লালন উৎসবে মন্ট্রিয়ল মাতালেন বাউল শফি মন্ডল

AdvertisementLeaderboard

লোকসঙ্গীত এবং বাউল গান নিয়ে গত ২০ ও ২১ মে অনুষ্ঠিত এই প্রথম কানাডার মন্ট্রিয়ল শহরে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো বাংলাদেশ লোকসঙ্গীত উৎসব ২০১৭। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ থেকে আগত বাউল শফি মন্ডলের পরিবেশনা উপভোগ করেন অতিথিরা। ন্যাশনাল বাংলাদেশি-কানাডিয়ান কাউন্সিল প্রথমবার আয়োজন করে “বাংলাদেশ ফোক ফেস্টিভ্যাল ২০১৭”। বাংলাদেশ ও কানাডার দুই দেশের মানুষেরই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল অনুষ্ঠানে। কানাডার ক্যালগেরি শহর থেকে লোকসঙ্গীত পরিবেশন করতে যুক্ত হন বাউল মিউজিশিয়ান প্রশান্ত মাইকেল জন সাথে ছিলেন স্থানীয় লোক সঙ্গীত দল লোকজ এবং নান্দনিক মন্ট্রিয়ল।

প্রথমবারের মত বাংলাদেশের বাইরে লালন এবং বাউল ভিত্তিক অনুষ্ঠানটি বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশিদের মাঝেও সাড়া ফেলেছে বলে জানান আয়োজকরা।

অনুষ্ঠানের শুরুতে লালনগীতি, লালনবানী নিয়ে বাংলাদেশ থেকে আগত বাউল সাধক শফি মণ্ডল স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে বলেন, ‘বাংলা গানের হাজার বছরের সংস্কৃতির ধারক বাউল এবং লোকগান। লোকগানের উৎসবে যে লালন উৎসবের আয়োজনটি হচ্ছে এই ধরনের আয়োজন নিয়মিত হলে বিশ্ব দরবারে ছড়িয়ে পড়বে আমাদের বাংলা লোকগান এবং লালন বাণীর যাত্রা। পাশাপাশি অন্য দেশের লোকগানের নানা ধারা নিয়েও আমরা জানতে পারবো।’

pIC-3-2এছাড়া আয়োজক সংগঠনের সভাপতি মনির হোসেন লোকসঙ্গীত প্রসঙ্গে বলেন, ‘শুধুমাত্র বাংলার মানুষের জীবনধারা নয়, বরং বিভিন্ন ধর্মের প্রার্থনায়, বিভিন্ন মানুষের বৈচিত্রময় জীবনযাপনে লোকসঙ্গীত এবং বাউল সঙ্গীত জড়িয়ে আছে শক্তভাবে। ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি, সারি আর লালন বাউল গানের সুরে মাতোয়ারা হননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। হাজার বছর পরেও আবেদন ফুরায়নি এসব গানের। হয়তো স্থানীয়ভাবে আশানুরূপ সহযোগিতা না পাওয়ায় এবারের উৎসবে শ্রোতার সংখ্যা কম ছিল। তবে নিশ্চিত এবারের আয়োজন এবং অনুষ্ঠানের মান ছিল উচ্চমাত্রার। শ্রোতারা এসেছেন গান শুনেছে নিজের শিকড়ের সাথে কিছুটা হলেও সম্পৃক্ত হয়েছেন। আর এটাই এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় সাফাল্য ছিল। আগামী বছর আরও ভিন্নমাত্রায় এই উৎসবের আয়োজন চলবে।

উৎসবের প্রথম দিন

প্রথমবারের মত আয়োজিত বাংলাদেশ লোকসঙ্গীত উৎসব এর সূচনা করে উপস্থাপিকা শর্মিলা ধর ও উপস্থাপক শক্তিব্রত হালদার মানু’র উপস্থাপনায় নৃত্যশিল্পী প্রভাকর কর্মকার লোকনৃত্য পরিবেশনায় মধ্যদিয়ে শুরু হয় পুরো অনুষ্ঠানটি। এরপরে মঞ্চে আসেন মন্ট্রিয়লের স্থানীয় শিল্পীদল নান্দনিক মন্ট্রিয়ল। বাউল শাহ্‌ আব্দুল করিমের জনপ্রিয় দুটি গান পরিবেশন করেন তারা।

প্রথমদিনের উপসংহার টানতে মঞ্চে আসেন ক্যালগেরি থেকে আগত সুফি মিউজিশিয়ান প্রশান্ত মাইকেল জন। তিনি সচরাচর সুফি ঘরনার গান চর্চা করে থাকেন এবং মন্ট্রিয়ল দর্শকদের তার অপূর্ব বাঁশির সুরে বিমোহিত করে প্রথমদিনের অনুষ্ঠানটিকে সুন্দরভাবে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন অদ্ভুত সুন্দর কিছু ফিউশন মিউজিক দিয়ে।

উৎসবের দ্বিতীয় দিন

লোকসঙ্গীত যে সকল বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে- প্রেম, ধর্মীয় বিষয়, দর্শন, উক্তি, কর্ম ও পরিশ্রম এসব বিষয়েরই একটু একটু করে স্বাদ পেয়েছেন “বাংলাদেশ ফোক ফেস্টিভ্যাল ২০১৭”-তে আগত দ্বিতীয় দিনের দর্শকরা।

অনুষ্ঠান সূচনা করেন জনপ্রিয় শক্তিব্রত হালদার মানু এবং নাজনিন নিশা। প্রথমেই মঞ্চে স্থানীয় শিশু শিল্পী সিন্থিয়ার কণ্ঠে দুটি লোক গান দিয়ে শুরু হয়। এরপর নতুন প্রজন্মের ইমন, চিন্ময় ও দিব্য নিজেরা যন্ত্র বাজিয়ে দুটি লোক সঙ্গীত পরিবেশন করেন।

