রেখে আমার দিকে ফিরলো। হাসিতে মাখামাখি তার মুখ, ‘কলকাত্তার রাস্তার লাফড়া হলো বাবু একই রাস্তার অনেক নাম বুঝলেন এই যেমন পার্ক স্ট্রিটের একদিকের বোর্ডে দেখবেন মাদার তেরেসা রোড লেখা আছে, আবার আপনি যদি ফ্রি সকুল রোড বলতেন আমি বিলকুল বুঝে নিতুম। মির্জা গালিব স্ট্রিট তো ওই রাস্তারই দুসরা নাম আছে। চিন্তা কোরবেন না, তিস মিনিটে পৌছে দেবো, এই যে ওভার ফ্লাই আছে এই ওভার ফ্লাই সিধা এজেসি রোড তক লিয়ে যাবে সেখান থেকে বায়ে মোড়’।

কলকাতার রোদে ভাজা ভাজা হয়ে রঘূ দাসের ভ্যাজর ভ্যাজর শুনতে শুনতে ফ্লাইওভার পেরিয়ে ভিড়ের মধ্যে আটকে গেলাম। এম্বাসাডার গাড়ির কাঁচ পর্যন্ত গরম হয়ে যাচ্ছে রোদে, মেজাজ ঠিক রাখা যাচ্ছে  না। বাইরে তাকিয়ে দোকানের সাইন বোর্ড পড়তে থাকলাম। জায়গার নাম লেখা বেলেঘাটা, বললাম, আপনি না এজেসি রোডে ঢোকার কথা বললেন। মাথা চুলকাতে চুলকাতে রঘু বলল, বাবু ভুল রাস্তা দিয়ে নেমে গিয়েছি। নতুন তো, বুঝলেন না!

পেছন থেকে বৌ বাচ্চারা খোঁচাতে লাগলো, এর মানে হচ্ছে, ‘মুখ বন্ধ রাখো, তোমার ধমকা ধমকির জ্বালায় আরও ভুল কোথাও নিয়ে যাবে’। মুখে কুলুপ এটে বসে রইলাম। অনেক কসরতের পর আমদের গাড়ি যখন হোটেল হাউসেজ ফরটি থ্রির সামনে থামলো ততক্ষণে দেড় ঘন্টা হয়ে গেছে। ভাগ্যিস এয়ারপোর্ট গাড়ির জন্যে ২৮০ টাকা দিতে হয়েছিলো, নাহলে সে যে পথে এসেছে ভাড়া ৪০০ ছাড়িয়ে যেত।

হাউসেজ ফরটি থ্রি আমাদের পুরনো হোটেল। মির্জা গালিব স্ট্রিট বলা যায় বাংলাদেশি ট্যুরিস্টদের জায়গা। ৩০০ টাকা থেকে শুরু করে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত রুম পাওয়া যায় এই রাস্তায়। আগের দু’বারের অভিজ্ঞতায় আমি জানি এর মধ্যে হাউসেজ ফর্টি থ্রি-ই আসলে হোটেল বাকিগুলি এক সময় বাড়ি ছিলো আস্তে ধীরে হোটেল হিসেবে গড়ে উঠেছে। ইন্টারনেটে দেখতে মোটামুটি ভালো হলেও থাকার জন্যে তেমন নয়। এর আগে ২৭০০ টাকায় উঠেছিলেম এখানে। এবার ইন্টারনেটে বুকিং দিয়ে গিয়েছিলাম। ভাড়া ৩১২৫। হোটেলের পুরনো কাউন্টার ম্যানেজার আমাদের দেখেই খুশি হয়ে উঠলো। বললাম ভাড়া বেড়ে গেলো যে। বলল, স্যার booking.com এর মাধ্যমে এসেছেন, ভাড়া তো বেশি হবেই। ট্যাক্সসহ ভাড়া আসবে ৩৬৬৯ রুপি। বললাম ঠিক আছে ৭ দিনের বদলে একদিন বুক করেন, কাল রুমছেড়ে দিয়ে আবার উঠবো আগের ভাড়ায়। ম্যানেজার বিনয়ের অবতার হয়ে গেলেন, বললেন স্যার আপনি বুকিং এর শর্ত দেখেন নি? এখন ছাড়তে গেলেও তো আপনাকে শুধু শুধু একদিনের পয়সা দিতে হবে।

