রাষ্ট্রীয় ভিতে সর্ষের মধ্যে ভূত

946
লেখকঃ নয়ন চক্রবর্ত্তী
AdvertisementLeaderboard

নয়ন চক্রবর্ত্তী

।। চট্টগ্রাম থেকে ।।

রাষ্ট্রের ভিত আসলে নড়বড়ে হয়ে গেল দুর্নীতিবাজ আর ধান্ধাবাজদের কারণে। আর এড়িয়ে যাওয়া যেন রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের অধিকার! খতিয়ে দেখা হবে, এবিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে! বিষয়টা তদন্তনাধীন, এ বিষয়ে দোষীদের আটক করার প্রক্রিয়া চলছে, এসব মন্তব্য সরকারী কর্তাদের সহজ উত্তর।

এসএসসি এইচএসসি ব্যাংক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার পরও ব্যবস্থা নিচ্ছে না সরকার! দুই লক্ষ ৩ হাজার পরীক্ষার্থী ছিল আজ অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়ার অফিসার পদের জন্য? কত কোটি টাকা খরচ হলো এসব পরীক্ষার্থীর? ২ হাজার টাকা গড়ে হিসাব করলে কত কোটি টাকা গচ্চা গেল এসব ছেলেমেয়েদের?

সকালে পরীক্ষার্থীরা তো দিল, কিন্তু বিকালের পরীক্ষার্থীরা? ওরা তো পরীক্ষা স্থগিত করার কারণে কিছুই পেল না, এত ক্ষতি কি পরীক্ষার্থীদের? এই ক্ষতি একটি পরিবারের, একটি রাষ্ট্রের, রাষ্ট্র বারবার এসব বিষয়কে প্রশ্রয় দিচ্ছে, এসবের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করে না, ঋণের টাকার পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার কারণে ঋণগ্রস্তের বাড়ির টিন খুলে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোম্পানীগুলোর পক্ষ হয়ে আর রাষ্ট্রের ঋণখেলাপীদের কাছে গিয়ে রাষ্ট্র তোষামোদি করে, কোল্ড ড্রিংকসের আমন্ত্রণ জানানো হয় ঋণখেলাপীদের কাছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এসব লোক নমস্য, আর আমরা সাধারণ হলাম, তুচ্ছার্থক। বারবার ফাঁস হচ্ছে প্রশ্ন, বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন, যুব সমাজ পা বাড়াচ্ছে অপরাধে, অথচ রাষ্ট্রের মাথা ব্যথা নেই। ধনী আরো ধনী হচ্ছে, গরীব হচ্ছে নিঃস্ব, বিচার ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে প্রভাবশালীদের পক্ষে।

কার লাভ? যে ছেলেটা আমার মতো অন্যের কাছে হাত পেতে টাকা নিয়ে পরীক্ষা দিতে গেছে তার অবস্থা কি? জনতা ব্যাংকের প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার পর যদি উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতো তাহলে আজ অগ্রণী ব্যাংকের প্রশ্ন ফাঁস হতো না, আগামী শুক্রবার পূবালী ব্যাংকের সিনিয়ার অফিসার পদে নিয়োগ পরীক্ষা, পরীক্ষার্থীরা কোন ভরসায় যাবে পরীক্ষা দিতে? একজন পরীক্ষার্থীর ওপর নির্ভর তার মা বাবা, আর তার প্রিয় মানুষগুলো!

মগের মুল্লুক যদি হয়ে যায় তাহলে আইন মানুষ হাতে তুলে নিবে, রাস্তায় রাস্তায় অস্থিরতা করবে জনতা, সব কিছুর শেষ আছে, মাত্রাতিরিক্ত নীতি বহির্ভূত কাজ হচ্ছে। ত্রানের চাল চেয়ারম্যানের বাড়িতে আত্মীয়রা নিয়ে নিচ্ছে ভাগভাটোয়ারা করে। রাস্তায় কনক্রিট আর ইট তুলে নিয়ে বাসার নির্মানাধীন কাজে লাগাচ্ছে মেম্বার ক্ষমতার জোরে, ভূমি অফিস ডিজিটালাইজড হয়েছে বলে ডিজিটালভাবে ঘুষ নিচ্ছে, প্রশাসনের ব্যক্তিরা প্রটোকল ছাড়া একটু বন্দর, কাস্টম, আদালত, থানা, ভূমি অফিস, পাসপোর্ট অফিস, বিআরটিএ ঘুরে আসুন তো, উত্তর পেয়ে যাবেন।

বুকে হাত রেখে বলতে পারবো একটাও সৎ মানুষ পাবেন না! চ্যালেঞ্জ দিয়ে দেশের সকল জনগন বলবে, জনমত জরিপের প্রোগ্রাম করুন ওপেন, জনগন পিটিয়ে মেরে ফেলবে ওসব কর্তাদের। এত পরিমাণ ক্ষোভ। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতার টাকার ওপর উপরি টাকা নেয়, নিজেদের পেনশনের টাকার জন্য টোকেন মানি না দিলে পেনশনের টাকা দেয় না।

এই রাষ্ট্র সম্বন্ধে বহির্বিশ্বে ও ধারণা এত ভালো যে দূতাবাস গুলোর কথা উঠলেই সেদেশের লোকই বলে, টোকেন মানি!

কোন চাকরীতে ঘুষ লাগে না? হয়তো এখন কর্তারা বলবে যোগ্য ব্যক্তি নাই তো তাই! আরে ভাই আগামাথা ছাড়া চারমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখলে কেমনে হবে? আপনাদের ছেলেরা তো ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে, দেশের বাইরে পড়ান, দেশে কি পড়ানো হচ্ছে কেমনে বলবেন; যে দেশে জাতীয় সঙ্গীত ধর্মীয় সঙ্গীত বলে ফতোয়া দেন, গাইতে অসম্মতি জানান, সে দেশকে রাষ্ট্রীয় কর্তারা কতটা বুকে লালন করেন তা আমরা বুঝে গেছি।

২৫ টা পদের জন্য লক্ষ লক্ষ ছেলে প্রতিযোগীতায় নামে, তারমধ্যে ঘুষের দরে সর্বোচ্চ নিলামওয়ালা চাকরি নামক সোনার হরিণটা পায়, অবশেষে সেও টোকেন মানি, অফিস খরচ নামক প্যাকেটা নেয়, এটাই ধারাবাহিকতা, দেশকে শেষ করার শেষ অবস্থায়।

একজন চাকুরী প্রার্থীর স্বপ্ন অনেক। মা বাবাকে অবসর দিয়ে হাল ধরবে পরিবারের, এরপর প্রেমের অধ্যায়ের সমাপ্তি করে বৌ করে আনবে প্রেমিকাকে। অথচ এসব ব্যবস্থা সেই প্রতিযোগীকে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর মুখে, ব্যর্থ বলে প্রেমিকার কথার বাণ, মা বাবা অশ্রুসিক্ত নয়ন সেই বেকার যুবককে ঠেলে দেয় অপরাধে কিংবা শেষ নিঃশ্বাসের পথে!

এর দায় সরকারের, শুধু সরকারের, এই মৃত্যু, এই স্বপ্নগুলোর মৃত্যুর একমাত্র অপরাধী সরকার।

নয়ন চক্রবর্ত্তী
এটিএন নিউজ, চট্টগ্রাম।
Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email