বাংলার লোকসঙ্গীতকে মনেপ্রাণে ধারণ করে মন্ট্রিয়লের তরুণ এবং নতুন প্রজন্মের দুইয়ে মিলে লোক দল তাদের সঙ্গীত চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। ব্যান্ড দল লোকজো সদস্যরা নিজেদের একোয়াস্টিক যন্ত্রে একে একে পাঁচটি লোকসঙ্গীত পরিবেশন করে সকলকে বিমোহিত করে রাখেন।

তাদের যন্ত্র সঙ্গীতের সাথে সঙ্গীত পরিবেশন করতে আসেন টরন্টো থেকে আগত অতিথি শিল্পী মৈত্রী সোম। তার কণ্ঠে লোক গানগুলির পরিবেশনা ছিল অপূর্ব।

স্থানীয় শিল্পীদের গানের পর্ব শেষ হলে স্থানীয় সিটি কাউন্সিলার মেরি ডেরস ফোক ফেস্টিভ্যাল উপলক্ষে এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। তিনি ফোক ফেস্টিভ্যালের ধারাবাহিকতা আশা করেন এবং এমন একটি উৎসব আয়োজনের জন্য এনবিসিসি’কে ধন্যবাদ জানান।

উৎসব উপলক্ষে মন্ট্রিয়ল মেয়র এক বাণীতে বাংলাদেশ ফোক ফেস্টিভ্যালের সফলতা কামনা করে ভবিষ্যতেও এমন উৎসবের আয়োজন চালিয়ে কুইবেক এবং বাংলাদেশের মধ্যে এক সাংস্কৃতির সেতুবন্ধন তৈরিতে বিশেষ ভুমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।

pIC-5-1এবারের উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ ছিল বাংলাদেশের জনপ্রিয় গায়ক তপন চৌধুরীকে তার সঙ্গীত জীবনের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ সম্মাননা প্রদান। স্থানীয় সিটি কাউন্সিলার মেরি ডেরস, বাউল বাদশা শফি মন্ডল এনবিসিসি সভাপতি মনির হোসেন, ব্যবসায়ি ও সমাজ সেবক ফয়সাল আহমেদ চৌধুরী এই গুণী শিল্পীর হাতে কানাডাবাসীর পক্ষ থেকে বিশেষ সন্মাননা তুলে দেন।

এরপর শুরু হয় মূল বাউল শিল্পীদের গানের পর্ব। কানাডার ক্যালগেরি থেকে আগত জনপ্রিয় বাঁশী বাদক মাইকেল প্রশান্ত জন তার যাদুকরী বাঁশির সূরে সকলকে মুগ্ধ করে রাখেন। দর্শকরা যেন তার বাঁশি শোনার জন্যই মুখিয়ে ছিলেন। তার বাঁশির মূর্ছনায় অনুষ্ঠানের পুরো আবহাওয়াই বদলে যায়।

তার বাঁশির পর্ব শেষ হতেই স্থানীয় যন্ত্র বাদকদের সাথে নিয়ে মঞ্চে আসেন বর্তমান প্রজন্মের বাউল  শফি মন্ডল। সাথে ড্রামে ও গিটারে ছিলেন লিটন ডি কস্টা, রকেট এবং মাইকেল প্রশান্ত। কিবোর্ডে ছিলেন আশরাফ পাভেল, ঢোল অনুপ চৌধুরী, তবলায় রুপু, বেইজ রাসেল ও অন্যান্য যন্ত্রে ছিলেন টিংকু এবং রাজীব।

স্থানীয় পর্যায়ে ছোটদের মাঝে বাউল গানের চর্চা অব্যাহত রাখার উদ্দেশ্যে তিনি বাউল শাহ্‌ আব্দুল করিমের “বসন্ত বাতাসে” গানটি স্থানীয় শিশু শিল্পী বিন্তীর কণ্ঠে শুনতে তাকে মঞ্চে ডাকেন। তিনি কণ্ঠের সাথে যন্ত্র মিলিয়েছিলেন সাথে নতুন প্রজন্মের সামিহা গিটার বাজিয়েছে। এক পর্যায়ে গানমগ্ন শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বিখ্যাত সব গানের ভাণ্ডার থেকে “চাতক অনুরাগ নইলে কি সাধন হয়”, “ধন্য ধন্য বলি”, “তোমায় হৃদ মাঝারে রাখবো”, “আল্লাহ বলো”, “অপার হয়ে বসে আছি”, “রাত পোহালে”, “আর কি হবে মানব জনম”, “দিল কি দয়া হয় না”, “এসব দেখি কানার হাট বাজার”, “ মিলন হবে কত দিনে” সহ ১৭ টি গান দর্শকের উদ্দেশে পরিবেশন করেন।

আয়োজক সংগঠন এনবিসিসি’র পক্ষ থেকে ব্যবসায়ি সমাজ সেবক মুন্সী বশির, রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী মমিনুল ইসলাম ভুঁইয়া, ব্যবসায়ী সমাজ সেবক ফয়সাল আহমেদ চৌধুরী, রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী রাসেল মির্জা, সংগঠক সমাজ সেবক নাজমুল হাসআন সেন্টূ, রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক অনুপ চৌধুরী মিঠু, প্রেস ক্লাব মন্ট্রিয়ল সভাপতি মোকসুম তরফদার, ভোরের আলো উপদেষ্টা সাদেক হোসেন শিবলী, সাংবাদিক শরীফ ইকবাল চৌধুরীকে বিশেষ ধন্যবাদ জানানো হয়।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email