রাগে গজগজ করতে করতে করতে বললাম তাহলে আর আপনাদের এখানে এসে কী লাভ হল? তিনি বললেন স্যার একদিনের বুকিং দিয়ে চলে আসতেন বাকিটা আমরা দেখতাম। বললাম সবচেয়ে ভালো হলো বুকিং না দিয়ে আসা।

12

লিফট

আমাদের জন্যে ২১০ নম্বর রুম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। লাগেজ টাগেজ সব ওয়েটাররাই নিয়ে গেল। জেলখানার মত লিফটে চড়ে রুমে গিয়ে মন খারাপ হল, এর আগে আমরা ২০৩ নম্বর রুমে ছিলাম। তার তুলনায় এই রুমটি ছোট। এসির বাতাস সরাসরি বুকে লাগে। বঊ বলল এখনই রিসেপসনে ফোন কর। আমরা ২০৩ চাই।

ফোনে কথা শুরু করেছি, হঠাৎ করে সোরগোল শুরু হল। টেলিফোনে হুড়োহুড়ির শব্দ শুনছি, কে যেন বলছে হিল রাহাহে’। আমার খাট নড়ছে। শ্রেয়া জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলো বলল, বাবা সব মানুষ  রাস্তায়, ভূমিকম্প হচ্ছে নাকি?

টেলিফোন কেটে গিয়েছিলো। আবার ফোন বাজলো, রিসেপসন থেকে কেউ একজন বলল, স্যার রুমে বসে থাকবেন না। ভূমি কম্প হচ্ছে নিচে নেমে আসুন। ততক্ষণে ভূমিকম্প শেষ।

আমাদের রুমে লাগেজ বয়ে নিয়ে গিয়েছিলো আবিদ নামের তরুন একজন ওয়েটার, আমি নিচে নামার পর ম্যানেজার তাকে বললেন, ‘আবিদ! স্যারকে ২০৮টা দেখিয়ে দাও। ওটা বড় আছে।

শুনলাম ভূমিকম্পের পরপরই ২০৮ এর গেস্ট চেকআউট করেছেন। ২০৮টা আমার পছন্দ হলেও বউ বাচ্চার উশখুশ দূর হলনা, এটির বাথরুম ছোট। শেষ পর্যন্ত সেখানেই ঠাঁই হল।

আবিদ বলল, আমি খেয়াল রাখবো ম্যাম, ২০৩ খালি হলেই শিফট করে দোবো। আজকের দিনটা থাকুন।

আমাদের কলকাতা সফরের আসল উদ্দেশ্য ডাক্তার দেখানো। যেহেতু নয়টার মধ্যেই প্লেন নেমেছিলো ভেবেছিলাম প্রথমে বৈদ্যদর্শণ শেষ করে ঝাপিয়ে পড়বো কলকাতা দর্শণে। রঘূ দাস আমাদের সে পরিকল্পনায় পানি ঢেলে দিয়েছিলো ঘুরপথে এনে। সে সব বাদ দিয়ে নেমে পড়লাম মির্জা গালিব স্ট্রিট চষে বেড়াতে।

2

আর্মেনিয়ান কলেজ, লেখক উইলিয়াম থ্যাকার এখানে জন্মছিলেন

আমার মত যেসব মানুষ কলকাতার লেখকদের গল্প পড়তে পড়তে বড় হয়েছে তাদের জন্যে মির্জা গালিবের চেয়ে আর ভালো ঠাঁই কলকাতায় নেই। পার্ক স্ট্রিট থেকে বেরিয়ে একটু কোনাকুনি হয়ে উত্তর দিকে রাস্তাটি লেনিন সরণীতে গিয়ে ঠেকেছে। এই রাস্তার দুপাশে ছড়িয়ে ছটিয়ে মুহাম্মাদ ইসহাক স্ট্রিট, রয়েড স্ট্রিট, লিন্ডসে স্ট্রিট চৌরঙ্গী লেন, সাদার স্ট্রিট, মারকুইজ স্ট্রিট, নিউমার্কেট, একটু দূরে এসপ্লানেড ধর্মতলা, রফি আহমেদ কিদোয়াই সড়ক। আমাদের বিমান অফিস, সোহাগ পরিবহনের অফিস, গ্রীন লাইন, শ্যামলী সব এখানেই। আর আমাদের হোটেলের ঠিক উল্টো দিকে ৫৬ নম্বর বাড়িতে আর্মেনিয়ান কলেজ। এই বাড়িতে জন্ম হয়েছিলো ভ্যানিটি ফেয়ারের লেখক উইলিয়াম থ্যাকারের।13

ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমানে আজাদ আবুল কালাম কলেজ)

আমার কাছে কলকাতার প্রধান তিনটি আকর্ষণ ইসলামিয়া কলেজ, ৮ থিয়েটার রোড আর জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ি। আমার বাবা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র ছিলেন। আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মি. এ এন এম আব্দুল করিম এই কলেজে আমার বাবার দুই বছরের সিনিয়ার ছিলেন। ৪৭ এর দাঙ্গায় এক হিন্দু শিক্ষক তাঁদের আগলে রেখেছিলেন। থিয়েটার রোডও এখান থেকে দূরে নয়। ৮ থিয়েটার রোডে ছিলো প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সদর দপ্তর। আগের দু’বার বাড়িটি আমি খুঁজে পাইনি। আর জোড়াসাঁকোর গল্প পরে হবে।

যারা কমখরচে কলকাতা দর্শনে যেতে চান, কম পয়সায় কেনা কাটা করতে চান তাদের জন্যেও আদর্শ জায়গা এটিই। চামড়ার জুতো, ব্যাগ, স্যুটকেস, কিনতে হলে শ্রীলেদার্সে চলে যান। ফায়ার ব্রিগেডের উল্টো দিকে তাদের বিশাল শো রুম। আর একটু সামনে গেলে লিন্ডসে স্ট্রীট, সেখান থেকে বায়ে গেলেই হাতের ডানে মোটামুটি দামী হোটেল স্যাফায়ার স্যুট, তারপরেই নিউমার্কেট।

লিন্ডসে স্ট্রিটে আছে দামী জুতোর দোকান উডল্যান্ড, পরিচিত দোকান খাদিমস, আর বাজার কলকাতা নামে একটি কাপড়চোপড়ের দোকান। বাজার কলকাতার আরও কয়েকটি শাখা দেখেছি পার্ক স্ট্রিট আর অন্য কোথাও।

নিউমার্কেটের দক্ষিণে মান্যবরের একটি শো রুম দেখেও যেতে ইচ্ছে হলোনা। গেলাম প্যান্টালুনসের ফ্যাক্টরি আউট লেটে। শোরুম গুলির চেয়ে অনেক সস্তায় জিন্স, টি সার্ট, ফরমাল জামাকাপড় পাওয়া যায় এখানে।

সন্ধ্যা পর্যন্ত রাস্তাঘাট দোকান পাট ঘুরে একটি বিষয় উপলব্ধি হলো কলকাতা থেকে বাংলা দ্রূত গুটিয়ে পড়ছে। দোকানে, অফিসে, ঘরে বাইরে হিন্দির সাথে পাল্লা দিয়ে পেরে উঠছে না বাংলা। কে কত ভালো হিন্দি বা উর্দু বলতে পারে সবখানে মনে হচ্ছে তারই প্রতিযোগিতা চলছে।

লেখকের ইমেইলঃ smsaidulislam@yahoo.com
Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email